নিকলী (কিশোরগঞ্জ) থেকে সংবাদদাতা
কিশোরগঞ্জ জেলার বৃহত্তম গরুর হাট নিকলীর জারইতলা ইউনিয়নের আঠারবাড়িয়া গ্রামের গুপি রায়ের হাট। সপ্তাহের প্রতি বুধবার এই হাটটি বসে। কিশোরগঞ্জ জেলাসহ আশপাশের অন্যান্য জেলার গরু ব্যবসায়ী, গরু বিক্রেতারা গরু-মহিষ, ছাগল নিয়ে আসেন এই হাটে। প্রতি সপ্তাহে হাজার হাজার গরু-মহিষ, ছাগল কেনাবেচা হয়। এখানে তুলনামূলক একটু কম দামে পশু ক্রয় করতে পারেন বলে জনশ্রুতি আছে।
এটি ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথমে ছোট পরিসরে শুরু হলেও এখন এই হাটটি বৃহৎ পরিসরে জমজমাট হয়েছে। হাওর অঞ্চলের কৃষক খামারি ও গরু ব্যবসায়ীদের কাছে এটি গুরুত্বপূর্ণ পশুর হাট হিসেবে ইতোমধ্যে পরিচিত লাভ করেছে।
কিন্তু এই বছর জেলার বৃহত্তম গরুর হাট ইজারা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বাংলা ১৪৩৩ সালের জন্য হাটটির ইজারা মূল্য নির্ধারণ নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। বাজার এলাকার স্থানীয়দের অভিযোগ, গত বছর ১৪৩২ সনের তুলনায় এ বছর ১৪৩৩ সনে অস্বাভাবিক কম মূল্যে হাটটি ইজারা দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। যার ফলে গত বছরের তুলনায় এ বছর সরকার দুই কোটি ৫০ লাখ ৫০ হাজার ৮০০ টাকা রাজস্ব হারিয়েছে।
উপজেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বাংলা ১৪৩২ সনে হাটটি সরকারের কাছ থেকে ইজারা নেন সাজনপুর গ্রামের মোহাম্মদ জমশেদ আলী। তখন ইজারা মূল্য ছিল তিন কোটি ৭৫ লাখ ৫০ হাজার ৮০০ টাকা। অপর দিকে চলতি বাংলা সনে একই হাট ইজারা দেয়া হয়েছে মাত্র এক কোটি ২৫ লাখ টাকায়। ইজারা নিয়েছেন নিকলী উপজেলার দামপাড়া গ্রামের সাবেক নিকলী উপজেলা চেয়ারম্যান, ব্যবসায়ী, বিএনপিকর্মী মো: মোকাররম হোসেন সর্দার। দেখা গেছে, গত বছরের তুলনায় এ বছর বাংলাদেশ সরকার এই একটি মাত্র হাট থেকেই রাজস্ব হারিয়েছি প্রায় আড়াই কোটি টাকা।
হাট-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, বাজারটির প্রকৃত সম্ভাব্য আয় গোপন করে প্রভাবশালী মহলের সহায়তায় কম মূল্যে ইজারা দেয়া হয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক সমর্থন এবং বিভিন্ন মহলের অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের কারণেই এমন কম দরে হাটটি ইজারা দেয়া হয়েছে।
জানা যায়, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই বাজার সম্পূর্ণ আওয়ামী লীগ সিন্ডিকেটের কব্জায় ছিল। ফলে আওয়ামী সিন্ডিকেট কবলে বাংলা ১৪৩১ সন পর্যন্ত সর্বোচ্চ এ গরুর হাটের ইজারা মূল্য ছিল মাত্র ৩৫ লাখ টাকা। স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, প্রতি সপ্তাহে গড়ে যদি ১০ লাখ টাকাও ইজারা মূল্য আসে তাহলে এক বছরে; অর্থাৎ ৫২ সপ্তাহে পাঁচ কোটি ২০ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হওয়ার কথা। তাহলে প্রশাসন কেন সিন্ডিকেট ভাঙতে পারছে না।
স্থানীয় প্রশাসন ইচ্ছে করলে সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে পারত এবং এ ক্ষেত্রে সরকারের কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আয় হতো এই হাট থেকে। স্থানীয় একাধিক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এই হাটে প্রতি সপ্তাহে যে পরিমাণ গরু-মহিষ, ছাগল ওঠে এবং কেনাবেচা হয় তাতে এক বছরে মাত্র দেড় কোটি টাকায় ইজারা হওয়া অবিশ্বাস্য ব্যাপার। কোনো কোনো গরু ব্যবসায়ী বলছেন সরকার বদল হলেও এ বাজারের সিন্ডিকেট বদল হয় না।
এ ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন সচেতন নাগরিক সমাজ। তাদের দাবি, ইজারা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা থাকলে ইজারা ডাকে এমন বিশাল পার্থক্য হওয়ার প্রশ্নই উঠে না। স্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তারা মাঠ মনিটরিং করলেই বুঝতে পারবেন প্রতি সপ্তাহে কী পরিমাণ রাজস্ব আসে এ বাজার থেকে। এবার দরপত্র আহ্বান করার পর প্রতিযোগিতামূলক অংশগ্রহণ এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ছিল, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
জেলার সচেতন নাগরিক কমিটির সদস্য মো: ফিরোজ উদ্দীন ভূঁঞা জানান, সরকারের এত বড় রাজস্ব ক্ষতি কেন হলো, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। তা ছাড়া দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত, যাতে ভবিষ্যতে উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক ইজারা ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়। জেলার বৃহত্তম একটি পশুর হাট স্থানীয় অর্থনীতির একটি চালিকাশক্তি। এ ক্ষেত্রে সরকারের রাজস্ব কমে গেলে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বাধাগ্রস্ত হয়। তাই হাটবাজার ইজারায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
এ বিষয়ে ১৪৩২ সালের ইজারাদার মো: জমশেদ আলী বলেন, প্রায় চার কোটি টাকায় গরুর হাটটি ইজারা নিয়েছিলাম। পর ৫২ সপ্তাহ হাট পরিচালনা করে সরকারের সমুদয় টাকা পরিশোধ করেও আমার অনেক লাভ হয়েছে। চলতি বছর কেন এই হাটের টেন্ডারে অংশগ্রহণ করেননি এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, স্থানীয় প্রশাসনের নানা জটিলতা সৃষ্টিসহ অনৈতিক সুবিধা নিতে চায়। তাই উৎসাহ হারিয়ে ফেলছি।
বর্তমান ইজারাদার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোকাররম হোসেন সর্দার বলেন, সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে এই গরু হােেটর ইজারা পেয়েছি। এ ব্যাপারে আমার আর কোনো বক্তব্য নাই।
নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোছা: রেহেনা মজুমদার মুক্তি বলেন, নির্দিষ্ট সময়ে দরপত্র আহ্বান করার পর এক কোটি ২৫ লাখ টাকায় সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে মোকাররম হোসেন সর্দারের নাম আসায় আমরা তাকে ১৪৩৩ সালের জন্য গরুর বাজারটি ইজারা দিয়ে দিই। গত বছরের দর অনেক বেশি ছিল এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এর আগের বছর তো আরো অনেক কম দামে ইজারা হয়েছিল।



