মুহা: আব্দুল আউয়াল রাজশাহী ব্যুরো
- উৎপাদন বেশি, বাজার ব্যবস্থাপনা দুর্বল
- লোকসানের শঙ্কায় বাগানমালিকরা
দেশের আমের রাজধানীখ্যাত রাজশাহী অঞ্চলে চলতি মৌসুমেও সন্তোষজনক দাম না পেয়ে হতাশ কৃষক, বাগানমালিক ও ব্যবসায়ীরা। বিগত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় এবারো উৎপাদন ব্যয়ের সাথে বাজারমূল্যের সামঞ্জস্য না থাকায় লোকসানের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। কৃষকদের অভিযোগ, উৎপাদন ভালো হলেও তারা এর সুফল পাচ্ছেন না। বরং বাগান পরিচর্যা, সার, কীটনাশক, সেচ, শ্রমিক ও পরিবহন ব্যয় বাড়তে থাকলেও আমের দাম সেই অনুপাতে বাড়েনি।
রাজশাহীর বাঘা, চারঘাট, পুঠিয়া, তানোর, মোহনপুর ও গোদাগাড়ীসহ জেলার বিভিন্ন আম উৎপাদনকারী এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মৌসুমের শুরু থেকেই বাজারে দাম নিয়ে অসন্তোষ বিরাজ করছে। বিশেষ করে গোপালভোগ, লক্ষণভোগ, হিমসাগর, ল্যাংড়া ও আম্রপালিসহ জনপ্রিয় জাতের আমের দাম গত কয়েক বছরের তুলনায় খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়।
উৎপাদন বেশি, কিন্তু বাজারে নেই স্বস্তি : কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় অনেক এলাকায় আমের উৎপাদন ভালো হয়েছে। ফলে বাজারে সরবরাহও বেড়েছে। সাধারণ অর্থনীতির নিয়ম অনুযায়ী সরবরাহ বাড়লে দাম কিছুটা কমে। তবে শুধু বেশি উৎপাদনই আমের দাম কমার একমাত্র কারণ নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উৎপাদন বৃদ্ধি তখনই সমস্যায় পরিণত হয় যখন পণ্য সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাত করার সক্ষমতা সমান হারে বাড়ে না। রাজশাহীর ক্ষেত্রে মূল সঙ্কট এখানেই।
সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে দ্রুত বিক্রি : আম একটি দ্রুত পচনশীল ফল। পর্যাপ্ত হিমাগার ও আধুনিক সংরক্ষণ সুবিধা না থাকায় কৃষক ও বাগানমালিকরা দীর্ঘদিন আম ধরে রাখতে পারেন না। ফলে বাজারে দাম কম থাকলেও দ্রুত বিক্রি করতে বাধ্য হন তারা। এতে পাইকার ও মধ্যস্বত্বভোগীরা সুবিধা পেলেও উৎপাদক পর্যায়ে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হয় না।
বাঘা উপজেলার এক বাগানমালিক জানান, একটি বাগান পরিচর্যায় আগের তুলনায় ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। কিন্তু আম বিক্রির সময় সেই খরচের প্রতিফলন পাওয়া যাচ্ছে না। বাজারে আম বেশি আসার সুযোগে অনেকে কম দাম বলছেন।
মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য : আম ব্যবসায় জড়িতরা বলছেন, বাগান থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত একাধিক ধাপ অতিক্রম করতে হয়। কৃষকের কাছ থেকে কম দামে আম কিনে মধ্যস্বত্বভোগীরা বেশি লাভ করলেও উৎপাদকরা বঞ্চিত হচ্ছেন। সরাসরি কৃষক থেকে ভোক্তার কাছে আম পৌঁছানোর কার্যকর ব্যবস্থা এখনো সীমিত।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, বাজারে প্রকৃত প্রতিযোগিতা না থাকায় অনেক সময় চাষিরা অসহায় অবস্থায় কম দামে আম বিক্রি করতে বাধ্য হন।
রফতানি ও প্রক্রিয়াজাতের সীমাবদ্ধতা : রাজশাহীর আম দেশজুড়ে জনপ্রিয় হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানির পরিমাণ এখনো প্রত্যাশার তুলনায় কম। উৎপাদন বাড়লেও নতুন বাজার সৃষ্টি না হওয়ায় অধিকাংশ আম স্থানীয় বাজারের ওপর নির্ভরশীল। ফলে সরবরাহ বেড়ে গেলে দামের ওপর চাপ পড়ে।
এ ছাড়া আমভিত্তিক শিল্প যেমন জুস, পাল্প, আচার, শুকনো আম ও অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত পণ্যের শিল্প এখনো পর্যাপ্তভাবে বিকশিত হয়নি। ফলে অতিরিক্ত উৎপাদিত আমের বড় অংশ তাজা ফল হিসেবেই বাজারে আসে এবং দাম কমে যায়।
পরিবহন ও বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা : সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত ও সাশ্রয়ী পরিবহন ব্যবস্থার অভাবও আমের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। রাজধানী ও অন্যান্য বড় শহরে সহজে আম পৌঁছাতে না পারলে উৎপাদনকারী এলাকাগুলোতেই সরবরাহের চাপ সৃষ্টি হয়। এতে স্থানীয় বাজারে দরপতন ঘটে।
বাঘা উপজেলার পাকুড়িয়া এলাকার ব্যবসায়ী ও বাগানমালিক শফিকুল ইসলাম ছানা বলেন, অনুকূল আবহাওয়ার কারণে চলতি মৌসুমে আমের ফলন বেশ ভালো হয়েছে। কিন্তু বাজারদর নিয়ে বাগানমালিক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। সরকারিভাবে আমের বাজার ব্যবস্থাপনা জোরদার, আধুনিক প্রসেসিং সেন্টার স্থাপন এবং রফতানিকার্যক্রম সম্প্রসারণ করা গেলে কৃষক, বাগানমালিক ও ব্যবসায়ীরা আম থেকে অধিক লাভবান হতে পারবেন।’
বানিয়াপাড়া গ্রামের আম ব্যবসায়ী আব্দুল খালেক বলেন, ঈদের ছুটির পর একসাথে বিপুল পরিমাণ আম বাজারে আসায় সরবরাহ বেড়ে গেছে। এতে বাজারে আমের দামে ধস নেমেছে। এ ছাড়া অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আড়তদার ও পাইকারদের উপস্থিতিও তুলনামূলক কম। ফলে বিক্রি যেমন কম হচ্ছে, তেমনি কাক্সিক্ষত দামও পাওয়া যাচ্ছে না। এতে বাগানমালিক ও ব্যবসায়ীরা লোকসানের আশঙ্কায় রয়েছেন।
আম বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও লেখক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, অনুকূল আবহাওয়ার কারণে চলতি মৌসুমে রাজশাহী অঞ্চলে আমের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। উৎপাদন বেশি হওয়ায় বাজারে সরবরাহও বেড়েছে, যা আমের দাম কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। ঈদের আগে আমের বাজার মোটামুটি ভালো ছিল। তবে ঈদের পর দাম কিছুটা কমে যায়। একই সময়ে লিচুরও বাম্পার ফলন হওয়ায় ভোক্তাদের একটি বড় অংশের আগ্রহ লিচুর দিকে ঝুঁকেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই আমের চাহিদা কিছুটা কমেছে।
তিনি আরো বলেন, সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উৎপাদিত আম অনেক ক্ষেত্রে ‘রাজশাহীর আম’ পরিচয়ে দেশের বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। সাধারণ ক্রেতারা অনেক সময় বুঝতে পারেন না কোনটি প্রকৃত রাজশাহীর আম আর কোনটি অন্য জেলার। পাশাপাশি কিছু ব্যবসায়ী অপরিপক্ব আম আগে ভাগেই বাজারজাত করছেন, যা রাজশাহীর আমের সুনাম ও ঐতিহ্যের জন্য ক্ষতিকর। এ ধরনের অনিয়ন্ত্রিত বাজার ব্যবস্থাপনার কারণে রাজশাহীর আমের স্বকীয়তা ও ব্র্যান্ডমূল্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
কৃষি অর্থনীতিবিদদের মত : কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজশাহী অঞ্চলের অর্থনীতিতে আম একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হলেও উৎপাদক পর্যায়ে লাভ কমে গেলে ভবিষ্যতে অনেকে আমচাষে আগ্রহ হারাতে পারেন। এটি দেশের কৃষি অর্থনীতির জন্যও উদ্বেগজনক। তাদের মতে, শুধুমাত্র উৎপাদন বৃদ্ধি নয়, উৎপাদিত আমের সঠিক বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্য প্রয়োজন আধুনিক সংরক্ষণাগার নির্মাণ, রফতানি সম্প্রসারণ, প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলা, অনলাইন বিপণনব্যবস্থার উন্নয়ন এবং কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি পণ্য সংগ্রহের কার্যকর উদ্যোগ।
যা করণীয় : বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আমচাষিদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকার, কৃষি বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন এবং ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি রফতানি বাজার সম্প্রসারণ, কৃষক পর্যায়ে বাজার তথ্য পৌঁছে দেয়া, মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ এবং আমভিত্তিক শিল্প স্থাপনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। রাজশাহীর আম দেশের গর্ব। কিন্তু উৎপাদকরা যদি বছরের পর বছর ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন, তাহলে এই সম্ভাবনাময় খাতের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানিয়েছেন কৃষক, বাগানমালিক ও ব্যবসায়ীরা।



