আশিকুর রহমান
দীর্ঘ চার দশকের অপেক্ষা, যুদ্ধ-বিধ্বস্ত বাস্তবতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার জটিল ইতিহাস পেরিয়ে অবশেষে আবারো বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে ফিরেছে ইরান। ২০২৬ সালের ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জনের মাধ্যমে ইরাক শুধু একটি টুর্নামেন্টে জায়গা করে নেয়নি বরং একটি জাতির দীর্ঘ সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে নতুন ইতিহাস লিখেছে।
১৯৮৬ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপে প্রথমবার অংশ নেয়ার পর থেকে ইরাক আর কখনো এই মঞ্চে ফিরতে পারেনি। সেই একই মেক্সিকোতে আবারো বলিভিয়াকে হারিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয়ার ঘটনা যেন ইতিহাসের এক গভীর প্রতিধ্বনি।
ইরাক এবার পড়েছে বিশ্বকাপের সবচেয়ে কঠিন গ্রুপগুলোর একটিতে, যেখানে প্রতিপক্ষ হিসেবে রয়েছে বিশ্ব ফুটবলের শক্তিশালী তিন দল- ফ্রান্স, নরওয়ে ও সেনেগাল। প্রথম ম্যাচেই তাদের মুখোমুখি হতে হবে নরওয়ের, যেখানে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর স্ট্রাইকার আলিং হ্যালান্ডের নেতৃত্বে শক্তিশালী আক্রমণভাগ অপেক্ষা করছে।
এই গ্রুপকে অনেক ‘গ্রুপ অব ডেথ’ বলছেন। তবে ইরাকের জন্য এটি একই সাথে নিজেদের প্রমাণ করার এক বিরল সুযোগ।
ইরাকের এই দলটি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। ইউরোপের বিভিন্ন লিগে খেলা তরুণদের কারণে ইরাক এখন আর শুধুই আঞ্চলিক শক্তি নয় বরং একটি উন্নয়নশীল ফুটবল জাতি।
দলের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন খেলোয়াড় যেমন, আলি আল হামাদি ইংল্যান্ডের ইপসউইচ টাউনে খেলে আক্রমণভাগে গতি এনেছেন, জিদান ইকবাল সাবেক ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড মিডফিল্ডার, বর্তমানে ইউরোপে খেলছেন, কেভিন ইয়াকুব ডেনমার্কে আরহুশ ক্লাবের হয়ে লিগ শিরোপা জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এই খেলোয়াড়রা দলের খেলায় টেকনিক, গতি এবং আধুনিক ইউরোপিয়ান ফুটবলের ছাপ এনেছেন।
ইরাকের এই ঐতিহাসিক যাত্রায় শুধু খেরোয়াড়রাই ভূমিকা পালন করেননি, রয়েছে কোচেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, গ্রাহাম আর্নল্ড। ২০২৫ সালে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই তিনি দলকে নতুন কাঠামোয় গড়ে তোলেন। তিনি এর আগে ২০২২ বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়াকে শেষ ষোলোতে তুলেছিলেন। ইরাকের ক্ষেত্রেও তার প্রভাব স্পষ্ট। বাছাইপর্বে দীর্ঘ ২১ ম্যাচের কঠিন পথ পাড়ি দেয়া, তৃতীয় ও চতুর্থ রাউন্ডে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স অব্যাহত রাখা, সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ প্লে-অফ জয় এবং শেষ ম্যাচে বলিভিয়াকে হারিয়ে বিশ্বকাপের মূলপর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন। তার অধীনে ইরাক এখন একটি সংগঠিত, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও প্রতিযোগিতামূলক দল। বিশ্বকাপের মূলপর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জনের খবর ছড়িয়ে পড়তেই বাগদাদসহ পুরো ইরাকে শুরু হয় বিশাল উৎসব। মানুষ রাস্তায় নেমে পতাকা হাতে উদযাপন করে, খোলা বাসে খেলোয়াড়দের বরণ করে নেয় হাজার হাজার সমর্থক।
টিভি সাংবাদিক নাওয়ার ফায়েক আল-রিকাবির মতে, ‘মানুষ ভাবছে আমরা দুর্বল কিন্তু আমাদের খেলোয়াড়দের কোনো চাপ নেই। তারা স্বাধীনভাবে খেলতে পারবে এবং চমক দেখাতে পারে।’ এই উদযাপন ছিল শুধু একটি ফুটবল জয়ের নয় বরং ৪০ বছরের কষ্ট, বেদনা ও অপেক্ষার অবসানের প্রতীক।
ইরাকের ফুটবল ইতিহাস রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে কখনো আলাদা ছিল না। দেশটি দীর্ঘ সময় ধরে একাধিক বড় সঙ্কটের মধ্য দিয়ে গেছে। ইরান-ইরাক যুদ্ধ, উপসাগরীয় যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, ২০০৩ পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা এসব কারণে জাতীয় ফুটবল দল কখনোই নিয়মিত প্রস্তুতি নিতে পারেনি। অনেক সময় নিজেদের দেশে ম্যাচ খেলার সুযোগও ছিল না।
১৯৮০-এর দশকে সাদ্দাম হোসেনের শাসনামলে ফুটবল ছিল রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের একটি মাধ্যম। তার ছেলে উদে হোসেন জাতীয় দলের ওপর কঠোর শাসন চাপিয়ে দেয়। সেই সময় খেলোয়াড়দের শারীরিক নির্যাতন, অপমানজনক শাস্তি, জোরপূর্বক কঠোর অনুশীলন (যেমন কংক্রিটের বল ব্যবহার), ব্যর্থতার জন্য কারাদণ্ডের হুমকিসহ আরো নানাবিদ সমস্যার মুখোমুখি হতে হতো।
এই অমানবিক পরিবেশ সত্ত্বেও খেলোয়াড়রা দেশকে প্রতিনিধিত্ব করে গেছেন, যা আজো ইরাক ফুটবলের ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত।
২০০৩ সালের পর নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে ইরাক দীর্ঘ দিন নিজেদের দেশে আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজন করতে পারেনি। ম্যাচগুলো খেলতে হয়েছে জর্দান, মালয়েশিয়া, ইরানসহ বিভিন্ন দেশে। অবশেষে ২০২০ সালে ফিফা বসরা শহরকে আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনের অনুমতি দেয়, যা ছিল এক ঐতিহাসিক মাইলফলক।
১৯৮৬ বিশ্বকাপে ইরাক তিন ম্যাচেই হেরে বিদায় নেয়, তবে অভিজ্ঞতা ছিল অমূল্য। প্যারাগুয়ে, বেলজিয়াম ও মেক্সিকোর মতো দলের বিপক্ষে খেলা অনেক বড় একটি অর্জন ছিল ইরাকি ফুটবলারদের জন্য।একটি ম্যাচে কিংবদন্তি আহমেদ রাধির গোল বাতিল হয় বিতর্কিত রেফারিংয়ের কারণে, যা আজো দেশটির ফুটবল ইতিহাসে আলোচিত। করিম আল্লাওয়ির মতে, ‘আমরা কাছাকাছি ছিলাম; কিন্তু তখন অভিজ্ঞতা ও সিদ্ধান্ত আমাদের পক্ষে ছিল না।’
ইরাকের জন্য এবারের লক্ষ্য বাস্তবসম্মত হলেও উচ্চাকাক্সক্ষী। ১৯৮৬-এর চেয়ে ভালো পারফরম্যান্স করা। অন্তত একটি জয় পেতে চায় ইরাক। এ ছাড়া গ্রুপপর্বেও ম্যাচগুলোতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদেও সক্ষমতা প্রমাণ করা। করিম আল্লাওয়ির ভাষায়, ‘একটি গোল করা, একটি ম্যাচ জেতা, এগুলোই হবে নতুন ইতিহাস।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপিয়ান লিগে খেলা খেলোয়াড়দের উপস্থিতি, আধুনিক কোচিং ও ট্যাকটি, উন্নত ফিটনেস ও প্রস্তুতি এবং মানসিকভাবে স্বাধীন ও চাপমুক্ত পরিবেশ থাকায় এই দলটি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী। ইরাকের এই প্রত্যাবর্তন শুধু খেলাধুলার গল্প নয়, এটি একটি জাতির পুনর্জাগরণের প্রতীক। যুদ্ধ, ধ্বংস, নিষেধাজ্ঞা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও ফুটবল যে মানুষকে একত্রিত করতে পারে ইরাক তার জীবন্ত উদাহরণ। সূত্র বিবিসি।



