বিদায়টা সুখকর হলো না দেশমের

Printed Edition

ক্রীড়া প্রতিবেদক

ফ্রান্স জাতীয় ফুটবল দলের দীর্ঘদিনের সফল কোচ দিদিয়ের দেশম। ২০১২ সালে জাতীয় দলের দায়িত্ব নিয়েছিলেন ১৯৯৮ বিশ্বকাপজয়ী এই অধিনায়ক। সে সময় লেস ব্লুজদের দায়িত্ব নেয়ার সময় তার সামনে ছিল এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। দল তখন ধারাবাহিকতা হারিয়েছিল, ড্রেসিংরুমে ছিল বিভাজন, আর সমর্থকদের আস্থাও ছিল তলানিতে। সেই কঠিন সময় থেকে দলকে টেনে তুলে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তিতে পরিণত করেন তিনি। কৌশলগত দক্ষতা, খেলোয়াড় ব্যবস্থাপনা এবং শান্ত নেতৃত্বের মাধ্যমে তিনি ফরাসি ফুটবলে নতুন যুগের সূচনা করেন। তার হাত ধরে রাশিয়ায় ২০১৮ বিশ্বকাপ ফুটবলের শিরোপা জয় করে ফরাসিরা। কিন্তু ডাগআউটে দাঁড়িয়ে ফ্রান্সের হয়ে সমাপ্তি হলো তিক্ততা দিয়ে।

বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালে উঠার লড়াইয়ে স্পেনের বিপক্ষে হার দিয়ে শুরু ফ্রান্সের। এরপর তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে গত পরশু আবার বড় ব্যবধানে হেরে চতুর্থ হয়ে আসর শেষ করেন দেশম। তবে প্রায় দেড় দশক ধরে ফরাসি ফুটবলের নেতৃত্ব দেয়া এই কিংবদন্তি কোচের বিদায়টি শোকের নয় বরং অর্জন আর গৌরবের স্মৃতি নিয়ে লেখা একটি সফল অধ্যায়ের শেষ পৃষ্ঠা। দেশমের সবচেয়ে বড় সাফল্য ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে ট্রফি নিয়ে ফেরা। তরুণ ও অভিজ্ঞদের সমন্বয়ে গড়া দল নিয়ে তিনি ফ্রান্সকে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জেতান। ফাইনালে ক্রোয়েশিয়াকে হারিয়ে শিরোপা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে তিনি বিরল এক কীর্তি গড়েন। আর তাতে খেলোয়াড় ও কোচ- দুই ভূমিকাতেই বিশ্বকাপ জেতা মানুষের তালিকায় নিজের নাম লেখান তিনি। এই অর্জন তাকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সফল কোচের কাতারে নিয়ে যায়।

২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপেও ফ্রান্সকে টানা দ্বিতীয়বার ফাইনালে তুলেছিলেন দেশম। তবু টানা দুই বিশ্বকাপের ফাইনালে তোলা তার কোচিং দক্ষতারই প্রমাণ।

দেশমের কোচিংয়ে উয়েফা নেশন্স লিগের শিরোপাও জিতেছে ফ্রান্স। পাশাপাশি ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপেও দলকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার শীর্ষ পর্যায়ে ধরে রেখেছেন তিনি। যদিও ইউরোর শিরোপা তার হাতে উঠেনি, তবে ধারাবাহিকভাবে বড় টুর্নামেন্টে ফ্রান্সকে অন্যতম ফেবারিট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

এত অর্জনের পরও সমালোচনা অবশ্য পিছু ছাড়েনি দেশমেকে। অনেক সময় তার রক্ষণাত্মক কৌশল কিংবা অতিরিক্ত বাস্তববাদী ফুটবল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দেশমের আরেকটি বড় কৃতিত্ব হলো নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের বিকশিত করা। কিলিয়ান এমবাপ্পে, অরেলিয়েন চুয়ামেনি, এদুয়ার্দো কামাভিঙ্গা ছাড়াও অনেক তরুণ ফুটবলার তার অধীনেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ১৪ বছর দায়িত্ব পালনের পর ফ্রান্সের কোচের পদ ছাড়ার মূল কারণ হিসেবে ‘শ্বাসরুদ্ধকর ও অস্বস্তিকর পরিবেশ’কে দায়ী করেছেন দিদিয়ের দেশম। তিনি জানান, নিজের জন্য নয় বরং ফরাসি দলের ভালোর জন্যই তাকে এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।

বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে পরাজয়ের পর আবেগঘন কণ্ঠে সংবাদ সম্মেলনে দেশম বলেন, ‘একটি ম্যাচ পুরো পথচলাকে ম্লান করতে পারে না।’

দেশমের অধীনে ১৮৫টি ম্যাচ খেলেছে ফ্রান্স। এর মধ্যে ১২০টি জয়, ৩৫টি ড্র ও ২৯টি হারের রেকর্ড নিয়ে তিনি কোচ হিসেবে ডাগআউট ছাড়েন। বিশ্বকাপ শেষে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় তিনি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান।

ফলে ফরাসি ফুটবলের ইতিহাসে দেশমের নাম উচ্চারিত হবে এমন একজন নেতা হিসেবে, যিনি সঙ্কটের সময় দায়িত্ব নিয়েছিলেন এবং বিদায়ের সময় রেখে গেলেন গর্ব করার মতো এক সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার।