কালীগঞ্জ (গাজীপুর) সংবাদদাতা
গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার মান, প্রশাসনিক কার্যক্রম ও অবকাঠামোগত ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে উপজেলার ১২৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকদের নিয়মিত দেরিতে উপস্থিত হওয়ার অভিযোগ দীর্ঘ দিনের। এতে পাঠদান, প্রশাসনিক কার্যক্রম ও শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন অভিভাবক ও স্থানীয় সচেতনমহল।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার অনেক প্রধান শিক্ষক জয়দেবপুর, টঙ্গী, উত্তরা ও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। ফলে প্রতিদিন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে কর্মস্থলে আসতে গিয়ে অনেকেই নির্ধারিত সময়ের পরে বিদ্যালয়ে পৌঁছান। সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী বিদ্যালয় শুরুর আগেই প্রধান শিক্ষকের উপস্থিত থাকার কথা। কারণ বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা, শিক্ষক-কর্মচারীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও শৃঙ্খলা রক্ষা, সকালের সমাবেশ পরিচালনাসহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তার ওপর ন্যস্ত থাকে।
অভিভাবকদের অভিযোগ, অনেক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকরা উপজেলা শিক্ষা অফিসে যাওয়ার কথা বলে দুপুরের আগেই বিদ্যালয় ত্যাগ করেন। ফলে প্রশাসনিক কার্যক্রমে শৃঙ্খলা ব্যাহত হয় এবং শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক পাঠদানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সরেজমিন বিভিন্ন বিদ্যালয় ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ বিদ্যালয়ে অভিভাবকদের বসার জন্য কোনো ছাউনি নেই। অনেক বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত ওয়াশ ব্লক ও স্যানিটেশন সুবিধার অভাব রয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাও কঠিন হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের পাঠদক্ষতা ও মৌলিক গণিত দক্ষতা অর্জনের বিষয়েও কার্যকর তদারকির ঘাটতি রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এদিকে শিক্ষক পদায়ন নিয়েও রয়েছে অসন্তোষ। অভিযোগ রয়েছে, কোথাও প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষক বেশি, আবার কোথাও শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম হলেও শিক্ষকসংখ্যা তুলনামূলক বেশি। কয়েকটি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ২০ থেকে ৩০ জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ বলে জানা গেছে। ফলে জনবল ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয়েছে।
উপজেলায় প্রায় ৮০০ শিক্ষক কর্মরত থাকলেও গত মাসে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচনের কার্যক্রমে মাত্র ১২ জন শিক্ষক অংশ নেন। এ নিয়ে শিক্ষকদের একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। তাদের অভিযোগ, প্রস্তুতির জন্য যথাসময়ে প্রয়োজনীয় তথ্য ও নির্দেশনা দেয়া হয়নি।
অভিভাবক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, একজন প্রধান শিক্ষক শুধু শ্রেণিকক্ষের শিক্ষক নন, তিনি একটি বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক প্রধানও। তাই শিক্ষার্থীদের সময়ানুবর্তিতা শেখানোর আগে শিক্ষকদের নিজেদেরই তা অনুসরণ করা প্রয়োজন। তাদের মতে, দায়িত্বশীলতা, জবাবদিহিতা ও নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত না হলে প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি দুর্বলই থেকে যায়।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জেসমিন আক্তার অভিযোগের সত্যতা আংশিক স্বীকার করে বলেন, ‘কিছু শিক্ষক মাঝে মাঝে বিদ্যালয়ে দেরিতে পৌঁছান। আমি যোগদানের পর থেকে নিয়মিত বিদ্যালয় পরিদর্শন করছি। যারা নিয়মিত দেরি করেন, তাদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো: মাসুদ ভূঁইয়া বলেন, ‘শিক্ষা ব্যবস্থাপনা ও কিছু প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়টি জেনেছি। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেয়া হবে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ টি এম কামরুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের নিয়ে সভা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।’
স্থানীয়দের দাবি, সময়মতো বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, শিক্ষক পদায়নে ভারসাম্য আনা এবং নিয়মিত তদারকি জোরদার করা না হলে কালীগঞ্জের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্কট আরো গভীর হতে পারে।



