নয়া দিগন্ত ডেস্ক
- ইসরাইলি সেনা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার ছাড়া যুুদ্ধবিরতি অসম্পূর্ণ : কাতার
- আবু শাবাবকে হত্যার দায় স্বীকার হামাসের
গাজার রাফাহ সীমান্ত একমুখীভাবে খোলার ইসরাইলি পরিকল্পনার বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে মিসর ও কাতারসহ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ আটটি দেশ। এ পরিকল্পনায় ফিলিস্তিনিদের শুধু মিসরে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হবে, কিন্তু ফিরে আসা ও মানবিক সহায়তা প্রবেশ বন্ধ থাকবে। খবর আলজাজিরার।
তাদের সতর্কবার্তা এমন সময়ে এসেছে, যখন ইসরাইলের গাজায় গণহত্যা অব্যাহত রয়েছে। গত সাত সপ্তাহে যুদ্ধবিরতি অন্তত ৬০০ বার লঙ্ঘন হয়েছে। শনিবার উত্তর গাজার বেইত লাহিয়ায় ইসরাইলি হামলায় দুইজন নিহত হয়েছেন। মিসর, ইন্দোনেশিয়া, জর্দান, পাকিস্তান, কাতার, সৌদি আরব, তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা শুক্রবার যৌথ বিবৃতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলেন, ইসরাইলি সেনারা ঘোষণা দিয়েছে রাফাহ সীমান্ত শিগগিরই শুধু গাজা থেকে মিসরে বের হওয়ার জন্য খোলা হবে। এ ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন শান্তি পরিকল্পনার প্রথম ধাপের শর্ত ভঙ্গ করছে। ইসরাইলি সামরিক ইউনিট ‘কোগাট’ জানিয়েছে, মিসরের সাথে সমন্বয়ে নিরাপত্তা অনুমোদন সাপেক্ষে একমুখী প্রবেশের অনুমতি দেয়া হবে।
তবে মিসর ও অন্যান্য দেশ এ পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা বলেছে, ফিলিস্তিনিদের নিজভূমি থেকে উৎখাতের যেকোনো প্রচেষ্টা তারা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করে। তারা ইসরাইলকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে, যেখানে রাফাহ সীমান্ত দুই দিকেই খোলার কথা বলা হয়েছে। যুদ্ধ চলাকালে রাফাহ সীমান্ত প্রায়ই বন্ধ ছিল। অক্টোবর ১০ তারিখে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও সীমান্ত খুলতে বিলম্ব করছে ইসরাইল। তারা বলছে, হামাস সব বন্দীর লাশ ফেরত দেয়নি এবং মিসরের সাথে সমন্বয় প্রয়োজন। বর্তমানে একজন বন্দীর লাশ গাজায় রয়ে গেছে, যা ইসরাইলি বোমাবর্ষণে ধ্বংসস্তূপের কারণে উদ্ধার সম্ভব হয়নি। মন্ত্রীরা ট্রাম্পের শান্তি প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছেন। তার পরিকল্পনায় টেকনোক্র্যাটদের নেতৃত্বে একটি ফিলিস্তিনি সরকার গঠন এবং বহু জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েনের কথা রয়েছে। তারা বলেছেন, এ পরিকল্পনা বিলম্ব ছাড়া এগিয়ে নিতে হবে। তারা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে গাজায় দায়িত্ব গ্রহণের সুযোগ দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সাথে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান বাস্তবায়নের কথা বলেছেন। এতে ১৯৬৭ সালের সীমারেখায় গাজা ও পশ্চিম তীরসহ পূর্ব জেরুসালেমকে রাজধানী করে স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের দাবি জানানো হয়েছে।
ইসরাইলি সেনা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার ছাড়া যুুদ্ধবিরতি অসম্পূর্ণ : কাতার
গাজায় যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত যুদ্ধবিরতি এগিয়ে নেয়ার আলোচনা এখন সঙ্কটময় মুহূর্তে রয়েছে বলে জানিয়েছেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আলে সানি। গতকাল শনিবার দোহা ফোরামের এক আলোচনায় তিনি এসব কথা জানান। তিনি বলেন, তার দেশ যুদ্ধের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে এবং যুদ্ধবিরতির পরবর্তী ধাপ বাস্তবায়নে প্রচেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, “আমরা এখন সঙ্কটময় মুহূর্তে আছি। এখনো পূর্ণ যুদ্ধবিরতি হয়নি, যা হয়েছে তা কেবল বিরতি।” তিনি আরো বলেন, “এটিকে এখনো যুদ্ধবিরতি বলা যায় না। যুদ্ধবিরতি সম্পূর্ণ হবে কেবল তখনই, যখন ইসরাইলি সেনা পুরোপুরি প্রত্যাহার হবে, গাজায় স্থিতিশীলতা ফিরবে এবং মানুষ অবাধে যাতায়াত করতে পারবে যা এখনো হয়নি।”
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেন, গাজায় আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েন নিয়ে আলোচনা চলছে। এর মূল লক্ষ্য হবে সীমান্তে ইসরাইলি ও ফিলিস্তিনিদের আলাদা রাখা। আরব ও মুসলিম দেশগুলো এ বাহিনীতে সেনা পাঠাতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তারা জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের ভোটের আগে পরিকল্পনায় ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের বিষয়টি স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছিল। ইসরাইলের বাধা দেয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। অক্টোবর ১০ তারিখে যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর থেকে ২০ জন জীবিত বন্দী এবং ২৭ জনের লাশ ফেরত দিয়েছে হামাস। এর বিনিময়ে প্রায় দুই হাজার ফিলিস্তিনি বন্দী ও দণ্ডপ্রাপ্তদের মুক্তি দেয়া হয়েছে।
যুদ্ধবিরতির মধ্যেও হামলা অব্যাহত
গতকাল শনিবার ভোরে ইসরাইলি বাহিনী গাজায় তীব্র হামলা চালায়। বেইত লাহিয়ায় ড্রোন হামলায় দুইজন নিহত হন। তারা পরিবারের সদস্যদের সাথে খামার দেখতে গিয়েছিলেন। আলজাজিরার খবরে বলা হয়েছে, ইসরাইল দাবি করেছে পরিবারটি যুদ্ধবিরতির সময় নির্ধারিত হলুদ রেখা অতিক্রম করেছে। তবে তারা জানত না যে ওই এলাকা বিপজ্জনক ও নিষিদ্ধ।
এ ছাড়া ইসরাইল অন্তত ২০টি বিমান হামলা চালিয়েছে। হামলার শিকার হয়েছে পূর্ব গাজা শহর, মাঝের মাগাজি শরণার্থী ক্যাম্প ও দক্ষিণের রাফাহ। খান ইউনুস ও রাফাহর পূর্বাঞ্চলে ইসরাইলি সেনারা অবস্থান নিয়ে গোলাবর্ষণ ও ভারী অস্ত্র ব্যবহার করেছে। ইসরাইলি নৌযানগুলো খান ইউনুস উপকূলে ফিলিস্তিনি মাছ ধরার নৌকা লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে। ইসরাইলি সেনারা এখনো গাজার দক্ষিণ ও পূর্ব অংশ এবং উত্তরাঞ্চলের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। এটি পুরো গাজার প্রায় অর্ধেক এলাকা। গাজায় ইসরাইলের গণহত্যায় ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে অন্তত ৭০ হাজার ১২৫ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭১ হাজার ১৫ জন আহত হয়েছেন।
আবু শাবাবকে হত্যার দায় স্বীকার হামাসের
হামাসের সামরিক শাখা কাসসাম বিগ্রেড আবু শাবাবকে হত্যার দায় স্বীকার করেছে। গতকাল শনিবার মিডল ইস্ট মনিটরে প্রকাশিত এক খবরে এক ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের বরাতে বিষয়টি জানা যায়।
হামাস জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার গাজার রাফাহ শহরে ইসরাইলপন্থী গ্যাং নেতা ইয়াসের আবু শাবাবকে পরিকল্পিত হামলায় হত্যা করা হয়েছে। সূত্র জানায়, আবু শাবাব গোত্রের এক তরুণ প্রথমে ওই গ্যাংয়ে যোগ দেয়ার ভান করে। পরে তিনি পরিকল্পনা অনুযায়ী হামলা চালিয়ে আবু শাবাবসহ তার কয়েকজন সহযোগীকে হত্যা করেন। এ হামলা ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। রাফাহর ইসরাইলপন্থী মিলিশিয়ারা ধারণা করেছিল কাসসাম ব্রিগেডের আক্রমণ আসবে ওপর থেকে, সম্ভবত বিশেষ ইউনিটের মাধ্যমে। তাই তারা ইসরাইলি ট্যাংকের কাছে আশ্রয় নিতে প্রস্তুত ছিল। কিন্তু হামলা আসে ভেতর থেকে, ফলে আক্রমণ সফল হয়। সূত্র আরো জানায়, কয়েক দিন আগে আবু শাবাব ভিডিও বার্তায় রাফাহ ‘পরিষ্কার’ করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি ও তার সহযোগীরা নিহত হন। সূত্র এটিকে শহরকে গ্যাং থেকে প্রকৃত মুক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছে। এ হামলা ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলনের জন্য বড় ধরনের সাফল্য এবং ইসরাইলি নিরাপত্তাব্যবস্থার জন্য বড় ধাক্কা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে ইসরাইলপন্থী মিলিশিয়া দিয়ে গাজার কিছু অংশ নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা বিফলে গেছে।
আবু শাবাব প্রায় ১০০ জন সশস্ত্র যোদ্ধার নেতৃত্ব দিতেন। তারা ইসরাইলের সহায়তায় পূর্ব রাফাহতে একটি ‘নিরাপদ অঞ্চল’ গড়ে তোলার চেষ্টা করছিল, যা প্রতিরোধ আন্দোলনকে দুর্বল করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল। প্রতিরোধ সূত্র জানায়, এ গ্যাং ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে নানা কর্মকাণ্ড চালিয়েছে। এর মধ্যে ছিল বাড়ি তল্লাশি, প্রতিরোধ যোদ্ধাদের পুঁতে রাখা বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয় করা, যোদ্ধাদের হত্যা এবং অস্ত্র বাজেয়াপ্ত করা- সবই ইসরাইলি দখলদার বাহিনীর সাথে সমন্বয়ে। আবু শাবাব এক ভিডিওতে দাবি করেছিলেন, তার দল হামাস থেকে মুক্ত করা এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সাথে মিলে সাহায্য বিতরণ ও বেসামরিকদের সুরক্ষা দিচ্ছে। তবে একাধিক খবরে বলা হয়েছে, তারা আসলে গাজায় প্রবেশ করা মানবিক সহায়তা লুট করছিল।
হাসপাতাল পরিচালককে গ্রেফতারের বছর পূর্তিতে বিশ্বকে পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান
গাজার কামাল আদওয়ান হাসপাতালের পরিচালক ডা: হুসাম আবু সাফিয়াকে ইসরাইলি সেনারা এক বছর ধরে বন্দী করে রেখেছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তার মুক্তির জন্য বিশ্বকে পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানিয়েছে। ২০২৪ সালের ২৭ ডিসেম্বর ইসরাইলি সেনারা হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে বন্দুকের মুখে তাকে আটক করে।
গত অক্টোবরে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছিল, একজন আইনজীবী আবু সাফিয়া ও অন্য বন্দীদের সাথে সাক্ষাৎ করে দেখেছেন তারা নির্যাতন ও অমানবিক আচরণের শিকার হয়েছেন। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রধান মুনির আল-বুরশ টেলিগ্রামে বলেন, “আমরা বিশ্বের দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি আবু সাফিয়ার মুক্তি নিশ্চিত করতে, তার ভাগ্য প্রকাশ করতে এবং আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে তাকে সুরক্ষা দিতে।”
আল-বুরশ জোর দিয়ে বলেন, একজন চিকিৎসক কখনো লক্ষ্যবস্তু হতে পারেন না। যারা চিকিৎসককে অপহরণ করে, তারা আসলে ন্যায়বিচারের মূলকেই অপহরণ করে। তিনি আরো বলেন, আবু সাফিয়াকে অস্ত্র বহন বা কাউকে ক্ষতি করার জন্য আটক করা হয়নি। বরং তিনি তার মানবিক দায়িত্ব পালন করছিলেন, হাতে ছিল স্টেথোস্কোপ আর সহানুভূতিশীল হৃদয়, যখন বিশ্ব তাদের ছেড়ে দিয়েছিল তখন তিনি মানুষের জীবন রক্ষায় পাশে ছিলেন। আল-বুরশ জানান, আবু সাফিয়া গাজার হাসপাতাল ও অপারেশন থিয়েটারে সুপরিচিত ছিলেন। ইসরাইলি হামলার সময় তিনি আহতদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। পরে তাকে গ্রেফতার করা হয়, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং জীবন বাঁচানোর চিকিৎসক হিসেবে তার ভূমিকা পালনের সুযোগ কেড়ে নেয়া হয়।



