বিশিষ্ট আর্থিক খাত বিশ্লেষক ও ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির সাবেক অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ শামসুজ্জামান বলেছেন, ইসলামী ব্যাংককে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়, আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবেই দেখা উচিত। কারণ পৃথিবীর কোথাও কোনো ব্যাংককে তার কর্মকর্তা-কর্মচারী বা গ্রাহকদের রাজনৈতিক বিশ্বাস দিয়ে মূল্যায়ন করা হয় না। ব্যাংকের মূল্যায়ন হয় তার মূলধন, তারল্য, সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, মুনাফা, আমানতকারীর নিরাপত্তা এবং নিয়ন্ত্রক মানদণ্ড অনুসরণের ভিত্তিতে। বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে দীর্ঘ দিন ধরে একটি রাজনৈতিক ট্যাগিং সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে- যা বাস্তব মূল্যায়নকে আড়াল করে দিয়েছে। জনাব শামসুজ্জামান দৈনিক নয়া দিগন্তকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন। সাক্ষাৎকারে তিনি ব্যাংকটিকে ঘিরে নানা বিতর্ক ও ইস্যু সম্পর্কে কথা বলেছেন। নিচে তার সাক্ষৎকারের বিস্তারিত-
প্রশ্ন : সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যানকে ঘিরে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, সেটিকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করেন?
শামসুজ্জামান : আমি এটিকে অত্যন্ত দুঃখজনক এবং অনভিপ্রেত ঘটনা বলে মনে করি। একটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগ বা বোর্ড সভা কোনো রাজনৈতিক সঙ্ঘাতের বিষয় হওয়া উচিত নয়। ব্যাংক একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান, যার প্রধান দায়িত্ব আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অর্থনীতিতে বিনিয়োগের প্রবাহ বজায় রাখা। সেখানে রাজনৈতিক মেরুকরণ বা ক্ষমতার প্রদর্শন প্রতিষ্ঠানের জন্য ক্ষতিকর।
প্রশ্ন : আপনি বারবার বলছেন ইসলামী ব্যাংককে রাজনৈতিক পরিচয়ের বদলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে হবে। কেন?
শামসুজ্জামান : কারণ পৃথিবীর কোথাও কোনো ব্যাংককে তার কর্মকর্তা-কর্মচারী বা গ্রাহকদের রাজনৈতিক বিশ্বাস দিয়ে মূল্যায়ন করা হয় না। ব্যাংকের মূল্যায়ন হয় তার মূলধন, তারল্য, সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, মুনাফা, আমানতকারীর নিরাপত্তা এবং নিয়ন্ত্রক মানদণ্ড অনুসরণের ভিত্তিতে। বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে দীর্ঘ দিন ধরে একটি রাজনৈতিক ট্যাগিং সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, যা বাস্তব মূল্যায়নকে আড়াল করে দিয়েছে।
প্রশ্ন : আপনি কি মনে করেন ইসলামী ব্যাংকের বিরুদ্ধে একটি বিশেষ ধরনের ধারণা তৈরি করা হয়েছে?
শামসুজ্জামান : হ্যাঁ। বহু বছর ধরে ইসলামী ব্যাংককে কেবল একটি ব্যাংক হিসেবে নয়, একটি আদর্শিক বা রাজনৈতিক প্রকল্প হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। ফলে ব্যাংকটির সাফল্য, অবদান বা আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে আলোচনা কম হয়েছে; বরং এর সাথে কারা যুক্ত, কে ধর্মীয় মূল্যবোধ মানে, এসব প্রশ্ন বেশি সামনে এসেছে। এতে একটি বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে স্বাভাবিক প্রতিযোগিতার বদলে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়েছে।
প্রশ্ন : আপনি ‘মৌলবাদী অর্থনীতি’ ধারণার সমালোচনা করেছেন। কেন?
শামসুজ্জামান : কারণ কোনো ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মৌলবাদী প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত করা একটি বিশ্লেষণগত সমস্যা তৈরি করে। ইসলামী ব্যাংকিং একটি স্বীকৃত আর্থিক মডেল, যা বর্তমানে বিশ্বের বহু দেশে পরিচালিত হচ্ছে। যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার, তুরস্ক- সবখানেই ইসলামী ব্যাংকিং আছে। কোনো প্রতিষ্ঠান শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক নীতি অনুসরণ করলেই তাকে উগ্রবাদ বা রাজনৈতিক চরমপন্থার সাথে এক কাতারে ফেলা যায় না।
প্রশ্ন : ইসলামী ব্যাংকের ইতিহাস ও অবদান সম্পর্কে কিছু বলবেন?
শামসুজ্জামান : ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। অল্পসময়ের মধ্যেই এটি জনগণের আস্থা অর্জন করে। গত তিন দশক ধরে রেমিট্যান্স আহরণে ব্যাংকটির অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী। গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং আরডিএস (জঁৎধষ উবাবষড়ঢ়সবহঃ ঝপযবসব)-এর মাধ্যমে লাখো মানুষের আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে ভূমিকা রেখেছে। দেশের গার্মেন্ট শিল্পেও এর অবদান উল্লেখযোগ্য। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এটি একাধিকবার স্বীকৃতি পেয়েছে।
প্রশ্ন : তাহলে এমন একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্কট কোথা থেকে শুরু হলো?
শামসুজ্জামান : আমার মতে, সঙ্কট ইসলামী ব্যাংকিং ধারণা থেকে নয়; সঙ্কট এসেছে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, মালিকানা দখল, দুর্বল সুশাসন এবং নিয়ন্ত্রক ব্যর্থতা থেকে। একটি ব্যাংক যত শক্তিশালীই হোক, যদি তার পরিচালনা কাঠামো রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক স্বার্থের কাছে জিম্মি হয়ে যায়, তাহলে প্রতিষ্ঠান দুর্বল হবেই।
প্রশ্ন : ২০১৭ সালকে আপনি কেন একটি টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে দেখেন?
শামসুজ্জামান : কারণ ওই সময় ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। দীর্ঘ দিনের বিদেশী ও প্রাতিষ্ঠানিক শেয়ারহোল্ডারদের অবস্থান বদলে যায় এবং নতুন একটি ব্যবসায়িক গোষ্ঠী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। এরপর থেকেই ব্যাংকটির সুশাসন, ঋণনীতি এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।
প্রশ্ন : আপনি কি মনে করেন পরবর্তী সময়ে ইসলামী ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে?
শামসুজ্জামান : শুধু ইসলামী ব্যাংক নয়, দেশের আরো কয়েকটি ইসলামী ব্যাংক একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ, স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে অর্থায়ন, বোর্ড সুশাসনের দুর্বলতা এবং নিয়ন্ত্রক শিথিলতা এসব কারণে আর্থিক ভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে আমানতকারীদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
প্রশ্ন : তাহলে কি ইসলামী ব্যাংকিং মডেলের ব্যর্থতা প্রমাণিত হয়েছে?
শামসুজ্জামান : একেবারেই না। কোনো ব্যাংকের সুশাসন ব্যর্থ হলে সেটি ইসলামী বা প্রচলিত যেকোনো ব্যাংকের ক্ষেত্রেই ঘটতে পারে। সমস্যা মডেলে নয়, বাস্তব পরিচালনায়। ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মূল নীতিগুলো হলো ঝুঁকি বণ্টন, সম্পদভিত্তিক অর্থায়ন, নৈতিক বিনিয়োগ এবং সুদবিহীন আর্থিক কাঠামো। এগুলো ব্যর্থ হয়েছে এমন দাবি করার সুযোগ নেই।
প্রশ্ন : বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আপনার প্রধান সুপারিশ কী?
শামসুজ্জামান : প্রথমত, একটি স্বতন্ত্র ইসলামী ব্যাংকিং আইন প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, শরিয়াহ সুশাসনকে আইনি ভিত্তি দিতে হবে। তৃতীয়ত, মালিকানা কাঠামোকে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক দখলদারিত্ব থেকে রক্ষা করতে হবে। চতুর্থত, ইসলামী ব্যাংকের জন্য উপযোগী তারল্য ব্যবস্থাপনা উপকরণ যেমন সুকুক ও শরিয়াহসম্মত সরকারি সিকিউরিটিজ চালু করতে হবে।
প্রশ্ন : বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
শামসুজ্জামান : অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ছাড়া কোনো ব্যাংকিং খাত নিরাপদ থাকতে পারে না। ফিট অ্যান্ড প্রপার টেস্ট, বৃহৎ ঋণ ঝুঁকি, বোর্ড অনুমোদন, ঋণ শ্রেণিকরণ সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ ব্যাংককে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে কাজ করতে হবে।
প্রশ্ন : ইসলামী ব্যাংকিং নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য আপনার বার্তা কী?
শামসুজ্জামান : আমার বার্তা খুবই স্পষ্ট। ইসলামী ব্যাংককে রাজনৈতিক পরিচয়ের আলোকে নয়, আর্থিক কর্মক্ষমতার আলোকে মূল্যায়ন করতে হবে। ইসলামী পরিচয় কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তি হতে পারে না, আবার সেটি দায়মুক্তির ঢালও হতে পারে না। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে ইসলামী ও প্রচলিত উভয় ধরনের ব্যাংকই সমান আইন, সমান জবাবদিহি এবং সমান নিয়ন্ত্রক তদারকির আওতায় পরিচালিত হবে। সেটিই আমানতকারী, বিনিয়োগকারী এবং জাতীয় অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পথ।



