টেকসই অবস্থানের দিকে এগোচ্ছে পুঁজিবাজার

পুঁজিবাজারে আজীবন নিষিদ্ধ খায়রুল বাশার

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

কিছুটা দেরিতে হলেও দেশের পুঁজিবাজারগুলো ক্রমান্বয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে শুরু করেছে। বিনিয়োগকারীরাও দীর্ঘদিন ধরে যে পুঞ্জীভূত লোকসান তা কাটিয়ে ওঠার আশায় নতুন করে বাজারে তাদের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। আর তাতে কমবেশি সফলও হচ্ছেন। আর এভাবে ধীরে ধীরে একটি টেকসই অবস্থানের দিকেই এগোচ্ছে বাজার। পুঁজিবাজারের সাম্প্রতিক সময়ের আচরণ সেই বার্তাই দিচ্ছে। সূচকের উন্নতির পাশাপাশি সংশোধনের যে ধারা গত কিছুদিন ধরে চলে আসছে তাতে বিনিয়োগকারীদের আশাবাদী করে তুলছে। পুঁজিবাজারের গত সপ্তাহের আচরণ বিশ্লেষণের পর এ মন্তব্য করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।

নেতিবাচক আচরণ দিয়ে সপ্তাহটির শুরু হলেও পরপর দুই দিন সূচকের বড় ধরনের উন্নতি সংশ্লিষ্ট সবার মধ্যে নতুন উদ্যমে বিনিয়োগস্পৃহা তৈরি করে। এ সময় বাজারে লেনদেনেরও কিছুটা উন্নতি ঘটতে দেখা যায়। পরবর্তীতে যথারীতি সংশোধন ঘটলেও সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে ফের উন্নতি ঘটে বাজার সূচকের। আর এভাবে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়া এবং তা থেকে মুনাফা তুলে নেয়ার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় সামনের দিনগুলোতে বাজার আচরণ নিয়ে সংশ্লিষ্টরা আশাবাদী হয়ে উঠছেন।

গত সপ্তাহে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্সের উন্নতি রেকর্ড করা হয় ৯১ দশমিক ২৮ পয়েন্ট। রোববার ৫ হাজার ৮০৪ দশমিক ৩০ পয়েন্ট থেকে সপ্তাহ শুরু করা সূচকটি বৃহস্পতিবার সপ্তাহান্তে পৌঁছে যায় ৫ হাজার ৮৯৫ দশমিক ২৮ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ২৪ দশমিক ৫১ ও ১২ দশমিক ১৮ পয়েন্ট।

সূচকের এই উন্নতি গত সপ্তাহে ডিএসইর বাজার মূলধনেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ সময় বাজারটির মূলধনে যোগ হয় তিন হাজার ৮৬৩ কোটি টাকা। সাত লাখ এক হাজার ২৭০ কোটি টাকা মূলধন নিয়ে সপ্তাহ শুরু করা বাজারটির মূলধন সপ্তাহান্তে দাঁড়ায় সাত লাখ পাঁচ হাজার ১৩৩ কোটি টাকায়। এ সময় বিভিন্ন খাতের মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলোতেই বেশি নজর ছিল বিনিয়োগকারীদের। ফলে বহুজাতিক কোম্পানিসহ মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলোই ছিল লেনদেন ও মূল্যবৃদ্ধির অগ্রভাগে। এ দিকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সাবেক প্রধান নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা (সিআরও) মো: খায়রুল বাশার আবু তাহের মোহাম্মদকে পুঁজিবাজারে আজীবন নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। তাকে পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের দাফতরিক পদে নিয়োগ দেয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণে চরম অবহেলা ও গাফিলতির কারণে এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। গত বৃহস্পতিবার নিয়ন্ত্রক সংস্থা এ আদেশ জারি করে। বিএসইসি সূত্রে এ তথ্য জানা যায়।

খায়রুল বাশার ডিএসইর সিআরও হিসেবে দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে মশিউর সিকিউরিটিজসহ ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের কয়েকটি ব্রোকারহাউজে গ্রাহকদের শত শত কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা ধরা পড়ে। ব্রোকারহাউজগুলো নিয়মিত পরিদর্শন না করায় অসাধু ব্যক্তিরা এসব ঘটনা ঘটাতে সক্ষম হয়। পরবর্তীতে দোষী ব্রোকারহাউজগুলো পরিদর্শন করে বিএসইসির কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়ার জন্য সময় বেঁধে দেয়া হলেও খায়রুল তা পরিপালনে ব্যর্থ হয়। এ অপরাধে নিয়ন্ত্রক সংস্থা তার বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নিয়েছে।

বিএসইসির আদেশে বলা হয়েছে, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯-এর ধারা ২০ অনুযায়ী প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এই আদেশ জারির তারিখ থেকে কার্যকরভাবে খায়রুল বাশার আবু তাহের মোহাম্মদ দেশের শেয়ারবাজার সংক্রান্ত যেকোনো ধরনের প্রতিষ্ঠানে দাফতরিক দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকবেন। কমিশনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত সব স্টক এক্সচেঞ্জ, বাজার মধ্যস্থতাকারী, তালিকাভুক্ত কোম্পানি এবং অন্যান্য সব নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান তাকে নিয়োগ প্রদান থেকে বিরত থাকবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, কোনো স্টক এক্সচেঞ্জের সিআরওর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হচ্ছে সদস্যভুক্ত ব্রোকারেজ হাউজগুলোর কার্যক্রম নিয়মিত পরিদর্শন করা, অনিয়ম শনাক্ত করা এবং পরিদর্শনের প্রতিবেদন সময়মতো কমিশনে জমা দেওয়া। এ প্রতিবেদনগুলোর ওপর ভিত্তি করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা। ফলে এসব প্রতিবেদন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাখিল না হওয়ায় বাজার তদারকির গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়েছে বলে মনে করছে কমিশন।

খায়রুল বাশারের দায়িত্ব পালনে অবহেলার বিষয়টি প্রথম ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে দেশের আলোচিত মশিউর সিকিউরিটিজ কেলেঙ্কারির ঘটনায়। ডিএসইর এই স্টেকহোল্ডার প্রতিষ্ঠানটি বিনিয়োগকারীদের ১৬১ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে, যা দেশের শেয়ারবাজারের ইতিহাসে একক কোনো ব্রোকারেজ হাউজের অন্যতম বড় জালিয়াতির ঘটনা।

বিএসইসির অনুসন্ধানে উঠে আসে, প্রধান নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বে থাকা সত্ত্বেও খায়রুল বাশার মশিউর সিকিউরিটিজে সময়মতো সরেজমিন পরিদর্শন ও কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে পারেননি। যদি যথাসময়ে পরিদর্শন ও তদন্ত পরিচালিত হতো, তাহলে এত বড় আর্থিক ক্ষতির ঘটনা অনেক আগেই শনাক্ত করা সম্ভব হতো এবং বিনিয়োগকারীদের বিপুল ক্ষতি এড়ানো যেত।

একই ধরনের নজরদারির অভাবে পিএফআই সিকিউরিটিজ, সিনহা সিকিউরিটিজ, তামহা সিকিউরিটিজ, ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ ও বানকো সিকিউরিটিজেও ব্যাপক অনিয়ম ঘটে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আগেই বহু বিনিয়োগকারী বড় অঙ্কের ক্ষতির মুখে পড়েন। এর মধ্যে বানকো সিকিউরিটিজ থেকে ১৩৬ কোটি ৮৪ লাখ, ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ থেকে ৬২ কোটি ৯৮ লাখ এবং তামহা সিকিউরিটিজ থেকে ৫১ কোটি ৩০ লাখ টাকা লোপাট করা হয়।

ডিএসইর প্রধান নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা (সিআরও) হিসেবে যোগ দেয়ার আগে মো: খায়রুল বাশার আবু তাহের মোহাম্মদ ছিলেন এমটিবি ক্যাপিটাল নামে মার্চেন্ট ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। ওই সময়ে আর্থিক খাতের অন্যতম শীর্ষ দুর্বৃত্ত নাফিজ শরাফতের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান কপারটেক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডকে বাজারে নিয়ে আসতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন খায়রুল। তার মেয়াদে এমটিবি ক্যাপিটালের হাত ধরে জাহিন স্পিনিংসহ কয়েকটি জাঙ্ক কোম্পানির আইপিও আসে পুঁজিবাজারে। মূলত নাফিজ শরাফতের আশীর্বাদে তিনি ডিএসইর সিআরও হিসেবে নিয়োগ পান।