দর্শনা সীমান্তে যুবককে অপহরণ

সীমান্তে বিএসএফের দফায় দফায় পুশইন চেষ্টা প্রতিহত

Printed Edition
রৌমারী সীমান্তে ৫ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেয় বিএসএফ : নয়া দিগন্ত
রৌমারী সীমান্তে ৫ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেয় বিএসএফ : নয়া দিগন্ত

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

দেশের সীমান্তজুড়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) ধারাবাহিক পুশইনের অপচেষ্টা ও আগ্রাসী মনোভাবের কারণে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে তীব্র উত্তেজনা ও উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে প্রায়শই রাতের আঁধারে বা ভোরে বাংলাভাষী মানুষদের পুশইনের চেষ্টা চালাচ্ছে বিএসএফ। বাংলাদেশের বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে এসব অনুপ্রবেশ ঠেকানোর চেষ্টা করলেও কুড়িগ্রাম ও চুয়াডাঙ্গার বিস্তীর্ণ সীমান্ত এলাকায় আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় চুয়াডাঙ্গার দর্শনা ও কুড়িগ্রামের রৌমারীতে একদিনে কয়েক দফায় নারী ও শিশুসহ অন্তত ১৯ জনকে বাংলাদেশে জোরপূর্বক পুশইনের চেষ্টা করেছে বিএসএফ। অন্যদিকে দর্শনা সীমান্তে এক বাংলাদেশী যুবককে নির্মমভাবে পিটিয়ে অপহরণ করে ওপারে নিয়ে গেছে ভারতীয় বাহিনী।

দামুড়হুদা (চুয়াডাঙ্গা) সংবাদদাতা জানান, চুয়াডাঙ্গার দর্শনা সীমান্ত দিয়ে ১১ জনকে বাংলাদেশে জোরপূর্বক পুশইনের একটি বড় চেষ্টা প্রতিহত করেছে বিজিবি। গতকাল রোববার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে দর্শনা-গেদে সীমান্তের ৭৬-৭৭ নম্বর মেইন পিলারের নিকটবর্তী এলাকা দিয়ে এদের প্রবেশ করানোর চেষ্টা করে গেদে বিএসএফ ক্যাম্পের সদস্যরা। এই দলে আটজন পুরুষ ও তিনজন নারী ছিলেন।

বিজিবি সূত্র জানায়, ভোরের আলো ফোটার আগে কাঁটাতারের বেড়া পার করার বিষয়টি নজরে আসতেই বিজিবির টহল দল দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। বিজিবির কড়া অবস্থানের মুখে বিএসএফ পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং বিজিবি সদস্যরা ওই ব্যক্তিদের সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ার কাছে রেখে আসেন। বিজিবি চুয়াডাঙ্গা-৬ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজমুল হাসান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, পুশইনসহ যেকোনো অপতৎপরতা রুখতে বিজিবির নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি ও অপারেশনাল কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। উল্লেখ্য, এই ব্যাটালিয়নের অধীনে চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরের ১১৩ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকায় সার্বক্ষণিক কড়া নজরদারি বজায় রাখা হয়েছে।

রৌমারী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তে সাম্প্রতিক সময়ে চতুর্থ বারের মতো পুশইনের ঘটনা ঘটেছে, যা স্থানীয় জনমনে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। রোববার ভোর আনুমানিক ৫টার দিকে রৌমারী উপজেলার গয়লাপাড়া সীমান্তের ১০৬০/১-এস পিলার সংলগ্ন এলাকা দিয়ে পাঁচজনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেয় ভারতীয় ঝালোরচর বিএসএফ ক্যাম্পের সদস্যরা। পুশইন হওয়া এই দলে তিনজন পুরুষ, একজন নারী এবং দু’জন শিশু রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

ঘটনার পরপরই গয়লাপাড়া বিজিবি ক্যাম্পের সদস্যরা স্থানীয় জনসাধারণের সহযোগিতায় সীমান্তজুড়ে কড়া নজরদারি ও টহল শুরু করেছেন। গয়লাপাড়া বিজিবি ক্যাম্প কমান্ডার শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘যেকোনো অনুপ্রবেশ বা পুশইন প্রতিরোধে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থেকে অতন্দ্র প্রহরীর দায়িত্ব পালন করছে।’ এ ছাড়া রৌমারীর ভুন্দুরচর সীমান্তের ১০৬৬ নম্বর পিলার এলাকা দিয়েও আরো তিনজনকে বিএসএফ বাংলাদেশে নামিয়ে দিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে বিজিবি প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চালাচ্ছে।

দর্শনা সীমান্তে যুবককে অপহরণ

দামুড়হুদা (চুয়াডাঙ্গা) সংবাদদাতা জানান, চুয়াডাঙ্গার দর্শনা সীমান্তে জুলফিকার (২২) নামে এক বাংলাদেশী যুবককে আটক করে বেধড়ক পিটিয়ে ভারতীয় সীমান্তে নিয়ে যাওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বিএসএফের বিরুদ্ধে। গত শনিবার সন্ধ্যার ঠিক আগ মুহূর্তে দর্শনা-গেদে আন্তর্জাতিক চেকপোস্ট সংলগ্ন জিরো পয়েন্ট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। আটক জুলফিকার দর্শনা জয়নগর গ্রামের কালো মৌলভীর ছেলে এবং স্থানীয় রামনগর বিস্কুট ফ্যাক্টরির কর্মচারী।

স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, জুলফিকার কয়েকজন সঙ্গীকে নিয়ে সীমান্তবর্তী এলাকায় খড়ি (জ্বালানি কাঠ) কুড়াতে গিয়েছিলেন। এ সময় গেদে বিএসএফ ক্যাম্পের সদস্যরা তাদের ধাওয়া করে। বাকিরা পালিয়ে আসতে পারলেও বিএসএফ সদস্যরা জুলফিকারকে ধরে ফেলে এবং নির্মমভাবে মারধর করতে করতে ভারতীয় অংশের ভেতরে নিয়ে যায়।

তবে ঘটনার বিষয়ে ৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজমুল হাসান ভিন্ন তথ্য দিয়ে জানান, জয়নগর গ্রামের কয়েকজন যুবক জিরো পয়েন্ট এলাকায় গিয়ে দর্শনা-গেদে রেলপথের নিরাপত্তা বেষ্টনীর কিছু অংশ খোলার চেষ্টা করছিল। তখন বিএসএফ অভিযান চালিয়ে জুলফিকারকে আটক করে এবং বাকিরা পালায়। বিজিবি অধিনায়ক আরো জানান, আটক যুবককে ভারতের স্থানীয় থানায় সোপর্দ করা হয়েছে। বর্তমানে জুলফিকারের শারীরিক অবস্থা কেমন এবং তার প্রকৃত অবস্থান কোথায় তা নিয়ে সীমান্তবাসী ও পরিবারের মধ্যে গভীর উদ্বেগ বিরাজ করছে। পরিবার দ্রুত তাকে সুস্থ অবস্থায় দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছে।

খাগড়াছড়িতে অপারেশনাল বেস স্থাপন

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি জানিয়েছেন, অবৈধ অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ, সীমান্ত প্রহরা, চোরাচালান প্রতিরোধ, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমন, অবৈধ অস্ত্র পাচার রোধসহ সীমান্ত এলাকায় সংঘটিত বিভিন্ন ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দুইটি অস্থায়ী অপারেশনাল বেস (টিওবি) স্থাপন করেছে খাগড়াছড়ি ব্যাটালিয়ন (২৩ বিজিবি).।

রোববার এক বিজ্ঞপ্তিতে ৩২ বিজিবি জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তে পুশইনের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়া এবং বিজিবির অপারেশনাল কার্যক্রমে অধিকতর গতিশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এ দু’টি বেস স্থাপন করা হয়েছে। বিজিবি সূত্রে জানা যায়, খাগড়াছড়ি ব্যাটালিয়নের (৩২ বিজিবি) দায়িত্বপূর্ণ এলাকার পানছড়ি উপজেলার মনোরমেরটিলা ও রিন্টুরজুমে ওই দুটি।

বিজিবি আরো জানায়, অপারেশনাল বেস স্থাপনের বিষয়ে স্থানীয় কারবারি, হেডম্যান, জমির মালিক এবং এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও সাধারণ জনগণের সাথে প্রয়োজনীয় আলোচনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে সকলের জন্য উপযোগী ও সুবিধাজনক স্থান নির্বাচন করে স্থানীয় ভূমি অফিসের মাধ্যমে জমি বন্দোবস্তের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম যথাযথভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু স্বার্থান্বেষী মহল তাদের অবৈধ কার্যক্রম অব্যাহত রাখা এবং পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিদ্যমান সম্প্রীতি বিনষ্ট করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, বিশেষত ফেসবুক পেজে এ বিষয়ে মিথ্যা, বানোয়াট ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করছে। একই সাথে তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভাবমর্যাদা ক্ষুণœ করার লক্ষ্যে অপপ্রচার ও ভিত্তিহীন দোষারোপের অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

খাগড়াছড়ি ব্যাটালিয়নের (৩২ বিজিবি) ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক এ ধরনের গুজব, অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিমূলক তথ্য সম্পর্কে সচেতন থাকার এবং যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো অপপ্রচারে বিশ্বাস না করার আহ্বান জানান।