ডা: মো: আব্দুল হাফিজ শাফী
নাকের হাড় বাঁকা খুবই সাধারণ একটি স্বাস্থ্য সমস্যা। প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষেরই নাকের হাড় কিছুটা বাঁকা থাকে। যদি এর কোনো উপসর্গ না থাকে তাহলে এটি তেমন কোনো সমস্যাই নয়, যা নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব। অর্থাৎ হাড় বাঁকা থাকলেই যে অপারেশনের দরকার, তা নয়। তবে আপনার নাকের মাঝের হাড় যদি অতিরিক্ত বাঁকা হয় এবং এর ফলে নাক বন্ধ, মাথাব্যথা, শ্বাসকষ্ট, নাকডাকা, ঘন ঘন সাইনোসাইটিসসহ নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন যদি নিয়মিতই হতে হয়, তাহলে একজন নাক-কান-গলা রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী নাকের হাড় বাঁকার অপারেশনের প্রয়োজন হতে পারে। যার সমাধানে সাধারণত সেপ্টোপ্লাস্টি নামক অস্ত্রোপচার করা হয়। অপারেশনের মাধ্যমে নাকের ভেতরের বাঁকা হাড় ও টার্বিনেট ঠিক করে নিঃশ্বাসের রাস্তা খুলে দেয়া হয়। অস্ত্রোপচারের পর পর অনেক রোগীর মনে একটি প্রশ্ন জাগে, নাক তো বন্ধ ছিল বলেই অপারেশন করালাম, তাহলে এখনো কেন বন্ধ লাগছে?
অস্ত্রোপচারের পর নাক বন্ধ হওয়া একটি স্বাভাবিক ও সাময়িক সমস্যা। এর কয়েকটি প্রধান কারণ হলো :
প্রদাহজনিত ফোলা ভাব : নাকের ভেতরে ও বাইরে অস্ত্রোপচারের কারণে ফোলা ভাব দেখা দেয়। এই ফোলা ভাবের জন্য নাকের বাতাস চলাচলের পথ কিছুটা সঙ্কুচিত হয়ে যায়।
রক্ত জমাট বাঁধা : অস্ত্রোপচারের স্থান থেকে অল্প রক্তক্ষরণ হতে পারে, যা নাকের ভেতরে জমাট বেঁধে পথ বন্ধ করে দেয়।
অতিরিক্ত শ্লেষ্মা বা সর্দি : অপারেশনের পর নাকের ভেতরে অতিরিক্ত শ্লেষ্মা বা সর্দি তৈরি হতে পারে, যা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ঘন থাকে এবং নাক বন্ধ হওয়ার কারণ হয়।
শুষ্কতা ও ক্রাস্ট : কিছু ক্ষেত্রে, অপারেশনের পর নাকের ভেতরের অংশ শুষ্ক হয়ে যায়। এতে চামড়া ও রক্তের জমাট শুকিয়ে শক্ত খোসার মতো সৃষ্টি হয়, যা নাকের পথ বন্ধ করে দেয়।
ইনফেকশন : খুব কম ক্ষেত্রে অপারেশনের স্থানে সংক্রমণ হলে নাক বন্ধ হতে পারে। তখন এর সাথে জ্বরও থাকতে পারে। এমনটি হলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত।
অপারেশনের পর কী করবেন
দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য এবং নাক বন্ধের সমস্যা কমানোর জন্য কিছু নির্দেশনা মেনে চলা জরুরি।
ওষুধ সেবন : চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ সেবন করুন।
নাক পরিষ্কার রাখা : নাক পরিষ্কার রাখতে নরমাল স্যালাইন ড্রপ ব্যবহার করুন। এটি রক্ত জমাট বাঁধা বা শক্ত হয়ে যাওয়া শ্লেষ্মা নরম করে বের করে দিতে সাহায্য করে। চাইলে লিকুইড প্যারাফিন দেয়ার পর পানি দিয়েও নাক পরিষ্কার করে নিতে পারেন।
নাকের যতœ : নাকের ভেতরে থাকা প্লাস্টিকের স্পি্লন্ট অথবা ব্যান্ডেজ নিজে থেকে টানবেন না। এটি চিকিৎসক অপসারণ করবেন। পাশাপাশি নাকে যেন কোনোভাবে আঘাত না লাগে, সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখুন।
বিশ্রাম ও সতর্কতা : পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন এবং অন্তত দুই সপ্তাহের জন্য নিচু হয়ে কোনো কাজ করা অথবা মোটরসাইকেল চালানো থেকে বিরত থাকুন।
শোয়ার নিয়ম : ঘুমের সময় মাথা কিছুটা উঁচু করে শোবেন। এতে ফোলা ভাব কমতে সাহায্য হবে। গোসলের সময়ও মাথা উঁচু করে রাখবেন।
পরবর্তী ফলোআপ
অপারেশনের প্রায় এক সপ্তাহ পর আপনার প্রথম ফলোআপ ভিজিট হবে। এ সময়ে আপনার সার্জন নাকের ভেতরের স্পিøন্টগুলো অপসারণ করবেন এবং নাক পরিষ্কার করে দেবেন। কারো কারো ক্ষেত্রে অস্বস্তি কমানোর জন্য ¯েপ্র ব্যবহার করা হতে পারে। নাকের অপারেশন-পরবর্তী রোগীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে শেখানো নিয়মে নাক পরিষ্কার করা (ঘধংধষ ফড়ঁপযরহম), যা ফলোআপের সময় শিখিয়ে দেয়া হয়।
অপারেশনের পর নাক বন্ধের সমস্যা সাধারণত সাময়িক এবং কয়েক দিন বা সপ্তাহের মধ্যে নিজে থেকেই সেরে যায়। তবে সমস্যা গুরুতর মনে হলে অবশ্যই আপনার সার্জনের সাথে দ্রুত যোগাযোগ করুন। ধৈর্য ধরে চিকিৎসকের সব নির্দেশনা মেনে চললে আপনি দ্রুততম সময়ে সুস্থ হয়ে উঠবেন।
লেখক : আবাসিক সার্জন (ইএনটি), এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল সিলেট



