নিজস্ব প্রতিবেদক
বিশিষ্ট নগর পরিকল্পনাবিদ ও প্রকৌশলী ইঞ্জিনিয়ার আবু আমির মোহাম্মদ জিয়া হোসাইন ইন্তেকাল করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার এই কৃতী সন্তান ঢাকা এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত মঙ্গলবার রাতে ইন্তেকাল করেছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল ৯২ বছর। তিনি কোরিয়ান গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি ইয়ংওয়ানের চিফ অ্যাডভাইজার এবং আনোয়ারা-কর্ণফুলী ইয়ংওয়ান ইপিজেড প্রকল্পের স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। কর্মজীবনে ইঞ্জিনিয়ার জিয়া হোসাইন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে (সিডিএ) চেয়ারম্যান ও প্রধান প্রকৌশলী ছিলেন।
ইঞ্জিনিয়ার জিয়া হোসাইন ১৯৩৪ সালের ১ নভেম্বর সাতকানিয়া পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ রামপুর মৌলভি বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা খ্যাতিমান আলেম মৌলানা আবদুল অদুদ এবং মাতা খোরশেদা বেগম। শৈশবে তিনি রূপকানিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও পরবর্তী সময়ে সাতকানিয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৫১ সালে ঢাকা বোর্ড থেকে আরবি বিষয়ে ডিস্টিংশনসহ ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯৫৩ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে রসায়নে ডিস্টিংশনসহ মেধা তালিকায় ১৯তম স্থান অর্জন করেন।
১৯৫৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (বর্তমান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েট) থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করেন। পরে গ্রিসের এথেন্সে এবং যুক্তরাজ্যে নগর পরিকল্পনা বিষয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি কাপ্তাই হাইড্রো-ইলেকট্রিক প্রকল্পে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে করাচি ডেভেলপমেন্ট অথরিটিতে টাউন প্ল্যানার হিসেবে কাজ করেন। ১৯৬২ সালে তিনি চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)-এ যোগ দেন এবং পর্যায়ক্রমে নির্বাহী প্রকৌশলী, সুপারিনটেনডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার ও ১৯৬৯ সালে চিফ ইঞ্জিনিয়ার হন। ১৯৭২ সালে তিনি সংস্থাটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
সিডিএ চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি চট্টগ্রাম মহানগরের দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা, অবকাঠামো উন্নয়ন, আবাসন ব্যবস্থা ও বাণিজ্যিক অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পরবর্তী সময়ে তিনি বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেপজা)-এ সদস্য হিসেবে যোগ দেন এবং পরে কোরিয়ান ইপিজেড-এর উপদেষ্টা হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন।
ইঞ্জিনিয়ার জিয়া জাতিসঙ্ঘ (ইউনিডো) ফেলোশিপে বিভিন্ন দেশে এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, সৌদি আরবসহ বহু দেশে সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামে অংশ নেন। নগর পরিকল্পনা ও শিল্পায়ন বিষয়ে তার গবেষণা ও প্রকাশনা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও প্রশংসিত হয়।
ইঞ্জিনিয়ার জিয়া হোসাইন বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট ও প্ল্যানার্স ইনস্টিটিউটের ফেলো ছিলেন। তিনি চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতাল ও সামাজিক সংগঠনের আজীবন সদস্য হিসেবে যুক্ত ছিলেন। লায়ন্স ক্লাবের ডিস্ট্রিক্ট গভর্নর এবং ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্স, চট্টগ্রামের সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। মরহুমের স্ত্রী আয়েশা হোসাইন পাকিস্তান আইন পরিষদের সাবেক সাবেক সদস্য আহমদ কবির চৌধুরীর মেয়ে ও সাবেক এমপিএ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর বোন। তিনি তিন ছেলে ও এক মেয়ের জনক। তার সন্তানরা কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশে নিজ নিজ পেশাগত ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত।
সাতকানিয়া-লোহাগাড়ার উন্নয়ন, চট্টগ্রামের নগর পরিকল্পনা এবং দেশের রফতানি শিল্প অবকাঠামো গঠনে ইঞ্জিনিয়ার জিয়া হোসাইনের অবদান দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। সাতকানিয়া-লোহাগাড়া প্রকাশনা পরিষদের পক্ষ থেকে মরহুমের রূহের মাগফিরাত কামনা করা হয়েছে এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয়েছে।
মরহুমের প্রথম নামাজে জানাজা গতকাল বুধবার রাজধানীর মিরপুর সেন্ট্রাল মসজিদে অনুষ্ঠিত হয় বাদ জোহর। আগামীকাল শুক্রবার বাদ জুমা চট্টগ্রাম নগরীর জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ প্রাঙ্গণে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। পরে একই দিন এশার নামাজের পর রাত ৯টায় গ্রামের বাড়ি সাতকানিয়ার দক্ষিণ রামপুর মৌলানা বাড়িতে তৃতীয় দফা জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।



