নিজস্ব প্রতিবেদক
দীর্ঘদিনের হতাশা কাটিয়ে এবার বাজেটে টেলিকম খাতের ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীরা আশার আলো দেখছে। অতীতে মোবাইল ফোন অপারেটরদের দাবি-দাওয়ার গুরুত্ব নামমাত্র থাকলেও সিমের ওপর সুনির্দিষ্ট আরোপিত কর প্রত্যাহারসহ এবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সংশ্লিষ্ট খাতে অন্তত ১০টি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে মোবাইল সিমকার্ডের ওপর ৩০০ টাকার কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। খাতটির নানা অনুসঙ্গে দেয়া হয়েছে প্রণোদনা।
গতকাল জাতীয় সংসদে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেন। নতুন অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা দেন তিনি। বাজেট অধিবেশনের বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী টেলিকম খাতকে ‘থ্রাস্ট সেক্টর’ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগের কথা জানিয়ে বলেন, বর্তমানে টেলিযোগাযোগ খাতে করের হার প্রায় ৫০ শতাংশ। তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে তা প্রায় ২৫ শতাংশ। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় এ হার অনেক বেশি। তাই এ খাতের বিকাশে সরকার এ ধরনের ট্যাক্স ক্রমান্বয়ে যৌক্তিক হারে কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
মোবাইল সিমের ওপর কর প্রত্যাহার : বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের সাধারণ মানুষের কাছে মোবাইল সেবা আরো সহজলভ্য করতে প্রতিটি সিমের ওপর আরোপিত ৩০০ টাকা হারে কর সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহারের প্রস্তাব করছি। তবে এই সিদ্ধান্তে আগামী অর্থবছরে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা রাজস্ব আয় কমবে।
মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবায় উৎসে কর হ্রাস : মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবা খাতে উৎসে কর হার ১২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, এই পদক্ষেপ অপারেটরদের আর্থিক চাপ কিছুটা কমাবে এবং নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও সেবার মান উন্নয়নে সহায়ক হবে।
বিটিআরসির রাজস্ব আয়ের কর প্রত্যাহার : বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) আদায় করা রেভিনিউ শেয়ার, লাইসেন্স ফি এবং অন্যান্য চার্জের ওপর প্রযোজ্য ২০ শতাংশ উৎসে কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।
মোবাইল ফোনের কাঁচামাল আমদানিতে কর ছাড় : দেশীয় মোবাইল ফোন উৎপাদন শিল্পকে উৎসাহিত করতে মোবাইল হ্যান্ডসেট উৎপাদনে ব্যবহৃত ২২ ধরনের কাঁচামাল আমদানিতে বিদ্যমান ৫ শতাংশ ও ২ শতাংশ অগ্রিম কর কমিয়ে ১ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সাথে দেশে মোবাইল ফোন উৎপাদনের কাঁচামাল ও উপকরণ আমদানিতে বিদ্যমান শুল্ক ও কর অব্যাহতি সুবিধা ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। সেই সাথে মোবাইল ফোন উৎপাদন ও সংযোজনের ক্ষেত্রে শর্তসাপেক্ষ মূল্য সংযোজন কর (মূসক) অব্যাহতি সুবিধার মেয়াদ ৩০ জুন ২০৩০ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
জিডিপিতে ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য : এ ছাড়া বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমানে দেশের জিডিপিতে আইসিটি ও টেলিকম খাতের অবদান মাত্র ১-২ শতাংশ। তবে যথাযথ পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরে এ অবদান ১০ শতাংশে উন্নীতের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকার মনে করছে, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আইসিটি খাত আগামী দিনে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হতে পারে।
কম্পিউটার ও ডিজিটাল পণ্যে শুল্ক হ্রাস : তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে উৎসাহিত করতে কম্পিউটার প্রিন্টার, পোর্টেবল অটোমেটিক ডাটা প্রসেসিং মেশিন, ফ্ল্যাশ মেমোরি ও কম্পিউটার মনিটর আমদানিতে ৫ শতাংশ অগ্রিম কর কমিয়ে ২ শতাংশে নামানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ল্যাপটপ, ডেস্কটপ, সার্ভার, প্রিন্টার ও মনিটর আমদানিতে সব ধরনের আমদানি শুল্ক, রেগুলেটরি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এসএসডি আমদানিতে ৫ শতাংশ শুল্ক ছাড়া বাকি সব কর প্রত্যাহারের প্রস্তাবও রয়েছে।
স্মার্টকার্ড ও ডিজিটাল আইডি উৎপাদনে রেয়াতি সুবিধা : ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডের মতো ডিজিটাল সেবা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে স্মার্টকার্ড ও ব্যাংক কার্ড উৎপাদনে ব্যবহৃত ১০টি কাঁচামালে রেয়াতি সুবিধা দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
ফ্রিল্যান্সিং ও কনটেন্ট ক্রিয়েশন খাতে কর অব্যাহতি : বর্তমানে শুধু আইটি ফ্রিল্যান্সিংয়ের আয় কর অব্যাহতির আওতায় থাকলেও তা সব ধরনের ফ্রিল্যান্সিং আয়ে সম্প্রসারণের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। একই সাথে কনটেন্ট ক্রিয়েশন থেকে অর্জিত সব আয় করমুক্তের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সারদের সেবার ওপর আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট সম্পূর্ণভাবে অব্যাহতির প্রস্তাব করা হয়েছে।
নারী ও তরুণ উদ্যোক্তা তৈরিতে তহবিলের প্রস্তাব : তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সম্ভাবনা বিবেচনায় নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে আগামী অর্থবছরে ৫০০ কোটি টাকার বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই অর্থ ‘স্টার্টআপ তহবিল’ হিসেবে ব্যবহৃত হবে। এই তহবিল নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টি, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং তরুণ উদ্যোক্তা গড়ে তোলার কাজে ব্যবহৃত হবে বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এআই-চালিত ডেটা সেন্টার আধুনিকায়ন : সরকারি পরিকল্পনা ও সেবা প্রদানে এআই-চালিত ডেটা সেন্টার ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে আরো কার্যকর ও গতিশীল করার উদ্যোগ নেয়া হবে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে নাগরিক সেবার মানোন্নয়ন, প্রশাসনিক কার্যক্রমে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
দুই বছরে ৯০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর কাছে ৫জি : বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করা হয়েছে, আগামী দুই বছরের মধ্যে দেশের ৯০ শতাংশ মানুষের কাছে ৫জি সেবা পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে মোবাইল অপারেটর ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পাশাপাশি শহর ও গ্রামাঞ্চলে ১০০ এমবিপিএস থেকে ১ জিবিপিএস গতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট নিশ্চিতের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ¦ালানি আমদানি করমুক্ত : এ দিকে নবায়নযোগ্য ও টেকসই জ¦ালানির সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ ও নিরাপদ উৎস সৌর বিদ্যুৎখাতের প্রসারে এই খাত সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ উপকরণগুলো আমদানিতে প্রযোজ্য আমদানি শুল্ক, রেগুলেটরি শুল্ক এবং আগামকর শূণ্য শতাংশ করে একটি নতুন প্রজ্ঞাপন জারির প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। যা ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত বহাল রাখার প্রস্তাব করেছেন তিনি।
তবে দেশে এই খাত সংশ্লিষ্ট পণ্যের উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে এবং দেশীয় শিল্পের বিকাশে মাউন্টিং স্ট্রাকচার, লিথিয়াম সেল, ব্যাটারি প্যাক, ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম ইত্যাদি পণ্যগুলোর রেয়াতি সুবিধা ২০২৮ সালের ৩০ জুনের পর প্রত্যাহারের প্রস্তাব করেন। সৌর বিদ্যুৎ ছাড়াও দেশে ইলেকট্রিক গাড়ি (ইভি) উৎপাদন শিল্পে বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে শুল্ক কর অব্যাহতির ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।



