শুল্ক-কর বৃদ্ধিতে বাড়তে পারে বিভিন্ন পণ্যের দাম

দাম বাড়বে

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা, জনস্বাস্থ্য রক্ষা এবং পরিবেশবান্ধব পণ্যের ব্যবহার উৎসাহিত করার লক্ষ্যে বেশ কিছু পণ্যের ওপর শুল্ক ও কর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারের দাবি, এসব পদক্ষেপ স্থানীয় শিল্পের বিকাশে সহায়ক হবে। তবে ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, আমদানিনির্ভর বিভিন্ন ভোগ্য ও শিল্পপণ্যের উৎপাদন ব্যয় বাড়লে শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব ভোক্তা পর্যায়েও পড়বে।

গতকাল বাজেট প্রস্তাব অনুযায়ী কাজুবাদাম, আমদানিকৃত পাঙাশ ফিলেট, সিগারেট, নিকোটিন পাউচ, হিটেড টোব্যাকো, পেট্রোল ও ডিজেলচালিত গাড়ি, ওয়াশিং মেশিন, জিপসাম বোর্ড, কপার টিউব ও তার, কোল্ড-রোল্ড কয়েল, পিভিসি ও পিইটি রেজিন, মেইজ স্টার্চ এবং সাইকেলের কিছু যন্ত্রাংশের ওপর শুল্ক ও কর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

কাজুবাদাম ও মাছে বাড়তি শুল্ক

দেশীয় কাজুবাদাম চাষ ও প্রক্রিয়াজাত শিল্পকে সুরক্ষা দিতে অপ্রক্রিয়াজাত কাজুবাদামের আমদানি শুল্ক ১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ এবং প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদামের শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে আমদানিনির্ভর বাজারে কাজুবাদামের দাম বাড়তে পারে। একইভাবে দেশীয় মৎস্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পকে উৎসাহ দিতে আমদানিকৃত পাঙাশ মাছের ফিলেটের ওপর নতুন করে ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে আমদানিকৃত পাঙাশজাত পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পেতে পারে।

তামাকজাত পণ্যে বাড়ছে করের চাপ

জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার অংশ হিসেবে সব স্তরের সিগারেটের ন্যূনতম খুচরা মূল্য বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। নিম্নস্তরের প্রতি ১০ শলাকার সিগারেটের মূল্য ৬২ টাকা, মধ্যম স্তরে ৯২ টাকা, উচ্চ স্তরে ১৬০ টাকা এবং অতি উচ্চ স্তরে ২১০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া নিকোটিন পাউচের ওপর ৪০ শতাংশ এবং হিটেড টোব্যাকো পণ্যের ওপর ৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে এসব পণ্যের দাম আরো বাড়বে।

গাড়ির দাম বাড়তে পারে

পরিবেশ দূষণ কমাতে ১২০০ থেকে ১৬০০ সিসি ক্ষমতার ইন্টারনাল কম্বাশন ইঞ্জিনচালিত গাড়ির মোট করভার ১৩২ দশমিক ৩৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে পেট্রোল ও ডিজেলচালিত গাড়ির বাজারে দাম বাড়তে পারে।

ওয়াশিং মেশিন ও নির্মাণসামগ্রীতে চাপ

স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে সব ধরনের হাউজহোল্ড ওয়াশিং মেশিন আমদানির ওপর নতুন করে ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে আমদানিকৃত ওয়াশিং মেশিনের দাম বাড়তে পারে। একইভাবে জিপসাম বোর্ড ও জিপসাম শিট আমদানিতে ২০ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব রয়েছে।

শিল্পের কাঁচামালে বাড়তি কর

স্থানীয় ট্রান্সফরমার শিল্পকে সুরক্ষা দিতে ১ কেভিএ পর্যন্ত ক্ষমতাসম্পন্ন ট্রান্সফরমারের আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ এবং অতিরিক্ত ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।

কপার টিউবের আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ এবং কপারের তারের ওপর নতুন করে ১০ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব রয়েছে। ফলে বৈদ্যুতিক ও প্রকৌশল খাতের উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে।

শিল্পে বহুল ব্যবহৃত কোল্ড-রোল্ড কয়েল ও শিট আমদানির ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে স্টিল ও প্রকৌশল খাতের উৎপাদন ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং খাতে প্রভাব

প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং শিল্পে ব্যবহৃত পিভিসি রেজিন এবং পিইটি রেজিনের আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। গ্রিজপ্রুফ পেপার এবং গ্লাসিন পেপারের আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ এবং অতিরিক্ত ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব রয়েছে। ফলে খাদ্য ও প্যাকেজিং শিল্পে ব্যবহৃত এসব কাগজের দামও বাড়তে পারে।

মোটর, মেইজ স্টার্চ ও টেক্সটাইল খাতেও প্রভাব

দেশীয় মোটর উৎপাদনকারী শিল্পকে সুরক্ষা দিতে ১২০০ ওয়াটের কম ক্ষমতাসম্পন্ন ডিসি মোটর আমদানির ওপর ১০ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। ভুট্টা থেকে উৎপাদিত মেইজ স্টার্চের আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে। খাদ্য, ওষুধ, টেক্সটাইল ও বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহৃত এই কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি পেলে সংশ্লিষ্ট পণ্যের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়তে পারে।

এ ছাড়া আমদানি বিকল্প শিল্পকে উৎসাহ দিতে পলিয়েস্টার স্ট্যাপল ফাইবার আমদানিতে নতুন করে ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে টেক্সটাইল খাতের ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সাইকেল শিল্পেও ব্যয় বাড়ার শঙ্কা

স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে সাইকেলের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ ফ্রি হুইলের আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ এবং অতিরিক্ত ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে সাইকেল উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিদেশী গ্যাস সিলিন্ডার : কম্পোজিট এলপিজি (তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস) সিলিন্ডার আমদানিতে আমদানি পর্যায়ে মূল্য সংযোজন কর (মূসক/ভ্যাট) আরোপ করায় এর দাম বাড়তে পারে।

বিদেশী মধু : বিদেশ থেকে প্রাকৃতিক মধু আমদানির ক্ষেত্রে ন্যূনতম শুল্কায়ন মূল্য ইউনিটপ্রতি ২ ডলার বাড়িয়ে ৭ ডলার করা হয়েছে। এতে এই মধু আমদানিতে শুল্ককর বেশি দিতে হবে, যা দাম বাড়িয়ে দিতে পারে।

বিদেশী সুপারি : বিদেশ থেকে সুপারি আমদানির ক্ষেত্রে ন্যূনতম শুল্কায়ন মূল্য ইউনিটপ্রতি দশমিক ২৫ ডলার বাড়ানো হয়েছে। এতে এই সুপারি আমদানিতে শুল্ককর বেশি দিতে হবে।

বিদেশী খাদ্য : সুগার কনফেকশনারি, কফি, তৈরি খাবার ইত্যাদি আমদানিতে বিভিন্ন হারে শুল্কায়ন মূল্য বাড়ানো হয়েছে। এতে এসব খাদ্য আমদানিতে শুল্ককরের চাপ বাড়বে।

বিদেশী লিপ লাইনার ও জেল : লিপ লাইনার, লিপ জেল ও সমজাতীয় পণ্য আমদানির শুল্কায়নমূল্য বাড়ানো হয়েছে।

রড : রড তৈরির বিভিন্ন উপকরণের ওপর ভ্যাট বাড়ানো হয়েছে। এতে রডের দাম বাড়তে পারে। এ ছাড়া শুল্ককর ও শুল্কায়ন মূল্য বাড়ানোয় বিদেশী টাইলস, স্যানিটারিওয়্যার ও বেসিন, বিদেশী ফোম, বিদেশী মাইক্রোওয়েভ ওভেন ও খেলনা ইত্যাদির দাম বাড়তে পারে।