অবিভক্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মাদ আলী ও তার স্ত্রীর কবরস্থান মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র

ওয়াকফ সম্পত্তি উদ্ধারের দাবি বগুড়াবাসীর

Printed Edition

আবুল কালাম আজাদ বগুড়া অফিস

অবিভক্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও বগুড়া নবাব পরিবারের কৃতী সন্তান মোহাম্মাদ আলী বগুড়া ও তার সহধর্মিণী হামিদা বানুর শেষ স্মৃতিচিহ্ন কবরস্থান কয়েক বছর ধরে অযতœ অবহেলায় থাকার পর মুছে ফেলা হচ্ছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী জমিদার বাড়ি নবাব প্যালেস ওয়াকফ সম্পত্তি সত্ত্বেও কিনে নিয়ে আওয়ামী প্রভাবশালীরা দখলে নেয়ার পর কবরের চিহ্ন মুছে ফেলার প্রক্রিয়া শুরু করে। এ ঘটনায় বগুড়াবাসী ক্ষুব্ধ। তারা কবর রক্ষাসহ ওয়াকফ সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয় তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নিতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

বগুড়ার তৎকালীন নবাব পরিবারের সন্তান মোহাম্মাদ আলী ভারতবর্ষ ও অবিভক্ত পাকিস্তানের একাধারে প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্র, অর্থ, স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন। তিনি ১৯৬৩ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন অবিভক্ত পাকিস্তান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালীন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তার ঢাকার ধানমন্ডির বাসভবনে ইন্তেকাল করেন। তার ওসিয়ত মতে লাশ দাফনের জন্য ঢাকা থেকে ট্রেনে বগুড়ায় নিয়ে আসা হয়। বগুড়া শহরের নিউ মার্কেট এলাকায় অবস্থিত কেন্দ্রীয় (বড়) জামে মসজিদের সামনে নবাব পরিবারের পারিবারিক কবরস্থানে মোহাম্মাদ আলীর বাবা আলতাফ আলী চৌধুরী ও পিতামহী আলতাফুননেছার বাবা নবাব আব্দুস সোবাহান চৌধুরীর কবরের পাশে দাফন করার জন্য কবর খনন করা হয়। তখন বগুড়ার পাঞ্জাবি নাগরিক জেলা প্রশাসক (ডিসি) মাফতুন আহম্মেদের কাছে বার্তা আসে, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের পরিকল্পনা হলো মোহাম্মদ আলীর কবরস্থান ঘিরে সৌধ নির্মাণ করা হবে। এ জন্য পর্যাপ্ত জায়গা থাকতে হবে। তখন কেন্দ্রীয় বড় জামে মসজিদের কবরস্থানে সে জায়গা ছিল না। তাই নবাববাড়ীর (নবাব প্যালেস) ছায়াঘেরা আমবাগানে মোহাম্মাদ আলীকে দাফন করা হয়। পরে মুজিব সরকারের আমলে মোহাম্মাদ আলীর সহধর্মিণী হামিদা বানুর মৃত্যু হলে তার লাশও ঢাকা থেকে বগুড়ায় এনে স্বামীর কবরের পাশে দাফন করা হয়।

মোহাম্মাদ আলীর ইন্তেকালের এক মাস পর তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান মোহাম্মাদ আলীর কবর জিয়ারত করতে বগুড়ায় আসেন। তিনি এ সময় নবাববাড়ীতে মোহাম্মাদ আলীর স্ত্রী, পুত্র, কন্যা ও পরিবারের অন্যদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। ১৯৫৩ সালে তিনি যখন পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী তখন রাজধানী ছিল করাচি। তার নাম স্মরণীয় করে রাখার জন্য করাচি মহানগরে ‘মোহাম্মাদ আলী বগুড়া’ নামে একটি সড়ক নামকরণ করা হয়, যা আজও বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু পরবর্তীতে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার তাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কবর ঘিরে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করেনি। ফলে কবরটি সাদামাটা অবস্থায় পড়ে আছে ৬৩ বছর ধরে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনেও তার অনেক ত্যাগ ও অবদান রয়েছে। ১৯৪৬ সালে অবিভক্ত বাংলার হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মন্ত্রী পরিষদে তিনি অর্থ ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন।

এ দিকে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি মরহুম মমতাজ উদ্দিনের কনিষ্ঠ পুত্র ও বগুড়া চেম্বার অব কমার্সের তৎকালীন সভাপতি মাসুদার রহমান মিলন ও তার কয়েক সহযোগী কবরের পাশের নবাববাড়ী প্যালেস ওয়াকফ সম্পত্তি সত্ত্বেও ক্রয় করেন। এরপর নবাব প্যালেস ভবন ভেঙে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়। নতুন প্রজন্ম ওই এলাকায় গেলে বুঝতেই পারবে না সেখানে একসময় নবাববাড়ী ছিল, যেখান থেকে অবিভক্ত পাকিস্তান ও ভারতবর্ষের প্রশাসন ও মুসলিম লীগের রাজনীতি পরিচালিত হতো। বর্তমানে কবরস্থানটি অযতœ অবহেলায় রয়েছে। কবরের কোনো বেড়িকেড না থাকায় কবর চিহ্ন মুছে যাওয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।

এ ব্যাপারে প্রবীণ সাংবাদিক ও ইতিহাসবিদ আব্দুর রহিম বগরা বলেন, নবাববাড়ীও আমবাগান দুইটি দাগে ১০ বিঘা সম্পত্তি রয়েছে। এই সম্পত্তি নবাব পরিবার সরকারকে ওয়াকফ করে দিয়েছেন। কিন্তু মোহাম্মাদ আলীর মৃত্যুর পর নব্বই দশকে নবাব প্যালেসের পাশে মোহাম্মাদ আলীর পুত্র হামদে আলী চৌধুরী অবৈধভাবে ওয়াকফ সম্পত্তি বিক্রি করে দেন। যেখানে বর্তমানে নবাব আলতাফ আলী চৌধুরী মার্কেট, পাশে আল আমিনশপিং কমপ্লেক্স ও টিএমএসএস মহিলা মার্কেট নির্মাণ করা হয়। সর্বশেষ গত কয়েক বছর আগে আওয়ামী লীগ আমলে জেলা আওয়ামী লীগের নেতা মাসুদার রহমান মিলন ও তার কয়েক ব্যবসায়ী পার্টনার নবাববাড়ী ভবনসহ আমবাগান ক্রয় করে সুরম্য ভবনটি ভেঙে ফেলেন। সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণের পরিকল্পনার কথা শোনা গেলেও তা আর বাস্তবায়ন হয়নি। তাই সরকারের কাছে দাবি নবাব পরিবারের ১০ বিঘা জমি ওয়াকফ সম্পত্তি তদন্ত করা হোক। এই জমি কেউ ক্রয়-বিক্রয় করতে পারেন না। মরহুম খালেদা জিয়ার সরকারের (১৯৯১-৯৬) আমলে তদন্ত করে ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে প্রতিবেদন পাওয়া যায়। তারপর ওই সম্পত্তি উদ্ধারে সরকারের কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। বগুড়াবাসী মোহাম্মাদ আলীর কবর রক্ষা এবং ওয়াকফ সম্পত্তি উদ্ধারে সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।