কূটনৈতিক প্রতিবেদক
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের টানাপড়েনের পর বাংলাদেশের নতুন সরকারের সাথে ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইছে ভারত। এ লক্ষ্যে ভারতের নতুন হাইকমিশনার দায়িত্ব নেয়ার পরপরই বাংলাদেশীদের জন্য ভিসা সহজীকরণের উদ্যোগ নেন। সেপ্টেম্বরে দিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ প্রোগ্রামে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ভারতের পররাষ্ট্রনীতির কাঠামোয় বাংলাদেশের অবস্থানকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরে বিএনপি সরকারের সাথে নতুনভাবে সম্পর্ক গড়ে তুলতে কেন্দ্রীয় সরকারকে পরামর্শ দিয়েছে লোকসভার পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। পুশইন ও সীমান্ত হত্যাও দৃশ্যমানভাব কমে এসেছে। এখন দুই প্রতিবেশী দেশ অস্বস্তিকর ইস্যুগুলো নিরসন করে নতুন করে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চাইছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কূটনীতিকরা এমন ধারণাই পোষণ করছেন।
ভিসা-ব্যবস্থা সহজীকরণের পর দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জোট ব্রিকসের আউটরিচ প্রোগ্রামে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানোর প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ইতিবাচক ধারায় অগ্রগতি হচ্ছে কি না জানতে চাইলে রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান গতকাল নয়া দিগন্তের সাথে আলাপকালে বলেন, হ্যাঁ, অবশ্যই তা বলা যেতে পারে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছিল। এই পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসার জন্য ভারতও একটি পথ খুঁজছিল। তবে পথটা ততটা সহজ ছিল না। কেননা ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান দমনে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায় নিয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে দেয়ার একটা চাপ ছিল। এই চাপকে পাশ কটিয়ে অন্যান্য ইস্যু নিয়ে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক এগিয়ে নেয়ার জন্য নির্বাচিত সরকারের সাথে ভারত কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ্যে ব্যক্ত করেছিল। এরই ধারাবাহিকতায় বিএনপির তৎকালীন চেয়ারপারসন মরহুম বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ঢাকা এসেছিলেন, নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানাতে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা এবং দেশটির পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি এসেছিলেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সপরিবারে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর একটি চিঠি হস্তান্তর করেছিলেন ওম বিড়লা। এগুলো সবই বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ইতিবাচক ইঙ্গিত। তবে এরপর পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর পুশইনকে কেন্দ্র করে ভারতের সাথে সম্পর্ক উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তবে ধারণা করা হয়, পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকার ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার থেকে বাহ্বা কুড়ানোর জন্য ‘অবৈধ বাংলাদেশী’ ইস্যুটিকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করেছিল, যা ঢাকার হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে প্রবীণ রাজনীতিবিদ দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশে আসার পর অনেকটা স্তিমিত হয়ে গেছে। ত্রিবেদী হাইকমিশনারের দায়িত্ব নেয়ার পরপরই বাংলাদেশীদের জন্য মেডিক্যাল ভিসার সংখ্যা বাড়িয়ে পর্যটন ভিসা উন্মুক্ত করে দেন, যা দুই দেশের জনগণের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
এ দিকে ভারতের পররাষ্ট্রনীতির কাঠামোয় বাংলাদেশের অবস্থানকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরে বিএনপি সরকারের সাথে নতুনভাবে সম্পর্ক গড়ে তুলতে কেন্দ্রীয় সরকারকে পরামর্শ দিয়েছে লোকসভার পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। ভারত সরকারকে গণতান্ত্রিক, স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ, জনগণকেন্দ্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান ধরে রাখতে কংগ্রেস নেতা শশী থারুরের নেতৃতাধীন সংসদীয় কমিটি গত বৃহস্পতিবার এই পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পেশ করে। প্রতিবেদনে ১৯৭১ সালের চেতনা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ভিত্তিতে বাংলাদেশ সরকারের সাথে সম্পর্ক এগিয়ে নেয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
ভারতের লোকসভার পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি বাংলাদেশবিষয়ক প্রতিবেদনকে ‘ইতিবাচক’ হিসেবে উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান বলেন, দুই দেশের সম্পর্কে অস্বস্তিকর বিষয়গুলোকে সাথে নিয়েই অনিষ্পন্ন ইস্যুগুলো নিয়ে আমাদের অগ্রগর হতে হবে। এর মধ্যে সবচেয়ে সামনে রয়েছে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি, যার মেয়াদ চলতি বছরই শেষ হবে। গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে একটা সমঝোতায় পৌঁছা গেলে অন্যান্য অভিন্ন নদী নিয়ে একটি দিকনির্দেশনা পাওয়া যাবে। তবে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে দ্ইু পক্ষে এখনো মতপার্থক্য রয়েছে। এটা দূর করা না গেলে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন চুক্তি সইয়ের সুযোগ দেখা যাচ্ছে না।
দিল্লিতে আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচে অংশগ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ব্রিকসের সদস্য না হলেও বিমসটেকের সভাপতি দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে এই আউটরিচে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বর্তমানে ভারত, ব্রাজিল, চীন, রাশিয়া, মিসর, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, দক্ষিণ আফ্রিকা ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ব্রিকসের সদস্য। সৌদি আরব এ জোটে যোগ দেয়ার আমন্ত্রণ পেলেও ভূ-রাজনৈতিক কারণে এখনো বিষয়টি বিবেচনাধীন রেখেছে। বাংলাদেশ বিগত আওয়ামী সরকারের আমল থেকেই ব্রিকসের সদস্য হতে আগ্রহ দেখিয়ে আসছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ব্রিকসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য দেশ ব্রাজিল, চীন ও রাশিয়ার সাথে বাংলাদেশ এ ব্যাপারে যোগাযোগ করেছে। দেশগুলো বাংলাদেশের আগ্রহের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেছে, ব্রিকস এই মুহূর্তে সম্প্রসারণে চিন্তাভাবনা করছে না।
তবে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানোর প্রক্রিয়া ‘যথাযথ’ হয়নি উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান বলেন, এ ব্যাপারে দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আলাপ-আলোচনার ঘাটতি রয়েছে বলে মনে হচ্ছে। বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যথাযোগ্য মর্যাদা দিয়ে দিল্লিতে আমন্ত্রণ জানানো, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে তার দ্বিপক্ষীয় বৈঠক বা সৌজন্য সাক্ষাতের আয়োজন করার পর ব্রিকস আউটরিচে তারেক রহমান যোগ দিতে পারেন। অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের দিল্লি যাওয়াটা দৃশ্যমান হতে হবে।
শপথ নেয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সপরিবারে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়ে নরেন্দ্র মোদির চিঠির ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সাবেক এই রাষ্ট্রদূত বলেন, এটা সৌজন্যতা। দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হতে হলে দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে উভয় পক্ষের জন্য সুবিধাজনক একটি সময় নির্ধারণ করতে হবে। এরপর প্রোটোকল অনুযায়ী ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা পররাষ্ট্র সচিব ঢাকা এসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দিল্লি সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানাবেন। আর দ্বিপক্ষীয় সফরে দুই দেশের শীর্ষপর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আলোচনার পাশাপাশি বেশ কিছু চুক্তি বা সমঝোতাস্মারক সই হয়ে থাকে, যা সফরের অর্জনকে তুলে ধরে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরকে এ ব্যাপারে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি জুনে চীনের দালিয়ানে সামার দাভোসে অংশ নেয়ার পাশাপাশি বেইজিংয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং প্রেসিডেন্টের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। এই সময় দুই দেশের মধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দলিল সই হয়েছে, যা সফরটিকে সফল করে তুলেছে।
গত বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সাথে সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেছেন, দুই দেশের সম্পর্ক রিসেটের (নতুন করে শুরু) বিষয়ে আমরা দু’জনই ঐকমত্য পোষণ করেছি। আগামী দিনে পারস্পরিক স্বার্থ সমুন্নত রেখে এবং সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেয়ার বিষয়ে আমরা একমত হয়েছি। তিনি বলেন, বৈঠকে সাধারণভাবে দুই দেশের সম্পর্ক কিভাবে আরো উন্নত করা যায়, সেটি নিয়েই আলোচনা করা হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে কিছু অস্বস্তির জায়গা রয়েছে, সেগুলো নিরসন করা প্রয়োজন, এ বিষয়ে উভয় পক্ষই একমত হয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে ভারত সফরের আমন্ত্রণের বিষয়টি আমরা পর্যালোচনা করছি। প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন সফরের আমন্ত্রণ রয়েছে। সামনে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিতে নিউ ইয়র্ক সফরে যাবেন। তাই সবকিছু সমন্বয় করে দেখতে হচ্ছে।



