গ্লোবাল পিস ইনডেক্স ২০২৬

দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ চতুর্থ শান্তিপূর্ণ দেশ

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

বিশ্বজুড়ে চলমান অস্থিরতার মাঝেই প্রকাশিত হয়েছে বৈশ্বিক শান্তি সূচক (জিপিআই) ২০২৬। এবারের তালিকায় প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের চেয়ে শান্তির মাত্রায় এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। গত ৯ জুন অস্ট্রেলিয়ার সিডনিভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিস’ (আইইপি) ১৬৩টি স্বাধীন দেশ ও ভূখণ্ড নিয়ে তৈরি এই সূচকের ২০তম সংস্করণ প্রকাশ করে। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৯৯.৭ শতাংশকে অন্তর্ভুক্ত করে করা এই মূল্যায়নে বাংলাদেশের শান্তির মাত্রাকে ‘মাঝারি’ ক্যাটাগরিতে রাখা হয়েছে।

তবে সামগ্রিক অবস্থানে স্বস্তির পাশাপাশি এই প্রতিবেদনে চলমান ইরান যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এক বড় ধরনের ঝুঁকির দিকও জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়েছে। আইইপি সতর্ক করে বলেছে, বাংলাদেশ মূলত একটি রফতানিমুখী ও জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ। ফলে বিশ্ববাজারে তরলিকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) চড়া দাম এবং বিশ্বব্যাপী চাহিদার পতনের কারণে দেশের অর্থনীতি বড় ধাক্কা খেতে পারে।

সঙ্কট যদি আরো ঘনীভূত হয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়, তবে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় দেশের মোট জিডিপির ১.৫ থেকে ২.৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। একই সাথে জ্বালানি আমদানির ওপর অতিনির্ভরতা, খাদ্যনিরাপত্তা ও পরিবেশগত হুমকির ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অবশ্য আর্থিক রাজস্ব ঝুঁকির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলকভাবে কম।

জিপিআইয়ের নিয়ম অনুযায়ী, ৫-এর মধ্যে যার স্কোর যত কম, সেই দেশে শান্তির মাত্রা তত বেশি। এই সূচকে বাংলাদেশের প্রাপ্ত সামগ্রিক স্কোর ২.২২৬ এবং বৈশ্বিক অবস্থান ১৬৩টি দেশের মধ্যে ১১৭তম। মূলত তিনটি প্রধান ক্ষেত্রে ২৩টি ভিন্ন ভিন্ন সূচক ব্যবহার করে এই শান্তির হিসাব করা হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশের প্রাপ্ত স্কোরের চিত্রটি হলো- সামাজিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষায় ২.৫৭৯, চলমান অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সঙ্ঘাতে ২.২৩৭ এবং সামরিকীকরণে ১.৬১৫।

এবারের সূচকে দক্ষিণ এশিয়ায় বরাবরের মতোই সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ দেশের অবস্থান ধরে রেখেছে ভুটান। বৈশ্বিক তালিকায় ১৬তম স্থানে থাকা এই দেশটিই দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র রাষ্ট্র, যার শান্তির মাত্রাকে ‘উচ্চ’ ক্যাটাগরিতে রাখা হয়েছে। এরপর ৬৭তম বৈশ্বিক অবস্থান নিয়ে এ অঞ্চলে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে শ্রীলঙ্কা এবং ১১১তম স্থানে রয়েছে নেপাল। অন্য দিকে চলমান সঙ্ঘাতের সূচকে ব্যাপক অবনতি হওয়ায় ‘নিম্ন’ শান্তির মাত্রায় নেমে গেছে ভারত। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের অবস্থান পঞ্চম এবং বিশ্বে ১২৭তম। এ ছাড়া যথাক্রমে ১৫২ ও ১৫৭তম স্থানে থাকা পাকিস্তান ও আফগানিস্তান বরাবরের মতোই এই অঞ্চলের সবচেয়ে অশান্ত ও অস্থিতিশীল দেশ হিসেবে তালিকার একেবারে নিচের দিকে রয়েছে।

প্রতিবেদনে আশঙ্কাজনক তথব্য দিয়ে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে শান্তির সূচকে সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক পতনটি দেখেছে দক্ষিণ এশিয়াই। এই অঞ্চলে শান্তির হার গড়ে ২.৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। মূলত ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা ও সীমান্ত-উত্তেজনার কারণে চলমান সঙ্ঘাতের সূচকটি ৭.১ শতাংশ পর্যন্ত খারাপের দিকে গেছে, যা এই ধসের প্রধান কারণ।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে টানা ১৯ বছরের মতো বিশ্বের সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ দেশের শীর্ষস্থানটি ধরে রেখেছে আইসল্যান্ড। তাদের ঠিক পরেই শীর্ষ পাঁচে রয়েছে যথাক্রমে নিউজিল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, স্লোভেনিয়া ও আয়ারল্যান্ড। বিপরীতে, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বের ‘সবচেয়ে কম শান্তিপূর্ণ’ বা সবচেয়ে অশান্ত দেশের তালিকায় সবার নিচে স্থান জুটেছে রাশিয়ার। সবচেয়ে অশান্ত দেশের তালিকায় রাশিয়ার পরেই রয়েছে সুদান, ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, ইউক্রেন ও ইসরাইল।

আইইপি জানিয়েছে, গত এক বছরে বৈশ্বিক শান্তির মাত্রা কমেছে ০.৭ শতাংশ; এ নিয়ে টানা ১২ বছর ধরে বিশ্বজুড়ে শান্তির সূচকে এই ধারাবাহিক অবনতি দেখা গেল। মূল্যায়নের আওতায় থাকা ১৬৩ দেশের মধ্যে ৯৯টি দেশেই শান্তির অবনতি ঘটেছে, বিপরীতে উন্নতি হয়েছে মাত্র ৬২টি দেশে। চরমভাবাপন্ন যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে প্রথম বছরেই বৈশ্বিক জিডিপি ০.৬ শতাংশ সঙ্কুচিত হতে পারে বলেও সতর্কবার্তা দেয়া হয়েছে। আর এই সম্ভাব্য বৈশ্বিক মন্দার সবচেয়ে নির্মম শিকার হবে দক্ষিণ এশিয়ার আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলো।