- সহিংস গেমে শিশু-কিশোরদের মধ্যে বাড়ছে আক্রমণাত্মক আচরণ
- আসক্তি ঠেকাতে প্রয়োজন বিকল্প আনন্দের জায়গা
সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র রাকিব (১৪) ঝিনাইদহের একটি প্রত্যন্ত গ্রামের স্কুলে পড়ে সে। একসময় স্কুল থেকে ফিরেই বন্ধুদের সাথে মাঠে ছুটে যেত। কখনো ফুটবল, কখনো ক্রিকেট, কখনো গোল্লাছুট, বিকেলজুড়ে চলত দৌড়ঝাঁপ আর খেলাধুলা। সন্ধ্যা নামলে মায়ের ডাক শুনে ঘরে ফিরত।
কিন্তু এখন রাকিবের জীবন বদলে গেছে। হাতে স্মার্টফোন আসার পর থেকেই ধীরে ধীরে পাল্টে যেতে শুরু করে তার দৈনন্দিন জীবন। স্কুল থেকে ফিরে খাওয়া-দাওয়া শেষ করেই মোবাইল হাতে বসে পড়ে। অনলাইন গেম খেলতে খেলতে কখন গভীর রাত হয়ে যায়, সেটিও খেয়াল থাকে না।
রাত জেগে গেম খেলায় সকালে ঘুম থেকে উঠতে পারে না। ক্লাসে মন বসে না। পরীক্ষার ফলও আগের মতো নেই। বাবা-মা ফোন সরিয়ে নিতে চাইলে রেগে যায়। কখনো চিৎকার করে, কখনো দরজা বন্ধ করে বসে থাকে। মাঝে মধ্যে খাওয়া-দাওয়াও ছেড়ে দেয়।
রাকিবের মা বলেন, ‘আগে ছেলে সারাক্ষণ বাইরে খেলত। এখন ঘর থেকে বেরই হতে চায় না। খাওয়ার সময়ও ফোন হাতে থাকে। ফোন নিতে গেলেই রেগে যায়।’
রাকিবের গল্প এখন দেশের হাজারো পরিবারের বাস্তবতা। শহরের পাশাপাশি গ্রামেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে অনলাইন গেমের আসক্তি। সহজ ইন্টারনেট সুবিধা, কম দামের স্মার্টফোন এবং অবাধ ডিজিটাল ব্যবহারের কারণে শিশু-কিশোরদের বড় একটি অংশ ধীরে ধীরে ভার্চুয়াল জগতে ডুবে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু বিনোদনের বিষয় নয়; এটি এখন শিশু-কিশোরদের মানসিক, সামাজিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অধিকাংশ ভিডিও গেমের কনটেন্ট যুদ্ধ, রক্তপাত ও সহিংসতাকেন্দ্রিক হওয়ায় কোমলমতি শিশুদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। শুধু শহরেই নয়, মফস্বল ও গ্রামের শিশু-কিশোররাও দলবেঁধে ভিডিও গেম খেলায় ঝুঁকে পড়ছে। খেলার মাঠ থাকা সত্ত্বেও বাস্তব খেলাধুলা ছেড়ে ভার্চুয়াল গেমের দিকে ঝুঁকে পড়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করছেন অভিভাবকরা।
অনেক অভিভাবক শুরুতে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি। সন্তান ঘরে থাকছে, এটিই যেন স্বস্তির কারণ ছিল। কিন্তু সময়ের সাথে দেখা যাচ্ছে, শিশুরা ধীরে ধীরে পরিবার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। বাস্তব জীবনের আনন্দ ভুলে ভার্চুয়াল জগতে আটকে পড়ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) অনলাইন গেমে আসক্তিকে একধরনের মানসিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় গেমে ডুবে থাকলে শিশু-কিশোরদের মধ্যে বিষণœতা, উদ্বেগ, একাকিত্ব ও আচরণগত সমস্যা বাড়তে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সিলিং সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘অনিচ্ছা সত্ত্বেও প্রয়োজনের অতিরিক্ত নির্ভরতাই আসক্তি। এই নির্ভরতা ব্যক্তি, বস্তু বা কোনো কাজের প্রতিও হতে পারে। অনলাইন গেম এমন একধরনের কাজ, যার মধ্যে আসক্তির উপাদান খুবই তীব্র; অর্থাৎ একবার কেউ খেলা শুরু করলে সেই গেমের প্রতি নির্ভরতা বাড়তেই থাকে।’
গেমে আসক্তির ক্ষতির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘অন্যান্য আসক্তির মতোই অনলাইন গেমে যতক্ষণ থাকে ততক্ষণ ভালো লাগে, না থাকলে শারীরিক ও মানসিক অস্থিরতা দেখা দেয়। আবার দীর্ঘক্ষণ অনলাইনে থাকার ফলে ঘুম কমে যায়, ক্লান্তি বাড়ে, অনুশোচনাবোধ তৈরি হয়। অনেকের সামাজিক যোগাযোগ দক্ষতাও কমে যায়।’
তিনি মনে করেন, ক্ষতিকর আসক্তিকে ইতিবাচক অভ্যাস দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে হবে। খেলাধুলা, সৃষ্টিশীল কাজ ও অফলাইন কার্যক্রম বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবার ও পেশাদার মনোবিজ্ঞানীদের সহযোগিতা জরুরি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সিলিং সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ড. মেহজাবিন হকের মত, ‘অনলাইন গেম খুবই আকর্ষণীয়। এ ধরনের আসক্তি শিশুদের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। কম বয়সীদের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য বোঝার সক্ষমতাও দুর্বল হয়ে যেতে পারে। কিছু সহিংস গেম শিশুদের আচরণেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তারা সহজেই আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে এবং ছোটখাটো বিষয়েও মারমুখী আচরণ করছে। এমনকি কিশোর গ্যাং সংস্কৃতির পেছনেও গেমিং আসক্তির প্রভাব রয়েছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, শুধু মানসিক নয়, শারীরিক সমস্যাও বাড়ছে। দীঘ সময় বসে থাকায় শিশুদের মধ্যে স্থূলতা বাড়ছে। চোখে সমস্যা হচ্ছে, ঘাড় ও পিঠে ব্যথা দেখা দিচ্ছে। শারীরিক সক্ষমতাও কমে যাচ্ছে।
বিএমইউর চক্ষুবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আবদুল খালেক জানান, ‘একভাবে মোবাইল বা কম্পিউটারের স্ক্রিনে তাকিয়ে গেম খেলতে খেলতে শিশুদের চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। চোখের ফ্লুইড কমে যাচ্ছে, কর্ণিয়ার সমস্যা দেখা দিচ্ছে, দৃষ্টিশক্তিও কমে যাচ্ছে।’
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আবদুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, ‘শিশুদের অনলাইন গেমের আসক্তি তাদের পড়াশোনা বিমুখ করে তুলছে। মেধা বিকাশেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।’
অভিভাবকরাও পড়েছেন দুশ্চিন্তায়। অনেকেই বলছেন, সন্তানদের মোবাইল থেকে দূরে রাখা কঠিন হয়ে গেছে। পড়াশোনার জন্য ফোন দিলেও পরে তারা গেমে আসক্ত হয়ে পড়ছে।
একজন মা বলেন, ‘ফোন না দিলে ছেলে অস্থির হয়ে যায়। রাগ করে। কখনো খেতেও চায় না। স্কুলেও অনিয়মিত হয়ে পড়ছে।’
এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছেন, শিশুদের হাতে দীর্ঘ সময় ফোন না দেয়া, রাতে নির্দিষ্ট সময়ের পর মোবাইল বন্ধ রাখা, পরিবারের সাথে সময় কাটানো এবং নিয়মিত খেলাধুলায় উৎসাহ দেয়া।
তাদের মতে, শুধু বকাঝকা করলে পরিস্থিত আরো খারাপ হতে পারে। শিশুদের সাথে বন্ধুর মতো আচরণ করতে হবে এবং তাদের মানসিক অবস্থা বোঝার চেষ্টা করতে হবে।



