নিজস্ব প্রতিবেদক
কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে সবার সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল রোববার দুপুরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতীয় উন্নয়ন কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়, এই যাত্রায় বর্তমান সরকার বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, নাগরিক সমাজ এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেক্টর সবার সহযোগিতা আশা করে। আমি বিশ্বাস করি, আমরা যদি ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করি, তাহলে আমাদের যে অগ্রযাত্রা আমরা প্রত্যাশা করি সেই অগ্রযাত্রাকে কেউ ইনশাল্লাহ রুদ্ধ করতে পারবে না। আসুন, আমরা সবাই মিলে এমন একটি কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলি যা শুধু সনদ প্রদান করবে না বরং দেশে দক্ষ মানবসম্পদও সৃষ্টি করবে, জনসংখ্যাকে জন সম্পদে রূপান্তর করবে। শিক্ষা শুধু চাকরিজীবী তৈরি করবে না বরং তৈরি করবে নতুন উদ্যোক্তা।
প্রধানমন্ত্রী তার সরকারের নীতি তুলে ধরে বলেন, জনগণের কাছে দায়বদ্ধ এই সরকার একটি জ্ঞান ও মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র এবং সমাজ গড়তে চায়। যেখানে শিক্ষা, গবেষণা, মেধা, যোগ্যতা এবং সৃজনশীলতা সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে।
বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কারিকুলামে দক্ষতাভিত্তিক ও কর্মমুখী শিক্ষা অন্তর্ভুক্তিকরণ বিষয়ে শিক্ষক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী এই অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন। এই কর্মসূচির আওতায় ১২ হাজার শিক্ষককে দক্ষ হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এই কর্মসূচির প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে, ‘কর্মমুখী শিক্ষা নেব, বিশ্বজুড়ে কাজ করব’।
তরুণরাই সমৃদ্ধ দেশের নির্মাতা হবে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের তারুণ্য এবং ছাত্র যুবশক্তিকে যদি প্রযুক্তিতে-জ্ঞানে-বিজ্ঞানে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা যায় তাহলে আমি ব্যক্তিগতভাবে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি সেদিন হয়ত বেশি দূরে নয় যেদিন সমৃদ্ধ স্বনির্ভর বাংলাদেশ হয়ে উঠতে পারে বিশ্বের রোল মডেল। ভাষা শিক্ষার ওপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলা এবং ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় আরেকটি ভাষা শিখতে পারলে দেশে-বিদেশে কোথাও আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কর্মসংস্থানের সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
ফ্যাসিবাদের শাসনামলে শিক্ষাব্যবস্থাকে অকার্যকর ও বিপর্যস্ত করে তোলার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে এবার আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর পালা। যখন আমরা দেখি আমাদের সামনে এতো বিশাল ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা তখন আমাদের মনোবল আরো বৃদ্ধি পায়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে আধুনিক এবং প্রযুক্তিনির্ভর উচ্চশিক্ষা বিস্তারে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কারণ সারা দেশে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজের সংখ্যা দুই হাজারের বেশি। এসব প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে ৪০ লাখের মতো শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব এখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের অবাধ প্রসার ও ব্যবহার বর্তমানে মানুষের জন্য নানামুখী চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। অটোমেশন এবং এআই-চালিত প্রযুক্তির কারণে হয়ত অনেক পুরনো পেশায় কর্মসংস্থান যেমন ঝুঁকির মুখে পড়েছে কিংবা অবলুপ্ত হয়েছে, একইসাথে প্রচুর পরিমাণ নতুন নতুন ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, প্রযুক্তিগত বিপ্লব মোকাবেলায় সার্টিফিকেট নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তে বর্তমানে দক্ষতাভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং বাস্তব ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার বিকল্প নেই। বর্তমান সরকার মনে করে, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ফরেনসিক সাইয়েন্স, প্রোগ্রামিং, ডিজিটাল ইন্টাপ্রেনরশিপ, ডিজিটাল কমিউনিকেশন, কনগোটিভ এমপাওয়ারমেন্ট, প্রেজেনটেশন স্কিল, লিডারশিপ এবং ফ্যাইনেনশিয়াল লিটারেসির মতো সফ্ট স্কিলের বিষয়গুলো ছাড়া শিক্ষা কারিকুলাম পূর্ণাঙ্গ হয়ে উঠতে পারে না। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, বায়ো টেকনোলজি, কোয়ানটাম কম্পিউটিং, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইন্টারনেট অব থিংকস, মেটারিয়াল সায়েন্স, ন্যানো টেকনোলজি, থ্রি ডি প্রিন্টিং কিংবা পঞ্চম জেনারেশন ওয়ারলেস টেকনোলজি আগামী দিনগুলোতে এইসব বিষয় সম্পর্কে উদাসীন থেকে সাফল্য অর্জন অসম্ভব হয়ে উঠবে। শিক্ষার সংস্কার প্রধানমন্ত্রী বলেন, এমন বাস্তবতায় বর্তমান সরকার অগ্রাধিকারভিত্তিতে প্রাথমিক পর্যায় থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত শিক্ষা কারিকুলামকে বাস্তবভিত্তিক, কর্মমুখী এবং প্রযুক্তিনির্ভর করার কাজ ইতোমধ্যেই শুরু করেছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমকে সময়োপযোগী, আধুনিক এবং বাস্তবমুখী করার কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
নৈতিক শিক্ষা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের এটিও মনে রাখা প্রয়োজন, একজন মানবিক মানুষ হয়ে ওঠার জন্য নৈতিক শিক্ষার বিকল্প নেই। আমি আশা করি, জাতীয় বিশ^বিদ্যালয় প্রযুক্তি নির্ভরতা, দক্ষতা এবং মর্ডানাইজেশনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়গুলোর প্রতি আরো গুরুত্ব দেবেন।
বেকার সমস্যা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উচ্চশিক্ষা নিয়েও অনেককে বেকার থাকতে হয়। এর কারণ হচ্ছে, ব্যবহারিক, প্রায়োগিক কিংবা প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করতে না পারা। পরিস্থিতি বিবেচনা করে উচ্চ শিক্ষাব্যবস্থাকে বাস্তবমুখী করার লক্ষে বর্তমান সরকার এপ্রেন্টিসশিপ, ইন্টার্নশিপ এবং ইন্ড্রাস্ট্রি-একাডেমিয়া সহযোগিতা বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে চায়। ফলে শিক্ষা জীবন শেষে তাকে আর বেকার থাকতে হবে না। ‘ইনোভেটিভ বিজনেস আইডিয়া’ বাণিজ্যিকীকরণ করতে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় ‘সিড ফান্ডিং’ বা ‘ইনোভেশন গ্র্যান্ট’ প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকার আশা করে এর ফলে অনেক আগ্রহী তরুণ উদ্যোক্তা নতুন এবং সৃজনশীল ব্যবসায়িক ধারণা বাস্তবায়ন করে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে সক্ষম হবেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক এ এস এম আমানুল্লাহর সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী আনম এহছানুল হক মিলন, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহাদী আমিন, শিক্ষাসচিব আবদুল খালেক, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি অধ্যাপক মো: লুৎফর রহমান বক্তব্য রাখেন।
আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ধন্যবাদ প্রধানমন্ত্রীর
সংসদ প্রতিবেদক জানান, রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় আদালতের গ্রীষ্মকালীন ছুটি স্থগিত রেখে স্বল্প কয়েক কার্যদিবসের মধ্যে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার দেশের বিচারব্যবস্থায় এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়কমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান। একই ঘটনায় আসামিদের দ্রুত শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনায় আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
গতকাল রোববার জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেয়া এক বিবৃতিতে আইনমন্ত্রী বলেন, ১৯ মে পল্লবীতে রামিসা নির্মমভাবে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হওয়ার মাত্র ৭ ঘণ্টার মধ্যে পুলিশ মূল দুই আসামিকে গ্রেফতার করে। ঘটনার পর ভিক্টিমের পরিবার বিচার নিয়ে হতাশা প্রকাশ করলেও সরকার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার আশ্বাস দেয়। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। আইনমন্ত্রী জানান, মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করে ২৪ মে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয় এবং একই দিন তা সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। বিচার দ্রুত শেষ করতে ১ জুন থেকে শুরু হওয়া নিম্ন আদালতের গ্রীষ্মকালীন ছুটির মধ্যেও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল সচল রাখতে প্রধান বিচারপতি বিশেষ সিদ্ধান্ত নেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, এই রায়ের মাধ্যমে রামিসার পরিবারের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। একই সাথে আলোচিত অন্যান্য মামলার তদন্ত ও বিচার দ্রুত শেষ করতেও সরকার বিশেষ তদারকি অব্যাহত রেখেছে।
এদিকে, জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত কার্য উপদেষ্টা কমিটির সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রামিসা হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেফতারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করেন। তিনি বিশেষভাবে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়কমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দ্রুত তদন্ত, অপরাধীদের শনাক্তকরণ ও গ্রেফতারের মাধ্যমে সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রতিফলন ঘটেছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বিচারিক কার্যক্রম দ্রুত ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে এবং দোষীরা প্রচলিত আইন অনুযায়ী উপযুক্ত শাস্তি পাবে। একই সাথে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে একই ধরনের পেশাদারিত্ব ও নিষ্ঠা বজায় রাখার আহ্বান জানান।



