ঢাকার উত্তরার একটি নামকরা স্কুলের চতুর্থ শ্রেণীর শিক্ষার্থী আসফিন শরীফ। প্রতিদিন স্কুলে গেলেও দুপুরে ছুটি শেষে বাসায় এসে স্কুলের ড্রেস খোলার আগেই প্রথমে মোবাইল হাতে নিয়েই গেম খেলা শুরু করে আসছিল। এ সময় মা তানজিলা বিনতে আজিজ ছেলের কাছ থেকে মোবাইল ছিনিয়ে নিয়ে স্কুল ড্রেস খুলে খাওয়া-দাওয়ার কথা বলা হলে মন খারাপ করে বসে থাকে। না খেয়েই বিকেলে হোম টিচারের কাছে পড়তে বসে। তবে মোবাইল ছাড়া কোনো কিছুতেই পড়ায় মন বসছিল না আসফিনের। এমন পরিস্থিতিতে মোবাইল না দিয়ে আর উপায় নেই মা তানজিলার কাছে। শুধু আসফিনই নয়, এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে ঢাকা থেকে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিটি মায়ের ক্ষেত্রে।
তানজিলা বিনতে আজিজ বলেন, ডিজিটাল যুগে শিশুদের মোবাইল থেকে বিরত রাখা মুশকিল। শিশুদের সুরক্ষার জন্য সরকারের উচিত ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে আলাদা অ্যাপ ব্যবহার। যেখানে শিশুরা শুধু শিক্ষাই নয়, বৈশ্বিক ধারণা এবং সামাজিক সভ্যতাও থাকতে হবে শিশুদের অ্যাপে। আর চাইলেই যেন বিপজ্জনক অ্যাপ বা ওয়েব ব্লকিংয়ে না প্রবেশ করতে পারে। বিটিআরসি চাইলেই তা সম্ভব। এসব প্ল্যাটফর্মের অতিরিক্ত ব্যবহার ও অপব্যবহারের কারণে শিশু-কিশোরদের মাঝে আসক্তি বাড়ছে, তারা খেলাধুলা ও পড়াশোনায় অমনোযোগী হয়ে পড়ছে এবং শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে। এ ছাড়া ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অপব্যবহারের কারণে শিশু-কিশোরদের মাঝে অপরাধপ্রবণতা, অনলাইন গেমে আসক্তি এবং দলবদ্ধ অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
বিটিআরসির সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে ইন্টারনেট গ্রাহকসংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩ কোটি। যার বেশির ভাগই মোবাইল সংযোগ ব্যবহারকারী। ইন্টারনেটের এই বিশাল পরিধি একটি অনিবার্য প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে তা হলো শিশুরা অনলাইনে আছে কি না। তা এখন আর আলোচনার বিষয় নয়, বরং প্রশ্ন হলো- কোন বয়সে এবং কী ধরনের সুরক্ষার অধীনে তারা এই ডিজিটাল জগতে প্রবেশ করছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বর্তমানে বাংলাদেশে এটি নির্ধারণ করার মতো কোনো বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থা নেই। অনলাইনে শিশুদের নিরাপত্তা এখানে কেবল একটি তাত্ত্বিক ধারণায় সীমাবদ্ধ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মানসিক স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার ঝুঁকিগুলো এখন আর অনুমাননির্ভর নয়। বর্তমানের সামাজিক মাধ্যমগুলো শিশু ও কিশোরদের জন্য নিরাপদ নয়। বাংলাদেশের উচিত বৈশ্বিক এই সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব দিয়ে নিজস্ব আইনি কাঠামো সংস্কার করা। কারণ ডিজিটাল যুগে শিশুদের ছেড়ে দিয়ে কেবল দেয়াল তুলে (ব্লকিং) তাদের রক্ষা করা সম্ভব নয়। তাদের জন্য প্রয়োজন একটি নিরাপদ ডিজিটাল ইকোসিস্টেম, যেখানে প্রযুক্তির নকশাই হবে তাদের সুরক্ষার ছকে। বাংলাদেশ যদি এখনই এই কাঠামোগত পরিবর্তনে হাত না দেয়, তবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক অনিয়ন্ত্রিত ও ক্ষতিকর ডিজিটাল গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাবে।
তাদের মতে, চারটি স্তম্ভ একটি কার্যকর বাংলাদেশী কর্মপন্থার ভিত্তি হওয়া উচিত। প্রথমটি ওয়েবসাইট ব্লক করার অসার ধারণা ত্যাগ করা। দ্বিতীয়ত উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ডিজিটাল পরিষেবাগুলোর ওপর আইনি বাধ্যবাধকতা আরোপ। তৃতীয়টি হলো আসক্তিমূলক অ্যালগরিদমে শিশুদের তথ্য ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং প্ল্যাটফর্মগুলোর অভিযোগ নিষ্পত্তি ও সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে স্বাধীন তত্ত্বাবধান।
সংশ্লিষ্টদের মতে বাংলাদেশের ডিজিটাল শিশু সুরক্ষা নীতি বর্তমানে বিপজ্জনক। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক মহলে এমন একটি ধারণা যে, কেবল ক্ষতিকর ওয়েবসাইট ব্লক করার মাধ্যমেই অনলাইন জগৎ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। এটি রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক একটি পন্থা; কারণ এতে ডিজিটাল ক্ষতির প্রকৃত কাঠামোগত পরিবর্তনের পথে না গিয়েও রাষ্ট্র নিজেকে ‘দৃঢ়চেতা’ হিসেবে জাহির করার সুযোগ পায়। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো, প্রযুক্তিগতভাবে এটি অত্যন্ত দুর্বল।
বিটিআরসির তথ্যমতে, ২০১৯ সালে বিটিআরসি প্রায় এক হাজার ২৭৯টি পর্নোগ্রাফিক ওয়েবসাইট ব্লক করেছিল। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, একটি ব্লক করা ইউআরএল কাউকেই সুরক্ষা দিতে পারছে না। আধুনিক শিশুরা কেবল নির্দিষ্ট কিছু ওয়েবসাইটের তালিকায় সীমাবদ্ধ নেই। তারা ইন্টারনেট ব্যবহার করছে স্মার্টফোন, নিউজ ফিড, অনলাইন গেম, লাইভস্ট্রিম, মেসেজিং অ্যাপ এবং ক্রমাগত বাড়তে থাকা এআই ইন্টারফেসের মাধ্যমে। স্থির ওয়েবসাইটের জন্য তৈরি পুরনো ধাচের নীতিগুলো বর্তমানের ‘অ্যালগরিদমিক’ ডিজিটাল পরিবেশের সাথে একেবারেই বেমানান।
উন্নত বিশ্বে যেমন যুক্তরাজ্য তাদের ‘অনলাইন সুরক্ষা আইন’ অনুযায়ী প্রাপ্তবয়স্কদের সাইটে প্রবেশের জন্য শুধু একটি বক্সে টিক দেয়া আর যথেষ্ট নয়; সেখানে কঠোর বয়স যাচাই বাধ্যতামূলক।
অস্ট্রেলিয়াতে ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খোলা নিষিদ্ধ করতে প্ল্যাটফর্মগুলোকে বাধ্য করছে। ব্যর্থতায় প্রায় ৫০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
ইন্দোনেশিয়াতে ২০২৬ সালের মার্চ মাস থেকে উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ প্ল্যাটফর্মে ১৬ বছরের কম বয়সীদের প্রবেশাধিকারে কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে।
এ ছাড়াও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করে এমন একটি আধুনিক বয়স যাচাইকরণ পদ্ধতি তৈরি করছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশ এই দৌড়ে শুধু একটি আইনের অভাবেই পিছিয়ে নেই, বরং পিছিয়ে আছে এর ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ মানসিকতার কারণে। আমাদের রাষ্ট্র সাধারণত কোনো দুর্ঘটনা ঘটার পর নড়েচড়ে বসে, ক্ষতির পর মামলা করে কিংবা জনরোষ তৈরি হলে কঠোর ব্যবস্থা ঘোষণা করে। কিন্তু ক্ষতি ঘটার আগেই প্ল্যাটফর্ম বা অ্যাপ স্টোরগুলোকে বয়স-উপযোগী ডিজাইন তৈরিতে বাধ্য করার কোনো পূর্বপ্রস্তুতি আমাদের নেই।
আইনি সীমাবদ্ধতা ও সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৬ : সম্প্রতি ‘সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ ২০২৫’ অনুমোদিত হয়ে ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৬’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এই আইনে অনলাইন জুয়া এবং নারী ও শিশুদের যৌন হয়রানি প্রতিরোধের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি একটি সুসংহত ‘বয়স নিশ্চিতকরণ কাঠামোর’ বিকল্প হতে পারে না। এই আইন শিশু সুরক্ষাকে মূলত অপরাধ ও শাস্তির মাপকাঠিতে দেখে। কিন্তু প্রয়োজন ছিল প্ল্যাটফর্মের দায়বদ্ধতা, স্বাধীন নিরীক্ষা এবং ত্রুটিপূর্ণ অ্যালগরিদমিক নকশার জন্য কঠোর শাস্তির বিধান। শিশুদের জুয়া বা আত্ম-ক্ষতিকর কনটেন্ট থেকে বাঁচাতে কেবল ফৌজদারি আইন যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন প্রযুক্তিগত প্রতিরোধ ব্যবস্থা।
১৬ বছর পর্যন্ত ফেসবুক টিকটক ব্যবহার নয় : শিশু ও কিশোরদের ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত ফেসবুক, টিকটকসহ যেকোনো ধরনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ এবং এসব প্ল্যাটফর্মের অপব্যবহার রোধে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে সরকারকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
গত ৮ মে লিগ্যাল ভয়েস ফাউন্ডেশনের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সানাউল্লাহ নূরী এ নোটিশ পাঠান। ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিব, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি সচিব এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) নোটিশের অনুলিপি পাঠানো হয়েছে। নোটিশে বলা হয়েছে, ১৫ দিনের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও অপব্যবহার রোধে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ না নিলে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এ প্রসঙ্গে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মো. জসিম উদ্দীন খান বলেন, অনেক শিশু-কিশোর ভূলে বিপজ্জনক অ্যাপ বা সাইটে ঢুকে যায়। দিনভর শিশুরা ওই সাইটগুলো ব্যবহার করে মানসিক এবং শারীরিক সমস্যায়ও জর্জরিত। অনেক অভিযোগ আমাদের সাইবার পুলিশ সেন্টারে আসে।
এ প্রসঙ্গে বিটিআরসির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা আদালত থেকে একটি নোটিশ পেয়েছি। সে হিসাবে শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহারে অনেক পরিবর্তন আনার কাজ চলমান রয়েছে।
তবে শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো শক্ত পদক্ষেপ নেই বিটিআরসিতে। যার কারণে শিশুরা ভূল করেই বিপজ্জনক অ্যাপগুলোতে ব্যবহার বাড়ছে।



