সংসদ প্রতিবেদক
জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়ন এবং ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর অধিবেশন আহ্বানকে কেন্দ্র করে জাতীয় সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। মুলতবি অধিবেশনে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে তীব্র বাদানুবাদ, হট্টগোল এবং পাল্টাপাল্টি অভিযোগে কার্যত অচলাবস্থার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। গতকাল রোববার মাগরিবের বিরতির পর বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমানের উত্থাপিত একটি মুলতবি নোটিশকে কেন্দ্র করে এই উত্তেজনার সূত্রপাত হয়। নোটিশে তিনি ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’-এর অনুচ্ছেদ ১০ অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান না হওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং এ বিষয়ে সংসদে আলোচনা চেয়ে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। কথা বলার ফ্লোর নিয়ে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয় সংসদ অধিবেশনে।
এ সময় স্পিকারের আসনে থাকা ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান জুলাই জাতীয় সনদ সংবিধান ও সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ নিয়ে একটি নোটিশ উপস্থাপন করেন। তারপর আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান বক্তব্য রাখেন। তিনি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে একটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করার জন্য বক্তব্য রাখেন। সেদিন সংবিধান, জুলাই সনদসহ প্রয়োজনীয় বই উপস্থিত রাখার জন্য বলেন। তারপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ বক্তব্য রাখেন। তিনি বিরোধী দলের নেতার নোটিশটি সংশোধনের পরামর্শ দেন। এরই মধ্যে স্পিকার আগামীকাল মঙ্গলবারের কার্যক্রমের শেষ দুই ঘণ্টা নির্ধারণ করেন। এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবার কথা বলার জন্য ফ্লোর চাইলে ব্যাপক হট্টগোল দেখা যায়। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামসহ জোটের একাধিক এমপিও এ সময় কথা বলার জন্য দাঁড়িয়ে যান। সরকারদলীয় চিফ হুইপও ফ্লোরের দাবি জানান।
ডেপুটি স্পিকার চিফ হুইপকে ফ্লোর দিলে অধিবেশন কক্ষে হযবরল অবস্থা তৈরি হয়। হট্টগোলের মধ্যে বিরোধী জোটের এমপিরা সরকারি দলের মন্ত্রী ও এমপিদের উদ্দেশে নানা তির্যক মন্তব্য করতে থাকেন। পাশাপাশি ডেপুটি স্পিকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বিরোধী জোটের একাধিক এমপি মাইক ছাড়াই বলতে থাকেন-এই সংসদ গায়ের জোরে চালানো হচ্ছে। এভাবে চলতে পারে না। সরকারি দলের পক্ষ থেকে কর্তত্ব দেখানো হচ্ছে। এসময় স্বরাষ্ট্র্র ও আইনমন্ত্রীকে ব্যর্থ বলে চিৎকার করতে থাকেন তারা। জোটের এমপিরা আরো বলেন-গণভোট ও জুলাই সনদ নিয়ে কোন ধরনের টালবাহানা চলবে না। সরকারি দলকে কেবল মাইক দেয়া হচ্ছে। বিরোধী দলকে মাইক দেয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন। তারা বিরোধীদলীয় চিপ হুইপকে কথা বলার সুযোগ দেয়ার দাবি জানান। এসময় সরকারি দলের কয়েক এমপিও কথা বলার সুযোগ চান। পাশাপাশি বিরোধী জোটের বক্তব্যর প্রতিবাদ জানাতে থাকেন।
এসময় ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বারবার সংসদীয় বিধি অনুযায়ী সবাইকে কথা বলার অনুরোধ জানালেও তা ব্যর্থ হয়। বিরোধী জোটের একাধিক এমপি কথা বলতে বারবার উঠে দাঁড়ান। বিরোধীদলীয় নেতা কথা বলার জন্য দাঁড়ালে তাকে ফ্লোর দেয়া হয় কয়েকবার। নিয়ম অনুযায়ী- বিরোধীদলীয় নেতা কথা বলার জন্য দাঁড়ালে জোটের অন্য কেউ দাঁড়ান না। কিন্তু গতকাল সংসদ অধিবেশনে এ চিত্রের ব্যতিক্রম দেখা যায়। বিরোধীদলীয় নেতা তার জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ (আদেশ নং ০১, ২০২৫) এর অনুচ্ছেদ ১০ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান শিরোনামের মুলতবি নোটিশে বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এর অনুচ্ছেদ ১০ অনুযায়ী- সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষিত হওয়ার ৩০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে যে পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করা হবে অনুরূপ পদ্ধতিতে পরিষদের প্রথম অধিবেশন আহ্বানের বিধান থাকলেও এখন পর্যন্ত তা করা হয়নি। জাতির প্রত্যাশাকে পাশ কাটিয়ে এ ধরনের অচলাবস্থা সৃষ্টি করা কখনো কাম্য নয়। এমতাবস্থায় জন-গুরুত্বসম্পন্ন বিষয় হিসেবে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদ অধিবেশন সংক্রান্ত আলোচনার জন্য স্পিকারের প্রতি সংসদে মুলতবি প্রস্তাব উত্থাপনের আহ্বান করছি। এরপর ফ্লোর নিয়ে নোটিশটাই তো বৈধ হয় নাই বলে দাবি করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। ৬২ বিধিতে এই নোটিশ গ্রহণ করা হলে তা সংশোধিত আকারে গ্রহণ করতে হবে বলে তিনি জানান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংস্কারের মতো স্পর্শকাতর ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতেও অপেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছে বিরোধী দল। জাতীয় সংসদে সংবিধান সংস্কারের দাবিতে আনা মুলতবি প্রস্তাবটি দিতে গিয়ে ন্যূনতম ‘কার্যপ্রণালি বিধি’ অনুসরণ করা হয়নি। তিনি বলেন, বিধি ৬২-এর অধীনে যে প্রস্তাব আনা হয়েছে, তার বিষয়বস্তু হওয়া উচিত ছিল বিধি ৬৮-এর অধীনে। মন্ত্রীর ভাষায়, নোটিশটাই তো বৈধ হয়নি। একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব উত্থাপন করতে গিয়ে কোন বিধিতে কতক্ষণ আলোচনা করা যায়, সেই সাধারণ জ্ঞানটুকুও বিরোধী দল দেখাতে না পারায় সংসদের ভেতরেই হাস্যাস্পদ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এমনকি বিধি ৬৩ অনুযায়ী, যা আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সমাধান করতে হয় তা যে মুলতবি প্রস্তাবের বিষয় হতে পারে না এই সাধারণ সংসদীয় প্রথাটুকুও মাথায় রাখেনি বিরোধী দলের নীতিনির্ধারকরা। ফলে তাদের এই অপরিপক্ব পদক্ষেপের কারণে জুলাই জাতীয় সনদের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুটিও এখন সংসদীয় জটিলতার জালে আটকা পড়ল। সরাসরি অধিবেশনে আলোচনার পরিবর্তে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সরকারি-বিরোধী দলের সমন্বয়ে একটি ‘সংবিধান সংস্কার কমিটি’ গঠনের প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, এই কমিটি দেশের বিশিষ্টজন ও সম্পাদকদের সাথে কথা বলে রিপোর্ট দেবে। তবে সংসদের বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের আকাক্সক্ষা কতটুকু এই ‘সংসদীয় কমিটির’ মাধ্যমে প্রতিফলিত হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
মন্ত্রী বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ একটি রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল এবং এর মাধ্যমে সংবিধানের কোনো বিধান সরাসরি পরিবর্তিত হয়নি। ফলে সংবিধান সংশোধন করতে হলে সরকারের ৫১ শতাংশ ম্যান্ডেট ও নির্বাচনী ইশতেহারকে প্রাধান্য দেয়ার ইঙ্গিতও দেন তিনি। এর আগে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, আমরাও চাই জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন হোক। আমরা জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের পথ ধরে হেঁটে চলেছি। মুলতবি প্রস্তাব আকারে আনা হয়েছে বিরোধীদলীয় নেতার পক্ষ থেকে। আমি অত্যন্ত যৌক্তিক এবং সময়োপযোগী একটি প্রস্তাবনা মনে করছি। এ বিষয়টি আলোচনার দাবি রাখে। উনাদের পক্ষ থেকেও আলোচনা হবে আমাদের পক্ষ থেকেও আলোচনা হবে। আমরা আলোচনা করতে চায়। তবে আলোচনার আগে একটু সময় প্রয়োজন। এই সাবজেক্টের ওপর আলোচনা করতে গেলে প্রত্যেক সংসদ সদস্য টেবিলের সামনে বাংলাদেশের সংবিধান জুলাই সনদ এই বাস্তবায়ন আদেশ এবং গণভোট অধ্যাদেশ এই কয়েকটি কপি অবশ্যই থাকতে হবে। কারণ জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে গোটা জাতি এক ধরনের বিভ্রান্তির মধ্যে আছে যে কারা সত্য। আমরা জুলাই জাতীয় সনদের প্রত্যেকটি ধারা উপধারা কিভাবে ধরে এগিয়ে চলেছি সেটা আমরা দেখাবো।
পরে ফ্লোর নিয়ে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, আমরা সংবিধান সংশোধনের জন্য এখানে (সংসদ) আসি নাই। সংবিধান সংস্কারের জন্য আমরা এসেছি। তিনি বলেন, আমি অনেকক্ষণ ধরে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছিলাম। আমরা আশা করি যে, আপনি যখন ফ্লোর দেবেন সেখানে কোনো বৈষম্য করবেন না। আজকে বিরোধীদলীয় নেতা উনি মুলতবি প্রস্তাব পেশ করেছেন। সে অনুযায়ী আপনার রুলিংও হয়েছে। সে বিষয়ে আইনমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তারা কিন্তু তাদের বক্তব্যে ব্যাখ্যা রেখেছেন। সংক্ষিপ্ত সময় হলেও তো সে ভিত্তিতে কিন্তু আমাদেরও কথা বলার থাকে। সেই সুযোগগুলা কিন্তু আমাদেরকেও দেয়া উচিত। তিনি আরো বলেন, এখানে আমাদের কারোরই ভুলে যাওয়ার কথা না। দুইটা নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা আজকের এই জায়গায় এসেছি। একটি গণভোট এবং একটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই গণভোটের ভিত্তি হচ্ছে যেই আদেশ, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ। নাহিদ ইসলাম বলেন, আমাদের যে গণভোট হয়েছে, গণরায় হয়েছে, গণভোটের আদেশ ছিল, সে আদেশকে অমান্য করা হচ্ছে। সে আদেশকে অসাংধনিক বলারও বলা হয়েছে। যার ভিত্তিতে আমরা এখানে এসেছি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেছেন। আমরা সংবিধান সংশোধনের জন্য এখানে আসি নাই। সংবিধান সংস্কারের জন্য এসেছি।



