সাইফুল আলম হিরন সোনাগাজী (ফেনী)
ফেনীর সোনাগাজীতে কোনো বৈধ বালুমহাল না থাকলেও ছোট ও বড় ফেনী নদী থেকে রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের অবৈধ বালু উত্তোলন ও স্তূপ করে রাখার মহোৎসব চলছে। এর ফলে একদিকে সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দু’টি গুরুত্বপূর্ণ সেতু ও নদীরক্ষা বাঁধ চরম হুমকির মুখে পড়েছে। একই সাথে নদীভাঙন তীব্র হওয়ায় বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি, ঘরবাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনা।
হুমকির মুখে পড়া সেতু দু’টির একটি হলো সোনাগাজী ও নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সংযোগস্থলে ছোট ফেনী নদীর ওপর প্রায় ৭৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ‘সাহেবের ঘাট সেতু’। অন্যটি বড় ফেনী নদীর ওপর নির্মিত দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সেচ প্রকল্প ‘মুহুরী প্রজেক্ট সেতু’, যা ৪০টি জলকপাট বিশিষ্ট এবং এটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ১৬৮ কোটি টাকা।
সরেজমিন দেখা যায়, ছোট ফেনী নদীর সাহেবের ঘাট সেতুসংলগ্ন এলাকায় স্থানীয় প্রভাবশালী চক্র অন্তত ১৫টি বাল্কহেড বসিয়ে প্রতিদিন লাখ লাখ সেফটি বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। কোনো ইজারা না থাকলেও নদীর পাড়েই বিশাল মহাল তৈরি করে চলছে এই অবৈধ ব্যবসা। ওভারলোড বা অতিরিক্ত বালু বোঝাই করে প্রতিদিন শত শত ড্রাম ট্রাক ও ট্রলি সেতুর ওপর দিয়ে যাতায়াত করছে। এর ফলে ইতোমধ্যে সাহেবের ঘাট সেতুর পিলারের গোড়া থেকে মাটি ও বালু সরে গিয়ে বড় ধরনের ভাঙন দেখা দিয়েছে।
একই চিত্র বড় ফেনী নদীর মুহুরী প্রজেক্ট এলাকায়। সোনাগাজী সদর ইউনিয়নের থাক খোয়াজের লামচি মৌজায়, দেশের প্রথম বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্রের মাত্র ২০০ মিটার দূরত্বের মধ্যে একাধিক বাল্কহেড বসিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। অতিরিক্ত ওজনের বালুবাহী ড্রাম ট্রাক চলাচলের কারণে পর্যটন এলাকাটির পরিবেশ দূষিত হচ্ছে এবং মুহুরী সেতুটি ঝুঁকিতে পড়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত এই বালু উত্তোলন বন্ধ না হলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত নদীরক্ষা বাঁধ এবং বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি টাওয়ার যেকোনো সময় নদীতে বিলীন হয়ে যেতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সোনাগাজীতে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বালু উত্তোলনের হার ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। জনঅসন্তোষের মুখে তৎকালীন জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলাম সোনাগাজীর সব বালুমহাল অবৈধ ঘোষণা করে পরিপত্র জারি করেন। তবে কিছুদিন বন্ধ থাকার পর ওই জেলা প্রশাসকের বদলি হতেই আবার শুরু হয় অবৈধ বালু উত্তোলন। বালুবাহী ভারী ট্রাক চলাচলের কারণে চরচান্দিয়া ইউনিয়নের কেরামতিয়া বাজার সড়ক, ওলামা বাজার সড়ক, ভূঁইয়া বাজার সড়ক, চর মজলিসপুর, বগাদানা, চর দরবেশ ও মুহুরী প্রজেক্টের বেড়িবাঁধ সড়কসহ গ্রামীণ সড়কগুলো ভেঙে যাতায়াতের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় কৃষক জামশেদ আলম ও ইসমাইল হোসেন জানান, বালু খেকোদের ড্রেজার ও মেশিনের কারণে নদীর উপকূলে তীব্র ভাঙন শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে শত শত ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, মসজিদ, মন্দির ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নদীতে হারিয়ে গেছে। ভিটেমাটি হারিয়ে অনেকে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। প্রভাবশালীরা দিনের বেলা অন্য স্থান থেকে বালু আনার নাটক করলেও প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে মূলত রাতেই নদী থেকে বালু উত্তোলন করে। ক্ষমতাসীনদের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না।
এ বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু জানান, অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে প্রশাসনকে আইনগত ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। বিষয়টি পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়কেও অবহিত করা হয়েছে। তবে এগুলো পুরোপুরি বন্ধ করতে কিছুটা সময় লাগবে এবং বর্ষা এলে বালু উত্তোলন এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে।
গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হলে সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিষয়টি জেলা প্রশাসক মনিরা হককে অবহিত করে। এর পরিপ্রক্ষিতে জেলা প্রশাসক অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে (রাজস্ব) সরেজমিন পরিদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন।
সোনাগাজী ইউএনও রিগান চাকমা এবং ফেনী জেলা প্রশাসক মনিরা হক নিশ্চিত করেছেন যে, সোনাগাজীতে বর্তমানে কোনো বৈধ বালুমহাল নেই। কাঠামোগত সুরক্ষার স্বার্থে সাহেবের ঘাট সেতু এলাকায় সব ধরনের বালু ব্যবস্থাপনা ইতোমধ্যে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মুহুরী প্রজেক্ট এলাকায়ও সেতুর কোনো ক্ষতি হচ্ছে কিনা তা বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সেখানে কোনো ঝুঁকি প্রমাণিত হলে তাৎক্ষণিকভাবে বালু উত্তোলনের সব কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হবে।



