ব্যাংক আবগারিতে স্বস্তির বার্তা

করমুক্ত সীমা ৪ লাখ টাকা, ইসলামী ব্যাংকিংয়ে দ্বৈত শুল্কের অবসান

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

ব্যাংক আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক নিয়ে দীর্ঘদিনের সমালোচনার মধ্যে সরকার এবার আংশিক স্বস্তি দিয়েছে আমানতকারীদের। করমুক্ত আমানতের সীমা তিন লাখ থেকে চার লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। একই সাথে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় একটি ঋণ হিসাবের বিপরীতে একাধিক ডিল অ্যাকাউন্ট থাকলেও একাধিকবার আবগারি শুল্ক কাটা যাবে না বলে স্পষ্ট করেছে সরকার। নতুন বিধান কার্যকর হবে আগামী ১ জুলাই থেকে।

কী পরিবর্তন হলো?

৭ জুন জারি করা এসআরও-১২৬ অনুযায়ী ব্যাংক হিসাবে বছরের সর্বোচ্চ স্থিতির ভিত্তিতে আবগারি শুল্ক আরোপের ন্যূনতম সীমা তিন লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে চার লাখ টাকা করা হয়েছে।

ফলে যেসব হিসাবের সর্বোচ্চ স্থিতি চার লাখ টাকার নিচে থাকবে, সেসব হিসাব থেকে আর আবগারি শুল্ক কাটা হবে না।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্তকে মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের জন্য একটি স্বস্তিমূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ এই সিদ্ধান্ত?

গত কয়েক বছরে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে তিন লাখ টাকার সঞ্চয় আর আগের মতো বড় অঙ্ক হিসেবে বিবেচিত হয় না।

ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করমুক্ত সীমা অপরিবর্তিত থাকায় অনেক নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আমানতকারীও আবগারি শুল্কের আওতায় চলে আসছিলেন। নতুন সীমা নির্ধারণ সেই চাপ কিছুটা কমাবে।

নতুন ব্যবস্থায় সরাসরি সুবিধা পাবেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের সঞ্চয়কারী, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবার; গ্রামীণ এলাকার ব্যাংক গ্রাহক।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যাদের সঞ্চয় তিন থেকে চার লাখ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ, তাদের জন্য এ পরিবর্তন সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ।

ইসলামী ব্যাংকিংয়ের দীর্ঘদিনের অভিযোগের নিষ্পত্তি বাজেট সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশটি এসেছে ইসলামী ব্যাংকিং খাতের জন্য।

ইসলামী ব্যাংকগুলোতে একটি বিনিয়োগ বা অর্থায়ন হিসাবের বিপরীতে একাধিক ডিল অ্যাকাউন্ট পরিচালনার প্রচলন রয়েছে। বাস্তবে এগুলো একই অর্থায়নের অংশ হলেও কখনো কখনো পৃথক হিসাব হিসেবে গণ্য করে শুল্ক নির্ধারণের জটিলতা তৈরি হতো।

নতুন বিধানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, একটি মূল ঋণ হিসাবের বিপরীতে যতগুলো ডিল অ্যাকাউন্টই থাকুক না কেন, আবগারি শুল্ক কেবল একবারই প্রযোজ্য হবে।

এতে ইসলামী ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের একটি অস্পষ্টতার অবসান হলো।

রাজস্ব কমবে, নাকি সঞ্চয় বাড়বে?

করমুক্ত সীমা বাড়ানোর ফলে সরকারের কিছু রাজস্ব আয় কমতে পারে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এর বিপরীতে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সঞ্চয়ের প্রবণতা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, পুঁজিবাজার, স্বর্ণ ও অন্যান্য বিকল্প বিনিয়োগের কারণে ব্যাংক আমানত সংগ্রহে চাপে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের জন্য করের বোঝা কমানো ব্যাংকিং খাতে নতুন আমানত আকর্ষণে সহায়ক হতে পারে।

ব্যাংক কর্মকর্তাদের মতে, সিদ্ধান্তটি শুধু কর-সুবিধা নয়; বরং গ্রাহকদের প্রতি একটি ইতিবাচক নীতিগত বার্তাও বহন করছে।

বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকিংয়ে একই অর্থায়নের বিপরীতে একাধিক শুল্ক আরোপের আশঙ্কা দূর হওয়ায় কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও একক নীতি প্রতিষ্ঠিত হবে।

তাদের ভাষ্য, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সম্প্রসারণের বর্তমান সময়ে ক্ষুদ্র আমানতের ওপর করের চাপ কমানো ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা বাড়াতে সহায়তা করবে।

সামগ্রিক মূল্যায়ন

২০২৬-২৭ অর্থবছরের রাজস্ব নীতিতে সরকার এক দিকে করভিত্তি সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে, অন্য দিকে ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের জন্য সীমিত পরিসরে স্বস্তিও দিচ্ছে। আবগারি শুল্কের করমুক্ত সীমা চার লাখ টাকায় উন্নীত করা এবং ইসলামী ব্যাংকিংয়ে দ্বৈত শুল্কের সুযোগ বন্ধ করা সেই ভারসাম্যমূলক নীতিরই প্রতিফলন।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল একটি কর-সংশোধন নয়; বরং ব্যাংকিং খাতে সঞ্চয় উৎসাহিত করা, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানো এবং ইসলামী ব্যাংকিংয়ের কাঠামোগত জটিলতা দূর করার একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।

এক নজরে পরিবর্তন

  • করমুক্ত আবগারি সীমা : তিন লাখ ্য চার লাখ টাকা
  • কার্যকর : ১ জুলাই ২০২৬
  • ক্ষুদ্র আমানতকারীদের করমুক্ত সুবিধা বৃদ্ধি
  • ইসলামী ব্যাংকিংয়ে এক ঋণের বিপরীতে একাধিক ডিল অ্যাকাউন্টে আর একাধিক শুল্ক নয়
  • লক্ষ্য : সঞ্চয় উৎসাহ ও কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি