নতুন আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা : বাংলাদেশের তিন বিকল্প ও জাতীয় নিরাপত্তার নব সংজ্ঞা

এখানে মূল ফোকাস হলো- উজানের দিকে না তাকিয়ে নিজের ভূখণ্ডের ভেতরেই পানি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা। এর অর্থ হলো নিজস্ব অর্থায়নে পানি সংরক্ষণ অবকাঠামো, ডাউনস্ট্রিম ব্যারাজ নির্মাণ, হাজার কিলোমিটার খাল পুনঃসংযোগ, কৃত্রিম জলাধার তৈরি এবং নদী পুনরুদ্ধার। এটি শুষ্ক মৌসুমের ঘাটতি যেমন কমাবে, তেমনি বন্যা নিয়ন্ত্রণও উন্নত করবে। সর্বোপরি, এই পদক্ষেপই ভবিষ্যতের প্রস্তাবিত ‘ওয়াটার-এনার্জি গ্রিড’-এর বাস্তব ভিত্তি তৈরি করবে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

গত তিন কিস্তিতে আমরা দেখেছি কিভাবে আদানির বিদ্যুৎ ক্রয়ের ২৫ বছরের টাকা দিয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব ‘ওয়াটার-এনার্জি গ্রিড’ তৈরি সম্ভব এবং এর কারিগরি ও ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো কী। এই কিস্তিতে আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু-পানিকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ এশিয়ায় তৈরি হওয়া নতুন কৌশলগত প্রতিযোগিতা এবং এই স্থায়ী ভূ-প্রাকৃতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ করণীয়।

পানি থেকে বিদ্যুৎ : নতুন আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা : অতীতে দক্ষিণ এশিয়ায় নদী নিয়ে বিরোধের মূল নিয়ামক ছিল ‘কৃষি সেচ’। কিন্তু বর্তমানে একবিংশ শতাব্দীতে এই সমীকরণ দ্রুত পাল্টাচ্ছে। পানি এখন আর কেবল কৃষির অনুষঙ্গ নয়, এটি আধুনিক বিদ্যুৎ ও শক্তি উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কৌশলগত উৎস।

চীন, ভারত, নেপাল ও ভুটান- প্রত্যেকটি দেশই জলবিদ্যুৎকে তাদের জাতীয় শক্তি নিরাপত্তার প্রধান চালিকাশক্তি ও কৌশলগত সম্পদ হিসেবে দেখছে। ফলে ব্রহ্মপুত্র-গঙ্গা অববাহিকার পানি এখন শুধু খাদ্যের জন্য নয়, বরং ক্ষমতার ভারসাম্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নেও এক চরম প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের প্রস্তাবিত অববাহিকাভিত্তিক মহাপরিকল্পনাও মূলত এই বৃহত্তর আঞ্চলিক ও ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতারই একটি অংশ।

বাংলাদেশের সামনে ৩টি কৌশলগত পথ

উজানের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ না থাকা এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে মূলত তিনটি বিকল্প পথ খোলা রয়েছে, যা একে অপরের পরিপূরক হলেও এদের রাজনৈতিক ও বাস্তবায়নের গতি ভিন্ন :

বাংলাদেশের ৩টি কৌশলগত পথ

১. অপেক্ষা ও চুক্তি -- ২. অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বৃদ্ধি -- ৩. আঞ্চলিক অববাহিকা সংযোগ

  • ধীরগতির কূটনীতি -- নিজস্ব ব্যারেজ ও খাল -- যৌথ অববাহিকা নীতি
  • উচ্চ অনিশ্চয়তা -- ওয়াটার-গ্রিডের ভিত্তি -- জটিল রাজনৈতিক আস্থা

পথ ১: অপেক্ষা ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তি

এই কৌশলে বাংলাদেশ মূলত বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক পানি চুক্তির কাঠামোর ওপর নির্ভর করবে এবং উজানের দেশগুলোর সাথে আলোচনার মাধ্যমে ধীরে ধীরে সমাধানের আশা রাখবে। এটি সরকারের জন্য তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়বহুল হলেও এর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো ‘অনিশ্চয়তা’। জলবায়ু পরিবর্তন এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক সমীকরণ যেভাবে দ্রুত বদলাচ্ছে, তার তুলনায় চুক্তিভিত্তিক সমাধান অত্যন্ত ধীরগতির।

পথ ২: অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বৃদ্ধি (সবচেয়ে বাস্তবসম্মত)

এখানে মূল ফোকাস হলো- উজানের দিকে না তাকিয়ে নিজের ভূখণ্ডের ভেতরেই পানি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা। এর অর্থ হলো নিজস্ব অর্থায়নে পানি সংরক্ষণ অবকাঠামো, ডাউনস্ট্রিম ব্যারাজ নির্মাণ, হাজার কিলোমিটার খাল পুনঃসংযোগ, কৃত্রিম জলাধার তৈরি এবং নদী পুনরুদ্ধার। এটি শুষ্ক মৌসুমের ঘাটতি যেমন কমাবে, তেমনি বন্যা নিয়ন্ত্রণও উন্নত করবে। সর্বোপরি, এই পদক্ষেপই ভবিষ্যতের প্রস্তাবিত ‘ওয়াটার-এনার্জি গ্রিড’-এর বাস্তব ভিত্তি তৈরি করবে।

পথ ৩: আঞ্চলিক অববাহিকাভিত্তিক যৌথ সহযোগিতা

তাত্ত্বিকভাবে এটিই সবচেয়ে টেকসই সমাধান। আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর যৌথ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ভুটান এবং চীনের মধ্যে তথ্য বিনিময়, যৌথ জলবিদ্যুৎ উৎপাদন, পানির প্রবাহ পর্যবেক্ষণ এবং সমন্বিত নীতি গ্রহণ করা। তবে এই পথটি সবচেয়ে জটিল, কারণ এতে উচ্চমাত্রার পারস্পরিক রাজনৈতিক আস্থা ও দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রয়োজন, যা বর্তমান দক্ষিণ এশীয় বাস্তবতায় বেশ কঠিন।

পানি কূটনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার নতুন সংজ্ঞা

একসময় জাতীয় নিরাপত্তা বলতে মূলত সীমান্ত রক্ষা, সামরিক শক্তি এবং ভূখণ্ডভিত্তিক প্রতিরক্ষাকেই বোঝানো হতো। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে রাষ্ট্রের টিকে থাকা ও স্থিতিশীলতার সংজ্ঞা বদলে গেছে। এই নতুন কাঠামোয় প্রথাগত সামরিক নিরাপত্তার জায়গা নিয়েছে বহুমাত্রিক চারটি ক্ষেত্র:

একবিংশ শতাব্দীর ৪টি নিরাপত্তা স্তম্ভ

১. পানি নিরাপত্তা: কৃষি উৎপাদন ও নগর জীবনের টেকসই ভিত্তি।

২. খাদ্য নিরাপত্তা : জনগণের জীবনধারণ ও অভ্যন্তরীণ সামাজিক স্থিতিশীলতা।

৩. জ্বালানি নিরাপত্তা: শিল্পায়ন, মেগা-প্রজেক্ট ও সামগ্রিক অর্থনীতির গতিশীলতা।

৪. জলবায়ু নিরাপত্তা: ওপরের তিনটি স্তম্ভের ওপর তৈরি হওয়া প্রাকৃতিক ঝুঁকি ও চাপ প্রশমন।

নদীনির্ভর ভূগোলের কারণে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই চারটি উপাদান একে অপরের সাথে আষ্টেপৃষ্টে জড়িত। নদী ও পানির সামান্যতম পরিবর্তন সরাসরি কৃষি, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং জলবায়ু অভিযোজনকে প্রভাবিত করে। ফলে পদ্মা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যতের যেকোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা শুধু সিভিল ইনফ্রাস্ট্রাকচার বা অবকাঠামোগত প্রকল্প নয়; এটি আসলে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

নদীর উৎস বদলানো যাবে না, বদলাতে হবে সক্ষমতা

বাংলাদেশের নদীগুলোর উজান পুরোপুরি অন্য দেশের ভূখণ্ডে অবস্থিত- এটি একটি স্থায়ী ও অলঙ্ঘনীয় ভূ-প্রাকৃতিক বাস্তবতা। রাজনৈতিক সীমারেখা পরিবর্তন না হলে এটি বদলানো সম্ভব নয়। ফলে নদীর প্রবাহ ও প্রাকৃতিক পানি বণ্টনের একটি বড় অংশ সবসময়ই সরাসরি বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকবে।

তবে এই ভূ-প্রাকৃতিক বাস্তবতা পরিবর্তন করা না গেলেও, যা পরিবর্তন করা সম্ভব তা হলো- বাংলাদেশের নিজস্ব প্রস্তুতি, কারিগরি দক্ষতা ও কৌশলগত সক্ষমতা। প্রশ্নটি নদীর উৎস বা উৎপত্তি স্থল বদলানোর নয়; বরং নদী থেকে যে পানিটুকু বাংলাদেশ পাচ্ছে, তা অভ্যন্তরীণভাবে কিভাবে সংরক্ষণ, স্মার্ট পুনর্বণ্টন এবং শক্তির উৎস হিসেবে ব্যবহার করবে- সেই দক্ষতার।

যদি বাংলাদেশ আদানির মতো প্রকল্পগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি পরমুখাপেক্ষী আর্থিক দায় তৈরি না করে, সেই অর্থ নিজস্ব পানি সংরক্ষণ অবকাঠামো, আধুনিক নদী শাসন এবং সৌর-হাইড্রো হাইব্রিড গ্রিড তৈরিতে বিনিয়োগ করতে পারে, তবেই উজানের সিদ্ধান্তের নেতিবাচক প্রভাব অনেকাংশে প্রশমন করা সম্ভব। অন্যথায়, এই সক্ষমতা তৈরি না হলে বাংলাদেশের পানি, খাদ্য ও বিদ্যুৎ নিরাপত্তা চিরকাল উজাননির্ভর গোলকধাঁধায় বন্দী থেকে যাবে, যার চাবিকাঠি থাকবে অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ প্রয়োজন ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার হাতে।

পরের কিস্তিতে-৫ লাখ কোটি টাকার প্রশ্ন: বাংলাদেশ কি এই মেগা-অবকাঠামোর আর্থিক চাপ বহন করতে পারবে?