বাংলাদেশে নীরব এক পরিবেশগত বিপর্যয় ক্রমেই গভীর হচ্ছে। আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে ভূগর্ভের পানির স্তর। কয়েক দশক আগেও যেখানে অল্প গভীরতায় নলকূপে পানি পাওয়া যেত, এখন রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বহু অঞ্চলে কয়েকগুণ গভীরেও মিলছে না পানি। উত্তরাঞ্চলের বরেন্দ্র এলাকা, গাজীপুর, ঢাকা ও শিল্পাঞ্চলগুলোতে পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
তাদের সতর্কবার্তা- এভাবে পানির স্তর নেমে যেতে থাকলে বাংলাদেশ সামনে বড় ধরনের ‘পানি বিপর্যয়’-এর মুখে পড়তে পারে। এতে শুধু সুপেয় পানির সঙ্কট নয়, কৃষি উৎপাদন, নগরজীবন, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও অবকাঠামোও বড় ঝুঁকিতে পড়বে।
১০ বছরে কোথায় কতটা নিচে নেমেছে পানির স্তর
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বিডব্লিউডিবি) গত এক দশকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পাঁচ মিটার থেকে ২৪ মিটার পর্যন্ত নিচে নেমেছে। রাজধানী ঢাকায় পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। নগরীতে প্রতি বছর গড়ে দুই থেকে তিন মিটার পর্যন্ত পানির স্তর নিচে নামছে।
সমীক্ষা অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালে ঢাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ছিল প্রায় ২৫ মিটার গভীরে। দুই দশকের ব্যবধানে তা ৭৫ মিটারেরও নিচে চলে গেছে। বর্তমানে রাজধানীর কিছু এলাকায় ৮০ থেকে ৮৬ মিটার গভীরে গিয়েও পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যাচ্ছে না।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য প্রদান সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘প্রায় ১২ বছর আগে ঢাকার অনেক এলাকায় ২২ থেকে ২৬ মিটার নিচে পানি পাওয়া যেত। এখন অনেক জায়গায় ৮৫ মিটারেও পর্যাপ্ত পানি মিলছে না। সবচেয়ে বেশি সঙ্কটে রয়েছে ঢাকা, গাজীপুর ও বরেন্দ্র অঞ্চল।’
দেশের ভূগর্ভস্থ পানির বড় অংশ যাচ্ছে কোথায়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের সুপেয় পানির প্রধান উৎসই এখন ভূগর্ভস্থ পানি। শহরাঞ্চলে ওয়াসা এবং গ্রামাঞ্চলে কোটি কোটি নলকূপের মাধ্যমে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পানি উত্তোলন করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি কৃষি খাতে বিশেষ করে বোরো ধান চাষে সেচের জন্য ব্যাপক হারে গভীর নলকূপ ব্যবহার পরিস্থিতিকে আরো সঙ্কটময় করে তুলছে।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) একাধিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে সেচনির্ভর কৃষির বড় অংশই ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। উত্তরাঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমে পানির ব্যবহার সবচেয়ে বেশি।
পানির স্তর নিচে নামার কারণ
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণ হলো নিয়ন্ত্রণহীনভাবে গভীর নলকূপ স্থাপন ও অতিরিক্ত পানি উত্তোলন। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে বোরো ধানকেন্দ্রিক সেচব্যবস্থা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি করছে। পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে শহরাঞ্চলে খোলা মাটি, খাল ও জলাশয় কমে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি মাটির নিচে প্রবেশ করতে পারছে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুকুর, বিল, খাল ও জলাধার ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানির স্বাভাবিক পুনর্ভরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও সাভারের শিল্পাঞ্চলে গভীর নলকূপের মাধ্যমে অতিরিক্ত পানি উত্তোলন পরিস্থিতিকে আরো জটিল করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘ খরা ও তাপমাত্রা বৃদ্ধিও বড় ভূমিকা রাখছে।
এ ছাড়া কংক্রিটনির্ভর নগর অবকাঠামো, গভীর নলকূপের সংখ্যা বৃদ্ধি, নদ-নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ কমে যাওয়া এবং দুর্বল নীতিমালা ও নজরদারির অভাব পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ না আনলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের পানিসঙ্কট দেখা দিতে পারে।
সামনে যে ৬ বড় ঝুঁকি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক এবং মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবদুর রব বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ ভয়াবহ পানিসঙ্কট, কৃষিসঙ্কট ও পরিবেশগত ঝুঁকির মুখে পড়বে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাওয়ায় বাংলাদেশ বহুমাত্রিক ঝুঁকির মুখে পড়ছে। সবচেয়ে বড় শঙ্কা হলো সুপেয় পানির তীব্র সঙ্কট। ভবিষ্যতে শহর ও গ্রামে নিরাপদ পানির সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। একই সাথে সেচনির্ভর কৃষি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। পানির অভাবে ধানসহ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন কমে গিয়ে খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, গভীর স্তর থেকে অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের ফলে আর্সেনিক, লোহা ও অন্যান্য ভারী ধাতুর দূষণও বাড়তে পারে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি সৃষ্টি করবে। এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের কারণে মাটির নিচে ফাঁপা স্তর তৈরি হয়ে ভূমি দেবে যাওয়া বা ভূমিধসের আশঙ্কা বাড়ছে।
উপকূলীয় এলাকাগুলোও নতুন বিপদের মুখে পড়তে পারে। মিঠাপানির স্তর নিচে নেমে গেলে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি ভেতরে প্রবেশ করবে, ফলে সুপেয় পানির সঙ্কট আরো তীব্র হবে। অন্যদিকে ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে ওয়াসার পানি সরবরাহ ব্যবস্থা আরো ব্যয়বহুল ও সঙ্কটপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
‘নীরব বিপর্যয়’ ঠেকাতে জরুরি ৭ পদক্ষেপ
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। তারা সাতটি জরুরি করণীয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন- ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনে কঠোর নিয়ন্ত্রণ; বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা; নগর এলাকায় জলাধার ও খাল পুনরুদ্ধার; শিল্পকারখানায় পানি ব্যবহারে সীমানির্ধারণ; বিকল্প পানির উৎস বাড়ানো; সেচে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং জাতীয় পানি ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত নীতি বাস্তবায়ন।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, বাংলাদেশে পানির সঙ্কট এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়; এটি ধীরে ধীরে বর্তমানের বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে আগামী এক দশকে দেশের বহু অঞ্চল ‘পানি-সঙ্কট অঞ্চল’ হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে।



