নয়া দিগন্ত ডেস্ক
তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি উত্তর পশ্চিমবঙ্গে ভালোভাবে গৃহীত হবে না। বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিধানসভার নির্বাচনে জয়লাভের পর বাংলাদেশে আশা জাগিয়েছে যে মমতা ব্যানার্জির সরকারের পরাজয়ের ফলে তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তির পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘বাধা’ দূর হয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশীরা উদ্বিগ্ন যে, যেহেতু বিজেপি এখন বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী পাঁচটি ভারতীয় রাজ্যের মধ্যে চারটিতে শাসন করছে, ভারত বাংলাদেশে কথিত নথিবিহীন অভিবাসীদের ‘পুশ-ব্যাক’ বা ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া বাড়িয়ে দিতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃসীমান্ত নদী তিস্তা শান্ত ও ভীরু প্রকৃতির। হিমবাহের পশ্চাদপসরণসহ জলবায়ুগত সমস্যা এবং ভারতে এই নদীর ওপর নির্মিত একাধিক বাঁধের পানিপ্রবাহের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে। তবুও, ভারত থেকে বাংলাদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত ৪১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদীটি এখনও কূটনৈতিক ঝড় তুলতে পারে।
ভারত ও বাংলাদেশ কয়েক দশক ধরে তিস্তা নদীর পানি ভাগাভাগি নিয়ে বিবাদে জড়িয়ে আছে। ১৯৮৩ সালে উভয় পক্ষের পানি ভাগাভাগি নিয়ে একটি অস্থায়ী বা অন্তÍর্বর্তীকালীন সমঝোতায় পৌঁছেছিল। এই অস্থায়ী ব্যবস্থাটি পানি বণ্টনের পথনির্দেশক হিসেবে কাজ করার জন্য করা হয়েছিল, কিন্তু এটিকে কখনো আনুষ্ঠানিক রূপ দেয়া হয়নি। এরপর, ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে, প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের ঠিক আগে, দুই পক্ষ তিস্তা নিয়ে একটি খসড়া চুক্তিতে পৌঁছেছিল।
খসড়া চুক্তিটির বিস্তারিত বিবরণ কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি, কিন্তু তৎকালীন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই দেশ এই বিষয়ে সম্মত হয়েছিল যে নদীর ২০ শতাংশ পানি পরিবেশগত প্রবাহের জন্য ছেড়ে দেয়া হবে এবং শুষ্ক মৌসুমে ভারত ও বাংলাদেশ যথাক্রমে ৪২.৫ শতাংশ ও ৩৭.৫ শতাংশ পানি পাবে। ভবিষ্যতে সঠিক তথ্য সংগ্রহের জন্য একটি যৌথ পানিবিজ্ঞান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনও এই চুক্তির অংশ ছিল।
তবে, তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আপত্তি তুলেছিলেন। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে খসড়া চুক্তিটি কোচবিহার, জলপাইগুড়ি এবং দার্জিলিংসহ উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোর সেচ ও পানীয় জলের চাহিদা পর্যাপ্তভাবে মেটাতে পারেনি। তিনি সিংয়ের সাথে ঢাকা যেতে অস্বীকৃতি জানান এবং ফলস্বরূপ চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়নি।
ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোতে, সংশ্লিষ্ট রাজ্যের সম্মতি ছাড়া কেন্দ্রীয় সরকার পানিবণ্টন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। গত ১৫ বছর ধরে, পশ্চিমবঙ্গে মমতার তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষমতায় থাকা এবং তিস্তা চুক্তির বিরোধিতা অব্যাহত রাখায় এই বিবাদ আরো তীব্র হয়েছে। এমনকি কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকারও মমতাকে তার অবস্থান থেকে সরাতে ব্যর্থ হয়েছে। নির্বাচনে মমতার পরাজয়ের পর থেকে, বাংলাদেশের সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদরা পশ্চিমবঙ্গের সাংবাদিকদের ফোন ও বার্তার মাধ্যমে জানতে চেয়েছেন যে, ‘বাধা’ দূর হওয়ায় তিস্তা চুক্তিটি শিগগিরই বাস্তবায়িত হবে কি না।
বিষয়টি ঠিক ততটা সহজ নয়।
তিস্তা ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে থাকা ৫৪টি নদীর মধ্যে একটি। ভারত ও চীন সীমান্তের কাছে উৎপন্ন হওয়া তিস্তা একটি আন্তঃসীমান্ত নদী। এটি বাংলাদেশের সমভূমিতে প্রবেশের আগে ভারতের হিমালয় রাজ্য সিকিম এবং উত্তর পশ্চিমবঙ্গের উপ-হিমালয় অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। এই উভয় অঞ্চলেই এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নদী।
উত্তর পশ্চিমবঙ্গে, এটি একাধিক জেলায় সেচ প্রদান করে। বাংলাদেশে, এটি উত্তর রংপুর বিভাগে সেচ ও পানীয় জল সরবরাহ করে। তিস্তা নদীর প্লাবনভূমি বাংলাদেশের মোট আবাদি জমির ১৪ শতাংশজুড়ে রয়েছে এবং এটি ৯১.৫ লাখ মানুষের জীবনধারণের উৎস।
শুষ্ক মৌসুমে পানির সীমিত প্রবাহের কারণে তিস্তার পানিবণ্টন অত্যন্ত বিতর্কিত হয়ে ওঠে, বিশেষ করে কম বৃষ্টিপাতের বছরগুলোতে। বাংলাদেশকে তিস্তার পানির একটি বৃহত্তর অংশ ছেড়ে দেয়া কঠিন হবে, কারণ এর জন্য উত্তর পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক মূল্য দিতে হবে, যেখানে জনমত ব্যাপকভাবে একটি পানি-বণ্টন চুক্তির বিরুদ্ধে।
যদিও পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতারা আগে চুক্তিটি বাস্তবায়িত না হওয়ার জন্য মমতার বিরোধিতাকে দায়ী করেছিলেন, নতুন বিজেপি সরকারের পক্ষে শিগগিরই মমতার তিস্তানীতি থেকে সরে আসা কঠিন হবে।
উত্তর পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সংসদ সদস্য জয়ন্ত কুমার রায় ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’-কে বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, উত্তরবঙ্গের স্বার্থের সাথে আপস করে এমন কোনো পানিবণ্টন চুক্তি বাস্তবায়িত হবে না,’ পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিজেপি বিধায়ক ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’-কে বলেন যে, ‘তিস্তার জল ছেড়ে দেয়া উত্তর পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জন্য আত্মঘাতী হবে।’
তিস্তা পানি চুক্তি বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্কের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরে ভারত গড়িমসি করায়, বাংলাদেশ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিজেদের সীমানার মধ্যে তিস্তার পানির ব্যবস্থাপনার উন্নতির জন্য চীনের দিকে ঝুঁকেছে। তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প (টিআরসিএমআরপি), যা মূলত শেখ হাসিনা সরকারের আমলে নেয়া হয়েছিল, এখন ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার বাস্তবায়ন করছে।
সম্প্রতি চীন সফরের আগে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ঢাকায় সাংবাদিকদের বলেন, তার সরকার আশা করে যে, ২০১১ সালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে হওয়া চুক্তিটি বর্তমান পরিস্থিতিতে আবার বিবেচনা করা হবে। কিন্তু তিনি বলেন, আমরা ‘শুধু বসে থেকে এর জন্য অপেক্ষা করতে পারি না’, যা ইঙ্গিত দেয় যে ঢাকার ধৈর্য ফুরিয়ে আসছে এবং তারা অন্যান্য বিকল্প খতিয়ে দেখতে প্রস্তুত।
বেইজিংয়ে তিনি চীনা কর্তৃপক্ষের সাথে টিআরসিএমআরপি নিয়ে আলোচনা করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঊর্ধ্বতন বাংলাদেশী রাজনীতিবিদের মতে, চীন-সমর্থিত এই প্রকল্পের পক্ষে বেশ কয়েকটি বিষয় কাজ করছে। তিস্তা সমস্যার সমাধানে বিএনপি সরকারের ওপর চাপ রয়েছে। এ ছাড়াও, তিস্তা প্রকল্পে অংশগ্রহণের ব্যাপারে চীনের দৃশ্যমান আগ্রহের পক্ষে জনমত তৈরি করেছে, বিশেষ করে পানি ইস্যুতে বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করতে ভারতের ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে।
বাংলাদেশী এক রাজনীতিবিদ বলেন, এই মুহূর্তে বাংলাদেশের শাসক ও বিরোধী দলের কূটনৈতিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ চীন-সমর্থিত প্রকল্পটির পক্ষেই একত্রিত হয়েছে। যদিও টিআরসিএমআরপি-এর পরিবেশগত ও আর্থিক ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, ঢাকার রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, চীন-সমর্থিত প্রকল্পটির পক্ষে বর্তমান জনমত সেই উদ্বেগগুলোকে ছাপিয়ে গেছে। বাংলাদেশের কর্মকর্তারা বলছেন যে চীনেরও ধৈর্য ফুরিয়ে আসছে এবং টিআরসিএমআরপি-এর বিষয়ে তারা বাংলাদেশকে ‘হয় গ্রহণ করো, না হয় বর্জন করো’ সঙ্কেত দিয়েছে।
যদিও চীনের প্রতি বাংলাদেশের এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরের গড়িমসি বন্ধ করতে ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হতে পারে। মোদি সরকার কি তিস্তা নাটকে কোনো নতুন মোড় আনতে পারবে? পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এর সম্ভাবনা খুবই কম।



