আগেরগুলো মৃত : আবারো ১১ কোটি টাকায় চলন্ত সিঁড়ি

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

  • ৩১৯ কোটি টাকার ৩ বছরের প্রকল্প এখন সাড়ে ৬ বছরে
  • এসব করা মানে টাকা পানিতে ফেলে দেয়া : ড. জাহিদ

যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ঢাকা শহরের সড়কে কোটি টাকায় স্থাপন করা এস্কেলেটর বা চলন্ত সিঁড়িগুলো ঘুমন্ত ও অকেজো হয়ে আছে। নির্মিত চারটি ব্রিজের এস্কেলেটর এখন মৃত। এখন প্রতিটি এক কোটি ৮৪ লাখ ১৬ হাজার টাকা ব্যয়ে ছয়টি এস্কেলেটর স্থাপন করতে যাচ্ছে। প্রতিটি এস্কেলেটর নির্মাণে খরচ বাড়ছে ৬৪ লাখ টাকা। তিন বছরের জন্য নেয়া ৩১৯ কোটি টাকার প্রকল্প এখন সাড়ে ছয় বছরে পা রাখতে যাচ্ছে। প্রকল্পের সংশোধনী প্রস্তাবনা অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগে পাঠানো হয়েছে বলে স্থানীয় সরকার বিভাগ সূত্রে জানা গেছে। আর ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত; অর্থাৎ তিন বছরের প্রকল্পের সাড়ে চার বছরে ৮৭ শতাংশ অগ্রগতি বলছে স্থানীয় সরকার বিভাগ।

স্থানীয় সরকার বিভাগের দেয়া সংশোধিত প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ৩৬টি ওয়ার্ডের সমন্বয়ে ২০১১ সালে গঠিত হয়, যা পাঁচটি অঞ্চলে বিভক্ত ছিল এবং আয়তন ছিল ৮২.৩৬ বর্গকিলোমিটার। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে সদ্য ঢাকা শহরের আটটি ওয়ার্ড যুক্ত হওয়ায় এর মোট আয়তন ১১৩.৫৯ বর্গকিলোমিটার বৃদ্ধি পেয়ে সর্বমোট ১৯৬.২২৮ বর্গকিলোমিটার হয়েছে এবং বর্তমানে মোট ৫৪টি ওয়ার্ড রয়েছে, যা মোট ১০টি অঞ্চলে বিভক্ত। ডিএনসিসির প্রধান সকড়সহ শাখা সড়কসমূহে পর্যাপ্ত পরিমাণ নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থাপনার অবকাঠামোসমূহ যথা সড়ক মিডিয়ান/ডিভাইডার, জেব্রাক্রসিং, মিডিয়ানের গ্রিল ফেন্সিং রোড সারফেস মার্কিং, ফুটপাত, সড়ক ইন্টার সেকশনসমূহে ট্রাফিক সিগনাল ইত্যাদি অপ্রতুল হওয়ায় ট্রাফিক জ্যাম সৃষ্টি হয়। সড়ক ব্যবহারের ক্ষেত্রে পথচারীগণ কর্তৃক ট্রাফিক আইন অমান্য করে যত্রতত্র রাস্তা পারাপার হওয়া, ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করা ইত্যাদি কারণে সড়কে বিভিন্ন সময়ে অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনা ঘটে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার প্রধান সড়কসমূহের সড়ক নিরাপত্তা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ট্রাফিক অবকাঠামো নির্মাণের নিমিত্ত ঢাকা উত্তর সিটি এলাকার ট্রাফিক অবকাঠামোর উন্নয়নসহ সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্প ২০২০ সালে একনেকে অনুমোদন পায়। এতে ব্যয় ধরা হয় ৩১৯ কোটি ২৩ লাখ ৭ হাজার টাকা। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পটি সমাপ্ত করার কথা ছিল।

প্রকল্পে বর্তমানে কাজের প্রস্তাবনা

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নেয়া ২০২১ সালের মূল প্রকল্পে যেসব কার্যক্রম ছিল তাতে বেশকিছু সংশোধন আনা হয়েছে প্রস্তাবনায়। প্রকল্পের ১ম সংশোধিত কার্যক্রমসমূহ হলো- সড়ক উন্নয়ন-১৬.৭৩ কিমি, এসএস গ্রিল ফেন্সিং স্থাপন-১৫.১৮ কিমি, পার্শ্ব নর্দমা নির্মাণ-৮.২১ কিমি, ট্রাফিক সাইন স্থাপন-১ হাজার ৮০৬টি, পাইপ নর্দমা নির্মাণ-৯.৯৪ কিমি, যাত্রী ছাউনি নির্মাণ-৫২টি, ফুটপাত উন্নয়ন-২৩.৮৬ কিমি, নতুন ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ-২৫টি, সড়ক মিডিয়ান উন্নয়ন-১২.২০ কিমি, বিদ্যমান ফুটওভার ব্রিজের উন্নয়ন-৪২টি, এমএস গ্রিল ফেন্সিং স্থাপন-২৩.৪১ কিমি, ফুটওভার ব্রিজে এস্কেলেটর স্থাপন-৬টি স্থাপন করা।

আগের ৪টি এস্কেলেটর মৃত

সিনিয়র সিটিজেন, অসুস্থ ও দুর্বল মানুষের চলাচলের জন্য এই এস্কেলেটর স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়। মূল প্রকল্পে প্রতিটি এস্কেলেটর স্থাপনে এক কোটি ২০ লাখ টাকা ধরে ১৬টি স্থাপনে ১৯ কোটি ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ ধরা হয়। সেই খরচে ঢাকার বিমানবন্দর ফুটওভার ব্রিজ, বনানী সৈনিক ক্লাব ফুটওভার ব্রিজ, যমুনা ফিউচার পার্ক বা আবরার ফুটওভার ব্রিজ এবং সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল ফুটওভার ব্রিজের এগুলো স্থাপন করা হয়। যা আজ ব্যবহার অযোগ্য ও মৃত।

সরেজমিন তথ্য বলছে, বিমানবন্দর ফুটওভার ব্রিজের দুইপাশের এস্কেলেটরই দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ। যন্ত্রাংশ নষ্ট, ধুলাবালি জমা এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাব। বনানী সৈনিক ক্লাব ফুটওভার ব্রিজের দুইপাশই বন্ধ ও ব্যবহার হচ্ছেনা বলে পথচারীরা জানান। মাঝেমধ্যে মেরামতের জন্য তালাবদ্ধ রাখা হয়। এ ছাড়া যমুনা ফিউচার পার্ক বা আবরার ফুটওভার ব্রিজের দু’টি এস্কেলেটরই প্রায়ই বিকল থাকে বলে পথচারীদের অভিমত। আর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল ফুটওভার ব্রিজেরটা দীর্ঘদিন অচল পড়ে আছে। কিছু যন্ত্রাংশ চুরি হয়ে গেছে বলেও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।

এখন খাতগুলোতে ব্যয় বেড়েছে

নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন না করায় এখন বেশিরভাগ খাতেই খরচ বেড়েছে। সার্বিকভাবে প্রকল্পের ব্যয় ১৪.৩৩ শতাংশ বা ৪৫ কোটি ৭৪ লাখ ২৩ হাজার টাকা কম প্রস্তাব করা হয়েছে সংশোধিত প্রস্তাবনায়; কিন্তু ছয়টি এস্কেলেটর স্থাপনে প্রতিটিতে খরচ এক কোটি ৮৪ লাখ টাকার বেশি। এখন প্রতিটিতে ব্যয় বাড়ছে ৬৪ লাখ টাকার বেশি। ফুটপাত উন্নয়নে প্রতি কিলোমিটারে খরচ হয়েছে ৮২ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। এখন এতে ব্যয় হবে ৯০ লাখ ৬০ হাজার টাকা। ফলে কিলোমিটারে খরচ বাড়ছে প্রায় পৌনে আট লাখ টাকা। সড়ক মিডিয়ান উন্নয়নে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হয়েছে ৪৬ লাখ ১২ হাজার টাকা। এখন ব্যয় হবে ৮৪ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। এখানে কিলোমিটারে ব্যয় বাড়ছে ৩৮ লাখ ৩৩ হাজার টাকা। ৫০টি যাত্রী ছাউনি নির্মাণে খরচ হবে চার কোটি ৯০ লাখ টাকা। প্রতিটিতে খরচ ৯ লাখ ৮০ হাজার টাকা। নতুন প্রতিটি ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণে খরচ দুই কোটি ৫৫ লাখ ৩৮ হাজার টাকা ধরে মোট ৬৩ কোটি ৮৪ লাখ ৭৪ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রতিটি ফুটওভার ব্রিজ উন্নয়নে খরচ হবে ১৯ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। এ পর্যন্ত সাড়ে ১২ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন খরচ করেছে ৭৭ কোটি ৬৮ লাখ ১৬ হাজার টাকা। প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হয়েছে ছয় কোটি ২১ লাখ ১৬ হাজার টাকা। সংশোধিত প্রস্তাবনায় এ ব্যয় প্রতি কিলোমিটারে কমিয়ে পাঁচ কোটি ৮১ লাখ ৫০ হাজার টাকায় আনা হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশন যা বলছে

পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পটির প্রস্তাবনা কমিশনে এসেছে। আগামী রোববার মূল্যায়ন কমিটির সভায় পর্যালোচনা করা হবে। যদিও তারা ব্যয় কমিয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, প্রস্তাবিত ১ম সংশোধনে দেখা যায় সড়ক উন্নয়নে ৩.৪৮ কোটি টাকা, সড়ক ট্রাফিক সাইন স্থাপনের জন্য ৭.৮৪ লাখ টাকা, ইউটিলিটি স্থানান্তরের জন্য ৬.২৮ কোটি টাকা ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। পক্ষান্তরে ৩.৩৬ কিমি পাইপ নর্দমা নির্মাণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলেও এই খাতে ৪.৩৭ কোটি টাকা ব্যয় কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এমএস গ্রিল ফেন্সিং স্থাপনের পরিমাণ ০.৬৪ মি. বৃদ্ধি পেলেও এই খাতে ২.১৬ কোটি টাকা ব্যয় কমেছে এবং দু’টি যাত্রী ছাউনি বৃদ্ধি পেলেও ৩.২৩ লাখ টাকা ব্যয় কমেছে। তবে এস্কেলেটর স্থাপনের বিষয়গুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হবে।

অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ যা বলছেন

এই এস্কেলেটর স্থাপনের ব্যাপারে অর্থনীতিবিদ ও বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, এই ধরনের কাজে ব্যয় বর্তমান প্রেক্ষাপটে করার মতো সামর্থ্য আমাদের নাই। আর যে অভিজ্ঞতা আমাদের তাতে সামর্থ্য থাকলেও তো আমি কী টাকা পানিতে ফেলে দিবো? অব্যশই এটা করবো না। তিনি বলেন, এই এস্কেলেটর করা মানে টাকা অপচয় বা পানিতে ফেলে দেয়ার মতো কাজ। কাজেই আমরা যদি অতিতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা না নেই, সেটার পুনরাবৃত্তি আবার হবে। আমাদের যেটা প্রয়োজন সেটাই করা উচিত।