‘বাংলাদেশ’ স্লোগান দিতে দিতে রাজপথে নামা জাবির ইব্রাহিম এখন শুধুই স্মৃতি

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পুলিশের গুলিতে আহত হওয়ার পর মাত্র দুইবার ‘বাবা’ বলে ডেকেই নিথর হয়ে যায় সে। সময়ের ব্যবধানে অনেক কিছু বদলেছে, কিন্তু জাবিরকে হারানোর সেই মুহূর্তটি যেন থমকে আছে তার পরিবারের কাছে। শোকের সাথে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘ প্রতীক্ষা- সন্তান হত্যার বিচার পাওয়ার অপেক্ষা। সেই বিচার দ্রুত সম্পন্ন করতে অতিরিক্ত ট্রাইব্যুনাল গঠনের দাবি জানিয়েছেন জাবিরের মা, সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগম।

হাবিবুল বাশার
Printed Edition

দুই বছর আগে বাবার হাত ধরে জাতীয় পতাকা উড়িয়ে ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’ স্লোগান দিতে দিতে রাজপথে নেমেছিল ছয় বছরের জাবির ইব্রাহিম। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পুলিশের গুলিতে আহত হওয়ার পর মাত্র দুইবার ‘বাবা’ বলে ডেকেই নিথর হয়ে যায় সে। সময়ের ব্যবধানে অনেক কিছু বদলেছে, কিন্তু জাবিরকে হারানোর সেই মুহূর্তটি যেন থমকে আছে তার পরিবারের কাছে। শোকের সাথে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘ প্রতীক্ষা- সন্তান হত্যার বিচার পাওয়ার অপেক্ষা। সেই বিচার দ্রুত সম্পন্ন করতে অতিরিক্ত ট্রাইব্যুনাল গঠনের দাবি জানিয়েছেন জাবিরের মা, সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগম।

তিন ভাইবোনের মধ্যে জাবির ছিল সবার ছোট। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রথমবারের মতো উত্তরার দক্ষিণখানের প্রেমবাগানের কে সি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভর্তি হয়। বাবা কবির হোসেন জানান, ভর্তি পরীক্ষায় জাবিরের পারফরম্যান্স এতটাই ভালো ছিল যে, শিক্ষকরা তাকে প্লেতে না দিয়ে সরাসরি নার্সারিতে ভর্তি করেন।

ছাত্র-জনতার আন্দোলনের দিনগুলোতে পরিবারের বড় সদস্যদের কাছ থেকে আন্দোলনের গল্প মনোযোগ দিয়ে শুনত ছোট্ট জাবির। বড় বোন ও ভাতিজি আন্দোলন থেকে ফিরে এলে তাদের অভিজ্ঞতা শুনত আগ্রহ নিয়ে। আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার খবর শুনে কষ্ট পেত। শহীদ হওয়ার দিন সকালে মাথায় একটি হেলমেট পরে বাবার কাছে এসে বলেছিল, ‘আমি বড় হয়েছি, আমাকে তোমাদের সাথে নিতে হবে।’

প্রথমে তাকে নিয়ে যেতে না চাইলেও তার প্রবল আগ্রহের কাছে হার মানে পরিবার। ৫ আগস্ট ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে অংশ নিতে বাবা কবির হোসেন, তিন চাচার পরিবার ও স্বজনদের সাথে বাসা থেকে বের হয় জাবির। পথে একটি কাগজে ইংরেজিতে লিখেছিল ‘ডব ডধহঃ ঔঁংঃরপব’। হাতে জাতীয় পতাকা আর সেই কাগজ নিয়ে ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’ স্লোগান দিতে দিতে এগিয়ে যাচ্ছিল সে।

বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে উত্তরা আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের উত্তর গেট এলাকায় পৌঁছালে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ঠিক সেই সময় পুলিশের গুলিতে আহত হয় বাবার হাত ধরে থাকা জাবির।

ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বাবা কবির হোসেন বলেন, ‘আমি ওর হাত ধরে নিয়ে আসছিলাম। হঠাৎ পুলিশ গুলি চালায়। আমার হাত ধরে থাকা অবস্থাতেই জাবির গুলিবিদ্ধ হয়। হাতে বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে সে তখনও ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’ বলে চিৎকার করছিল।’

গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর জাবিরকে প্রথমে ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নেয়া হয়। পরে স্থানান্তর করা হয় কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে। চিকিৎসকরা জানান, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে জরুরি ভিত্তিতে রক্তের প্রয়োজন। বাবার রক্তের গ্রুপ একই হলেও প্রয়োজনীয় পরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় অন্যত্র থেকে রক্ত সংগ্রহ করতে বলা হয়। রক্তের ব্যবস্থা করতে করতেই প্রায় দুই ঘণ্টা কেটে যায়।

কবির হোসেনের অভিযোগ, পরে তিনি দেখেন জাবিরকে শুধু অক্সিজেন দিয়ে রাখা হয়েছে। এরপর জানতে পারেন, হাসপাতালে শিশুদের জন্য আইসিইউ নেই। পরে তাকে উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরের ঢাকা স্পেশালাইজড হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।

সন্তান হারানোর শোকের মধ্যেই দাফন নিয়েও নানা জটিলতার মুখে পড়ে পরিবার। উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরে দীর্ঘ অপেক্ষার পর গভীর রাত প্রায় দেড়টার দিকে জাবিরকে দাফন করা হয়।

দুই বছর পেরিয়ে গেলেও জাবিরকে হারানোর শোক কাটিয়ে উঠতে পারেনি পরিবার। তবে শোকের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা। কবির হোসেন বলেন, ‘রাষ্ট্র আমার সন্তানকে নিরাপত্তা দিতে পারেনি। আমি শুধু আমার সন্তানের নয়, জুলাইয়ের সব শহীদ পরিবারের জন্য ন্যায়বিচার চাই।’

জাবিরের মা রোকেয়া বেগম এমপি বলেন, বিচার নিয়ে একাধিকবার আশ্বাস দেয়া হলেও দুই বছরে মাত্র সাতটি মামলার বিচার সম্পন্ন হয়েছে। পরে ১১-দলীয় ঐক্যজোটের পক্ষ থেকে স্পিকার ও প্রধান প্রসিকিউটরের কাছে স্মারকলিপি দেয়া হলে এক বছরের মধ্যে জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচারগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সম্পন্ন করার আশ্বাস দেয়া হয়। একই সাথে বিচারগুলো সমন্বিতভাবে পরিচালনা এবং ঘোষিত রায় দ্রুত কার্যকর করার বিষয়েও আশ্বাস দেয়া হয়েছে।

তার ভাষ্য, বিচারকাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে সবচেয়ে বড় বাধা ট্রাইব্যুনাল ও জনবলের সংকট। প্রধান প্রসিকিউটরের সঙ্গে আলোচনায় তিনি জেনেছেন, বিদ্যমান ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম এবং তদন্ত কার্যক্রমেও পর্যাপ্ত জনবল নেই। তাই সরকারের প্রতি অতিরিক্ত ট্রাইব্যুনাল গঠন করে জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার আহ্বান জানান তিনি।

বিচারহীনতার পরিণতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন রোকেয়া বেগম। তিনি বলেন, ‘আজ যদি জুলাইয়ের বিচার সম্পন্ন হতো, তাহলে হবিগঞ্জে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না। একটি শিশুর চোখ উপড়ে ফেলার মতো নৃশংস ঘটনাও হয়তো ঘটত না। বিচারহীনতার সংস্কৃতিই এসব অপরাধকে উৎসাহিত করে।’

দুই বছর ধরে জাবিরের পরিবারের সবচেয়ে বড় অপেক্ষা একটাই- সন্তান হত্যার ন্যায়বিচার। তাদের প্রত্যাশা, জাবির ইব্রাহিম হত্যার ঘটনায় দায়ীদের আইনের আওতায় এনে দ্রুত বিচার সম্পন্ন করতে হবে। কারণ তাদের বিশ্বাস, একটি শিশুর রক্তের বিচার শুধু একটি পরিবারের নয়, রাষ্ট্রের ন্যায়বিচারের প্রতিও মানুষের আস্থা পুনর্গঠনের প্রশ্ন।