তহবিল সঙ্কটে ট্রাম্পের বোর্ড অব পিস গাজার পুনর্গঠন কার্যক্রম

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

গাজায় যুদ্ধবিরতির সাত মাস পার হলেও পুনর্গঠনকার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে আছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতির পর গঠিত ‘বোর্ড অব পিস’ (বিওপি) এখন তহবিল সঙ্কট, রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং হামাসকে ঘিরে বিরোধের কারণে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। খবর দ্য গার্ডিয়ানের।

১৫ মে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে জমা দেয়া এক রিপোর্টে বোর্ড অব পিস দাবি করে, গাজার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রধান বাধা হামাসের অস্ত্র সমর্পণ না করা এবং গাজার নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে অস্বীকৃতি। তবে সংস্থাটির কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত একাধিক সূত্র বলছে, প্রকৃত সঙ্কট অর্থের ঘাটতি এবং বাস্তব অগ্রগতির অভাব।

দাভোসে বোর্ড অব পিসের উদ্বোধনী বৈঠকে ৯টি দেশ গাজার জন্য ৭০০ কোটি ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত কেবল সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মরক্কো অর্থ পাঠিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটি এখন পর্যন্ত মাত্র দুই কোটি ৩০ লাখ ডলার পরিচালন ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীর জন্য ১০ কোটি ডলার পেয়েছে। অর্থাৎ প্রতিশ্রুত প্রতি ১০০ ডলারের বিপরীতে এসেছে মাত্র ১ দশমিক ৭৫ ডলার। অথচ জাতিসঙ্ঘের হিসাব অনুযায়ী, গাজা পুনর্গঠনে কয়েক দশকে ৭০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি প্রয়োজন হবে। গাজার বাস্তবতা এখনো ভয়াবহ। অধিকাংশ মানুষ অস্থায়ী ও অস্বাস্থ্যকর তাঁবুতে বাস করছে। খাদ্যসঙ্কট তীব্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, বিশুদ্ধ পানির সঙ্কট রয়েছে এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধবিরতির পরও ইসরাইল গাজার অর্ধেকের বেশি এলাকা নিয়ন্ত্রণে রেখেছে এবং খাদ্য ও ত্রাণ সরবরাহ সীমিত করছে। ট্রাম্প প্রশাসন গাজাকে ভবিষ্যতে পর্যটন ও বাণিজ্যকেন্দ্রে রূপান্তরের স্বপ্ন দেখালেও বাস্তবে এখনো কোনো বড় পুনর্গঠন কাজ শুরু হয়নি। ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজও শুরু হয়নি বলে জানিয়েছেন কয়েকজন ঠিকাদার। তারা জানান, বিভিন্ন প্রকল্পে দরপত্র জমা দিলেও এখনো কোনো কাজের চুক্তি পাননি। এদিকে গাজার প্রশাসন পরিচালনার জন্য নির্বাচিত ১২ জন ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট বর্তমানে মিসরে অবস্থান করছেন। নিরাপত্তা অনুমতি না পাওয়ায় তারা গাজায় প্রবেশ করতে পারছেন না। অভিযোগ উঠেছে, তাদের মাসিক উচ্চ বেতন দেয়া হলেও গাজার সাধারণ মানুষের জীবনে এখনো তাদের কোনো দৃশ্যমান প্রভাব নেই। বোর্ড অব পিসের প্রধান নিকোলাই ম্লাদেনভ স্বীকার করেছেন, গাজার মানুষ বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাজে হতাশ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘গাজার ভবিষ্যতের দরজা এখনো বন্ধ। ফিলিস্তিনিদের যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল, বাস্তবে তারা তা পায়নি।’

যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন নিয়ে জাতিসঙ্ঘ রিপোর্টের সমালোচনা হামাসের

গাজা যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন নিয়ে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে জমা দেয়া তথাকথিত ‘পিস কাউন্সিল’ রিপোর্টের তীব্র সমালোচনা করেছে হামাস। সংগঠনটি বলেছে, রিপোর্টে বাস্তবতা বিকৃত করা হয়েছে এবং ইসরাইলের শর্তকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। খবর মিডলইস্ট মনিটরের। এক বিবৃতিতে হামাস জানায়, রিপোর্টে প্রতিদিনের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের দায় থেকে ইসরাইলকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে, অথচ পুনর্গঠন বিলম্বের দায় চাপানো হয়েছে হামাসের ওপর। সংগঠনটি বলেছে, গাজার সীমান্তে কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণসামগ্রী ও অবকাঠামো মেরামতের যন্ত্রপাতি প্রবেশে বাধা দিচ্ছে ইসরাইল। ফলে পুনর্গঠনকার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। রিপোর্টে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং গাজার নিরাপত্তা কাঠামোর নিয়ন্ত্রণ ছাড়াকে পুনর্গঠনের প্রধান শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর জবাবে হামাস জানায়, তারা আগেই জাতীয় কমিটির হাতে গাজার প্রশাসনিক দায়িত্ব হস্তান্তরের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। হামাস আরো অভিযোগ করে, নিরস্ত্রীকরণের ওপর অতিরিক্ত জোর দিয়ে যুদ্ধবিরতি প্রক্রিয়াকে দুর্বল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ফিলিস্তিনি পক্ষের ওপর চাপ প্রয়োগের বদলে ইসরাইলকে চুক্তির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বাধ্য করতে সংগঠনটি নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ।

নিহতের সংখ্যা ৭২ হাজার ৭৭৩ ছাড়াল

গাজায় ইসরাইলের চলমান হামলায় নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে অন্তত ৭২ হাজার ৭৭৩ জনে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধে আহত হয়েছেন আরো এক লাখ ৭২ হাজার ৭২৩ জন। খবর আনাদোলু এজেন্সির।

২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পরও গাজায় ইসরাইলি হামলা থামেনি। এ সময়ের মধ্যে অন্তত ৮৮১ ফিলিস্তিনি নিহত এবং দুই হাজার ৬২১ জন আহত হয়েছেন। এরই মধ্যে গাজার বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণ চালানো হয়েছে। গাজা সিটির নাসর এলাকায় জাকুত পরিবারের একটি বাড়িতে ইসরাইলি বিমান হামলায় শিশুসহ পাঁচজন আহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কোনো পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই বাড়িটিতে বোমা হামলা চালানো হয়, এতে আশপাশের এলাকাও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উত্তর গাজার জাবালিয়া এবং গাজা সিটির পূর্বাঞ্চলেও ইসরাইলি কামান হামলা চালানো হয়েছে। একই সময়ে ‘ইয়েলো লাইন’ নামে পরিচিত সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থান নেয়া ইসরাইলি সামরিক যান থেকে গুলিবর্ষণ করা হয়।

দক্ষিণ গাজার খান ইউনুসের আল-মাওয়াসি এলাকায় বেসামরিক লোকজনের ওপর ড্রোন হামলায় আরো দুইজন আহত হন। মধ্য গাজার আল-বুরেইজ শরণার্থী শিবিরে আবু শামালাহ পরিবারের একটি বাড়িতেও হামলা চালানো হয়েছে। অন্যদিকে গাজার উপকূলে মাছ ধরার সময় ইসরাইলি নৌবাহিনীর গুলিতে এক ফিলিস্তিনি জেলে নিহত হয়েছেন। স্থানীয় সূত্র জানায়, যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও গাজার সমুদ্রসীমায় মাছ ধরার ওপর কার্যত নিষেধাজ্ঞা বজায় রেখেছে ইসরাইল। গাজার প্রায় ৯০ শতাংশ বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে বলে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা জানিয়েছে। হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আশ্রয়কেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোও হামলার শিকার হয়েছে।

ত্রাণ প্রবেশ ৩৭ শতাংশে নেমে এসেছে

গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছে গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস। সংস্থাটির পরিচালক ইসমাইল আল-ছাওয়াবতা জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর প্রত্যাশিত ত্রাণের মাত্র ৩৭ শতাংশ গাজায় প্রবেশ করেছে। তার ভাষ্যমতে, যুদ্ধবিরতির পর গাজায় প্রবেশ করার কথা ছিল এক লাখ ৩১ হাজার ৪০০টি ত্রাণবাহী ট্রাক। কিন্তু বাস্তবে প্রবেশ করেছে মাত্র ৪৮ হাজার ৬৩৬টি ট্রাক। ফলে গাজার মৌলিক মানবিক চাহিদার ৬৩ শতাংশের বেশি পূরণ হয়নি। মে মাসের শুরু থেকে ১৮ মে পর্যন্ত পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে বলে জানান তিনি। এ সময়ে নির্ধারিত ১০ হাজার ৮০০ ট্রাকের বিপরীতে প্রবেশ করেছে মাত্র দুই হাজার ৭১৯টি ট্রাক, যা মোট প্রয়োজনের মাত্র ২৫ শতাংশ। আল-ছাওয়াবতা অভিযোগ করেন, ইসরাইল খাদ্য, ওষুধ ও মানবিক সহায়তাকে রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতাকারীদের প্রতি আহ্বান জানান, যেন ইসরাইলকে সীমান্ত খুলে দিতে এবং ত্রাণপ্রবাহ নিশ্চিত করতে চাপ দেয়া হয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ঘোষিত যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনায় প্রতিদিন ৬০০টি ত্রাণবাহী ট্রাক গাজায় প্রবেশের কথা ছিল।