নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে সংঘটিত ভয়াবহ রক্তপাত ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আগামীকাল সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে এক দশকেরও বেশি সময় পর বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত এই হত্যাকাণ্ডের আনুষ্ঠানিক বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে। গতকাল শনিবার সকালে রাজধানীতে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ আয়োজিত ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ভুক্তভোগীদের জন্য ন্যায়বিচার প্রাপ্তি’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এ তথ্য জানান আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম।
প্রসিকিউশন সূত্র নিশ্চিত করেছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার দীর্ঘ ও নিবিড় তদন্তের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা এই ফরমাল চার্জে প্রধান আসামি করা হয়েছে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। তার পাশাপাশি তৎকালীন সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা এবং উসকানিমূলক ভূমিকা পালনকারী বিশিষ্ট ব্যক্তিদেরসহ ৪০ জনেরও বেশি মানুষকে আসামি করা হয়েছে। আগামীকাল সোমবার চার্জ দাখিলের পরই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে সব অভিযুক্তের নাম ও পরিচয়।
মামলাটিতে বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে ৯ জন হাই-প্রোফাইল আসামিকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। তারা হলেন- সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা: দীপু মনি, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, সাবেক মোটর খেতাবপ্রাপ্ত সেনাকর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব:) জিয়াউল আহসান, সাবেক আইজিপি এ কে এম শহিদুল হক, সাবেক ডিআইজি মোল্যা নজরুল ইসলাম, সাবেক ডিআইজি আবদুল জলিল মণ্ডল, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির উপদেষ্টামণ্ডলীর সভাপতি শাহরিয়ার কবির এবং সাংবাদিক ফারজানা রুপা ও মোজাম্মেল বাবু। গত ১৪ মে ট্রাইব্যুনাল ডা: দীপু মনি, ফারজানা রুপা ও মোজাম্মেল বাবুকে এই মামলায় গ্রেফতার দেখায়।
প্রসিকিউশনের যুক্তি অনুযায়ী, শাপলা চত্বরের অভিযানের সময় তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই পদক্ষেপকে ‘উচ্ছৃঙ্খল গোষ্ঠী নির্মূল’ হিসেবে প্রচার করে বিশ্ববাসীকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। অপরদিকে একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক দুই জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ফারজানা রুপা ও মোজাম্মেল বাবুর বিরুদ্ধে তৎকালীন সময়ে সম্প্রচার মাধ্যমে উসকানিমূলক তথ্য প্রচার ও নিধনযজ্ঞে সমর্থন দেয়ার অভিযোগ রয়েছে।
তদন্ত সংস্থার চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ৫ মে রাতে ও পরবর্তী সময়ে শাপলা চত্বরকে কেন্দ্র করে চালানো অভিযানে ঢাকাসহ দেশের চারটি জেলায় মোট ৫৮ জন নিহত হয়েছেন। দীর্ঘ দিন অনুসন্ধান চালিয়ে এই ৫৮ জনেরই সুনির্দিষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ পরিচয় নিশ্চিত করেছে, ট্রাইব্যুনালের তদন্ত দল। নিহতদের মধ্যে এককভাবে রাজধানী ঢাকাতেই প্রাণ হারিয়েছেন ৩২ জন। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জে ২০ জন, চট্টগ্রামে পাঁচজন এবং কুমিল্লায় একজনের মৃত্যু শনাক্ত করা হয়েছে।
ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম জানান, ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে সংঘটিত অপরাধের মাত্রা ছিল অতি ভয়াবহ। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা নিরলস কাজ করে একটি বিশদ ও তথ্য-প্রমাণ সমৃদ্ধ প্রতিবেদন চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে জমা দেয়। সেখান থেকে তা আইনি ও প্রযুক্তিগতভাবে যাচাই-বাছাই করে ফরমাল চার্জে রূপ দেয়া হয়েছে। আগামীকাল সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে এটি আদালতে পেশ করার পরই বিচারক দল চার্জ গঠন ও সাক্ষ্যগ্রহণের পরবর্তী সময়সূচি নির্ধারণ করবেন।



