নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকার বায়ুমানে স্বস্তি ফিরেছে। দীর্ঘদিন পর বিপজ্জনক মাত্রা থেকে বায়ু দূষণ গড়ে ৪৩ শতাংশ থেকে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। গতকাল দুপুরে ঢাকার এয়ার কোয়ালিটি ইনডেস্ক বা একিউআই ছিল ৭৯। বায়ুমান সূচক অনুযায়ী এই স্কোরকে ‘ভালো’ হিসেবে গণ্য করা হয়। এই স্কোর নিয়ে বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকার ২৬তম স্থানে নেমেছে ঢাকা। যেখানে সাধারণ সময়ে ঢাকার স্কোর ১৫০ থেকে ২০০-এর উপরে (অস্বাস্থ্যকর) থাকে। সেখানে গতকালের উন্নতি নগরবাসীর জন্য এক বিশাল স্বস্তি নিয়ে এসেছে।
বর্তমানে বাতাসের মান এমন সহনীয় পর্যায়ে থাকলে শ্বাসকষ্ট, অ্যালার্জি এবং ফুসফুসের সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি অনেকটাই কম থাকবে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, মূলত ৫ কারণে রাজধানীতে দূষণ কমেছে। এরমধ্যে রয়েছে বৃষ্টিপাতে ধূলিকণা ধুয়ে যাওয়া, শক্তিশালী মৌসুমি বায়ুর প্রবাহ, নির্মাণকাজ সাময়িক স্থবির থাকা, ইটের ভাটার কার্যক্রম বন্ধ ও শুষ্ক রাস্তার ধুলাবালু কমে যাওয়া। তবে বৃষ্টি থেমে গেলে আবারো আগের মতো দূষণ ছড়িয়ে পড়বে।
বিগত সময়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় অন্যান্য স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে গতকাল ঢাকার বায়ু দূষণ গড়ে ৪৩ শতাংশ থেকে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। বছরের সাধারণ শুষ্ক দিনগুলোতে বা বৃষ্টিহীন সময়ে ঢাকার গড় বায়ু মান সূচক সাধারণত ১৫০ থেকে ১৬৩ এর আশেপাশে থাকে। সেই অস্বাস্থ্যকর দিনগুলোর তুলনায় বর্তমানে বৃষ্টির দিনে ঢাকার বায়ু দূষণ প্রায় ৪৩ কমে এসেছে।
অন্য দিকে শীতকালে তাপমাত্রা বিপর্যয়ের কারণে ধোঁয়া ও ধূলিকণা মাটির কাছাকাছি আটকে থাকে। ওই সময়ে ঢাকার বায়ু মান সূচক প্রায়ই ২৬০ থেকে ২৭০ (অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর) ছাড়িয়ে যায়। শীতকালের সেই ভয়াবহ অবস্থার তুলনায় এখন ঢাকার বায়ু দূষণ প্রায় ৬৫ শতাংশ কমে গেছে।
এ বিষয়ে পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন এবং পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, দূষণ কমার মূল কারণ হলো বৃষ্টিপাত। বৃষ্টির ফোঁটা বাতাসে ভাসমান অতি সূক্ষ্ম ক্ষতিকর কণা, যেমন পিএম ২.৫ এবং পিএম ১০কে ধরে মাটিতে নামিয়ে আনে। এর ফলে বাতাস পুরোপুরি ফিল্টার বা পরিষ্কার হয়ে যায়।
অন্য দিকে শক্তিশালী মৌসুমি বায়ুর প্রবাহ বর্তমানে বর্ষাকাল চলায় বঙ্গোপসাগর থেকে আসা দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বেশ সক্রিয়। এই তীব্র বাতাস ঢাকার আকাশে জমে থাকা যানবাহন ও কলকারখানার দূষিত ধোঁয়া এবং গ্যাসকে দ্রুত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে উড়িয়ে নিয়ে যায়। ফলে বাতাসে দূষণের ঘনত্ব কম থাকে।
নির্মাণকাজ সাময়িক স্থবির থাকা : টানা বৃষ্টির কারণে ঢাকা শহরের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ, রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি এবং বহুতল ভবনের নির্মাণকাজ সাময়িকভাবে বন্ধ বা ধীরগতিতে চলছে। ফলে বাতাসে নতুন করে সিমেন্ট, বালু বা ধুলাবালু ছড়াতে পারেনি। তিনি বলেন, ঢাকার বায়ু দূষণের অন্যতম বড় উৎস হলো এর চারপাশের সনাতন পদ্ধতির ইটের ভাটাগুলো। বর্ষা মৌসুমের কারণে এই ভাটাগুলোর বেশির ভাগই এখন সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। ফলে বাতাস কয়লা ও কাঠের বিষাক্ত কালো ধোঁয়া থেকে মুক্ত রয়েছে। এ ছাড়া সাধারণত ঢাকার রাস্তায় যানবাহনের চাকার ঘূর্ণনে শুকনো ধুলাবালু বাতাসে উড়ে কুয়াশার মতো তৈরি করে। বৃষ্টির কারণে রাস্তাঘাট ভেজা থাকায় গতকাল ধুলা ওড়ার কোনো সুযোগ ছিল না।
তার ভাষ্য, কেবল বৃষ্টির ওপর নির্ভর না করে এই শুষ্ক ও পরিষ্কার বাতাসের ধারা ধরে রাখতে হলে এখনই জরুরি কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করা, শুষ্ক মৌসুমেও নিয়মিত রাস্তায় পানি ছিটানো এবং ঢাকার চারপাশের অবৈধ ইট ভাটাগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া।
এর আগে সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশে বায়ু দূষণ ক্রমেই ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সঙ্কটে পরিণত হচ্ছে। বিশেষ করে সূক্ষ্ম ধূলিকণা দূষণের কারণে দেশে প্রতি বছর প্রায় ৮৮ হাজার ২৪০ জনের অকালমৃত্যু হচ্ছে, যা দৈনিক গড়ে প্রায় ২৪২ জন। একই সাথে এ দূষণের কারণে বছরে প্রায় ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় দুই লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৫ শতাংশ।



