ইসলামী ব্যাংকে জরুরি তারল্য সহায়তা দেয়া হবে : গভর্নর

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি থেকে আমানতকারীদের টাকা তুলতে কোনো সমস্যা হবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো: মোস্তাকুর রহমান।

তিনি বলেছেন, গ্রাহকদের আমানত সুরক্ষায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ কিছু নীতি ও কৌশল (টুলস) রয়েছে, যা আগামী কয়েক দিনের মধ্যে প্রয়োগ করা হবে। ফলে আমানতকারীরা যেকোনো সময় তাদের টাকা তুলতে পারবেন এবং এ জন্য ইসলামী ব্যাংককে প্রয়োজনীয় জরুরি তারল্য সহায়তা (ইমার্জেন্সি লিকুইডিটি সাপোর্ট) দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক।

গতকাল শুক্রবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে গভর্নর এসব কথা বলেন।

সংবাদ সম্মেলনে ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম ও অর্থপাচার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মোস্তাকুর রহমান বলেন, ‘আমি যখন দায়িত্ব নিই, তখন ব্যাংকিং খাতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বা ৩৫ থেকে ৩৬ শতাংশ টাকা খেলাপি ঋণ (এনপিএল) হিসেবে চুরি হয়ে গেছে। এই বিপুল পরিমাণ আমানত চুরি ও পাচার হওয়া একটি ব্যাংকিং ব্যবস্থা বজায় রাখা ও একে স্থিতিশীল করতে সবাইকে কিছুটা ধৈর্য ধরতে হবে।’ তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যারা ব্যাংকের টাকা চুরি করেছে, তাদের শান্তিতে থাকতে দেয়া হবে না। তবে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা অত্যন্ত কঠিন এবং বিশ্বে এই হার মাত্র ২ শতাংশ হলেও টাকা ফিরিয়ে আনতে জোরেশোরে কাজ চলছে এবং কিছু টাকা ইতোমধ্যে ফেরত এসেছে।

ইসলামী ব্যাংকের সার্বিক পরিস্থিতি ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ নাকচ করে গভর্নর জানান, ঈদের আগে ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান পদত্যাগ করেন। ন্যূনতম পাঁচজন সদস্য ছাড়া বোর্ড চালানো সম্ভব নয় বলে তাৎক্ষণিকভাবে একজনকে নিয়োগ দেয়া হয়। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত পাঁচ সদস্যের বোর্ডের একজনের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ থাকায় গত ১৬ মার্চ তাকে পরিবর্তন করা হয়েছে। এর বাইরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বোনাস, বদলি বা পদোন্নতিতে কোনো হস্তক্ষেপ করেনি। তবে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ইসলামী ব্যাংকের ঋণ-আমানত অনুপাত (এডিআর) যেখানে ৯৩ শতাংশ ছিল, তা বর্তমানে ৯৭-৯৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে; অথচ নির্ধারিত সীমা হলো ৯২ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বর্তমান ম্যানেজমেন্টকে এটি দ্রুত কমিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছে। এ ছাড়া পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যারের (সিবিএস) মধ্যে সমন্বয়ের অভাব দূর করতেও কাজ চলছে।

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক প্রসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজব নাকচ করে গভর্নর বলেন, ‘বর্তমান সরকার আসার পর এই ব্যাংকের কার্যক্রম বন্ধ হয়নি। চেয়ারম্যানের পদত্যাগ এবং মনোনীত এমডির দায়িত্ব নিতে অপারগতার পর আমরা নিয়ম মেনে বিজ্ঞাপন দিয়ে মে মাসের শেষে নতুন এমডি ও চেয়ারম্যান নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছি। বর্তমানে বোর্ডের কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে এবং গত বুধ-বৃহস্পতিবারে নতুন চেয়ারম্যান প্রথম সফল সভাও করেছেন।’

তিনি আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) নিয়ে সুখবর দিয়ে বলেন, আগামী এক বা দুই সপ্তাহের মধ্যে কয়েকটি সমস্যাগ্রস্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সমাধানপ্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। এর ফলে দীর্ঘ ১২ বছর ধরে যেসব আমানতকারী টাকা পাচ্ছিলেন না, তারা তাদের টাকা ফেরত পাবেন।

‘ঋণখেলাপি’ গুঞ্জন নিয়ে ব্যাখ্যা

সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, গ্রাহকরা ব্যাংকে টাকা রাখতে আস্থা পাচ্ছেন না, কারণ অনেকে বলছেন গভর্নর নিজেই একজন ঋণখেলাপি। এই অভিযোগের জবাবে দেশের তৈরী পোশাক খাতের সফল উদ্যোক্তা ও হেরা সোয়েটার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: মোস্তাকুর রহমান বলেন, ‘আমি গভর্নর হওয়ার আগে একটি গ্রিন ফ্যাক্টরি লিগ সার্টিফিকেটের সাথে যুক্ত ছিলাম। ঋণ পরিশোধে কিছুটা বিলম্ব হওয়া আর ‘ঋণ খেলাপি’ (বিবিএল) হওয়া এক জিনিস নয়। আজ পর্যন্ত সেই কারখানা একদিনের জন্যও বন্ধ হয়নি, এক্সপোর্ট থামেনি কিংবা শ্রমিকদের বেতন দিতে এক মাসের জন্যও দেরি হয়নি। আমরা ব্যাংকের কাছে কোনো ঋণ মওকুফও চাইনি।’

বিলম্বের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, শুরুতে কারখানাটি ৪ শতাংশ সুদে এফএসএসপি প্রজেক্টের অধীনে ১৫০ কোটি টাকা অর্থায়ন পেয়েছিল। পরে ফান্ড শেষ হয়ে যাওয়ার অজুহাতে ব্যাংক সুদের হার ৯ থেকে ১১ শতাংশে উন্নীত করে। কোভিড পরিস্থিতি ও সুদের হার বৃদ্ধির কারণে আগের প্রজেকশন অনুযায়ী টাকা পরিশোধে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে ১০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ পরিশোধ করে দিয়েছে। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, বলতে বলতে অনেক সময় একটা মিথ্যা কথাকেও মানুষ সত্য বানিয়ে ফেলে।