দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও নিরাপদ নৌযোগাযোগ নিশ্চিত করতে নৌ খাতকে আরো শক্তিশালী ও আধুনিক রূপ দেয়ার লক্ষ্যে নানা কার্যক্রম হাতে নিয়েছে সরকার।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা আরিফ বিল্লাহ জানান, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় গত তিন মাসে বহুমাত্রিক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছে। সমুদ্রবন্দর আধুনিকীকরণ, নৌপথের নাব্যতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার, যাত্রীসেবা উন্নয়ন এবং পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে দেশের নৌ খাতকে আরো শক্তিশালী ও আধুনিক রূপ দেয়ার কার্যক্রম জোরদার হয়েছে।
তিনি জানান, দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর গত তিন মাসে ছয় লাখ ৫৩ হাজার ৭০৮ টিইইউস কনটেইনার হ্যান্ডলিং সম্পন্ন করেছে। একই সময়ে বন্দরের রাজস্ব আয় প্রায় এক হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা, যা জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। মোংলা বন্দরেও কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। গত তিন মাসে এখানে সাত হাজার ৪৪৩ টিইইউস কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের পাশাপাশি প্রায় ১০৭ কোটি টাকা রাজস্ব আয় হয়েছে। অন্যদিকে পায়রা বন্দর ৬ দশমিক ৭৪ লাখ মেট্রিক টন কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের মাধ্যমে সরকারের জন্য ৮ দশমিক ৯৩ কোটি টাকা রাজস্ব অর্জন করেছে।
বন্দর ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে একাধিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরে সিপিএ স্কাই চালুর জন্য চুক্তি ও উদ্বোধন সম্পন্ন হয়েছে, যা দ্রুত ও সহজ পণ্য খালাস নিশ্চিত করবে। একইসাথে ফুল অটোমেশন ও এআই মনিটরিং ব্যবস্থা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম সংস্করণ ৩.৮০ থেকে ৪.০০-এ উন্নীত করার কার্যক্রমও সম্পন্ন হয়েছে, যার ফলে কনটেইনার ও কার্গো ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা আরো বৃদ্ধি পাবে।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা জানান, কর্ণফুলী নদী ও মাতারবাড়ি ডিপ সি টার্মিনাল চ্যানেলে বৃহৎ পরিসরে ড্রেজিং কার্যক্রম চলমান রয়েছে, যার মাধ্যমে বড় জাহাজ চলাচলের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। মোংলা বন্দর চ্যানেলে ইতোমধ্যে ২১০ লাখ ঘনমিটার ড্রেজিং কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এ ছাড়া ভিটিএমআইএস চালুর মাধ্যমে রিয়েল-টাইম শিপ মনিটরিং নিশ্চিত করা হয়েছে। পায়রা বন্দরে ৬৫০ মিটার জেটি ও ৩ দশমিক ২৫ বর্গকিলোমিটার ব্যাকআপ ইয়ার্ড নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। বন্দরের সাথে যোগাযোগ সহজ করতে ৬-লেন সংযোগ সড়কের কাজ ৯১ শতাংশ এবং আন্ধারমানিক নদীর ওপর এক হাজার ১৮০ মিটার দীর্ঘ সেতুর কাজ ৮৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে।
পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের অংশ হিসেবে পায়রা বন্দরে সৌর প্যানেলের মাধ্যমে ৮০০ কিলোওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। নদী ও বন্দর এলাকায় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ইতোমধ্যে ছয় হাজার ১০০টি বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে। একইসাথে নদী দখল ও দূষণ রোধে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন, ২০১৩ সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যা নদী ব্যবস্থাপনায় আরো কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
কর্মকর্তা জানান, বিআইডব্লিউটিএ বিভিন্ন নদীপথে ২০ কিলোমিটার ক্যাপিটাল ড্রেজিং ও ৩৫ লাখ ঘনমিটার সংরক্ষণ ড্রেজিং সম্পন্ন করেছে। পাশাপাশি ২০০ কিলোমিটার হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে, যা নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করবে। অভ্যন্তরীণ নৌপথে ৫৫০টি নৌসহায়ক সরঞ্জাম স্থাপন এবং নিমজ্জিত যান উদ্ধার কার্যক্রমও পরিচালিত হয়েছে। এ ছাড়া বিআইডব্লিউটিএ কন্ট্রোল অ্যান্ড কমান্ড সেন্টার স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে।
এছাড়া যাত্রীসেবার মানোন্নয়নে বিআইডব্লিউটিসির বহরে নতুন দু’টি জাহাজ এমভি রূপসা ও এমভি সুগন্ধা সংযোজন করা হয়েছে। পবিত্র ঈদ উপলক্ষে নৌযান মেরামত, নিরাপদ চলাচল এবং স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করতে বিশেষ প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে যাত্রীদের জন্য ফ্রি কুলি, ট্রলি ও হুইলচেয়ার সুবিধাও প্রদান করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিবন্ধী যাত্রী, দরিদ্র শিক্ষার্থী, অসহায় রোগী ও মৃত ব্যক্তির লাশ পরিবহনে বিনা ভাড়ায় যাতায়াত সুবিধা চালু করা হয়েছে। ১০ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্যও বিনা ভাড়ায় যাতায়াতের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
এছাড়া নদীকেন্দ্রিক যোগাযোগব্যবস্থা সম্প্রসারণে বসিলা ও শিমুলিয়া ট্যুরিস্ট ঘাটে নতুন লঞ্চঘাট ও ফেরিঘাট নির্মাণ করা হয়েছে। শিমুলিয়া ট্যুরিস্টঘাটে ইতোমধ্যে লঞ্চ ও ফেরি চলাচল শুরু হয়েছে। ফেরিঘাটে ডিজিটাল ওয়েব্রিজ স্কেল স্থাপন, ফেরি রুট আধুনিকীকরণ এবং ঘাট স্থানান্তরের মতো উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সময় ও ব্যয় কমানোর পরিকল্পনাও এগিয়ে চলছে।
বেনাপোল, ভোমরা ও বুড়িমারীসহ বিভিন্ন স্থলবন্দরে আধুনিক ওয়্যারহাউজ ও ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেন্টার নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। পাশাপাশি এনএসডব্লিউ বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমদানি-রফতানি প্রক্রিয়া আরো দ্রুত ও সহজ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
একই সাথে বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি ও মেরিন ফিশারিজ একাডেমিতে ন্যূনতম ১০ শতাংশ নারী ক্যাডেট ভর্তি নিশ্চিত করা হয়েছে। একইসাথে নৌপরিবহন অধিদফতরের ৮০ শতাংশ কার্যক্রম অটোমেশনের আওতায় আনা হয়েছে। সমুদ্র নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা উপকূলীয় ও সমুদ্রগামী জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যৌথ সামুদ্রিক উদ্ধার সমন্বয় কেন্দ্র (জেএমআরসিসি) কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।



