নিজস্ব প্রতিবেদক
টিকাদানের ঘাটতি বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের (প্রতিরোধী) ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। গবেষকরা বলছেন, টিকা শুধু রোগ প্রতিরোধই করে না; টিকা অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমানো, ওষুধ প্রতিরোধী সংক্রমণের (ইনফেকশান) বিস্তার রোধ এবং স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে সংক্রমণ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
ওয়ান হেলথ ট্রাস্ট এবং আইসিডিডিআরবি’র নেতৃত্বে পরিচালিত গ্লোবাল অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স পার্টনারশিপ (গার্প) প্রকাশিত পলিসি ব্রিফে এই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। অ্যান্টিমাইক্রোবায়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) মোকাবেলায় টিকার ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন দেশের পরিপ্রেক্ষিতে বহুমাত্রিক তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরতে এই পলিসি ব্রিফটি তৈরি করা হয়েছে। এই উদ্যোগে বাংলাদেশসহ আইভরি কোস্ট, ভারত, কেনিয়া, মোজাম্বিক, নেপাল, পাকিস্তান, দণি আফ্রিকা, উগান্ডা এবং ভিয়েতনাম রয়েছে। বাংলাদেশের এই পলিসি ব্রিফটি তৈরি করা হয়েছে সরকারি সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাবিদ, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং প্রাণিসম্পদ খাতের বিশেষজ্ঞ সমন্বয়ে।
বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাবের এ সময়ে এই পলিসি ব্রিফটি ফলপ্রসূ হবে বলে আইসিডিডিআরবির সংশ্লিষ্টরা বলছেন। চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ১৭ মে পর্যন্ত ৫৪ হাজার ৯১১’র বেশি সন্দেহভাজন হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে, এর মধ্যে ৩৮৯ শিশু নিশ্চিত কিংবা হামজনিত মৃত্যু বলে বিবেচিত হয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের প্রাদুর্ভাব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ক্রমবর্ধমান ঘাটতির প্রতিফলন বলে বিবেচিত হচ্ছে। কারণ এরই মধ্যে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘœ এবং কিছু জনগোষ্ঠীর টিকার প্রতি আস্থা কমে যাওয়ায় সৃষ্টি হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে আইসিডিডিআরবির ইনফেকশাস ডিজিজেস ডিভিশনের এন্টারিক অ্যান্ড রেসপিরেটরি ইনফেকশান ইউনিটের বৈজ্ঞানিক এবং গার্প বাংলাদেশের সভাপতি ডা: ওয়াসিফ আলী খান বলেন, সংক্রমণ কমানো, অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমানো এবং জীবানুর প্রতিরোধী ক্ষমতা মোকাবেলায় বৃহত্তর প্রচেষ্টাকে বেগবান করার জন্য টিকা সবচেয়ে বেশি কার্যকর এবং সাশ্রয়ী উপায়গুলোর একটি। টিকার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা প্রতিটি সংক্রমণ অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার এবং ওষুধ প্রতিরোধী জীবানুর বিস্তার কমানোর সম্ভাবনা তৈরি করে। বাংলাদেশের চলমান হামের প্রাদুর্ভাব আমাদের মনে করিয়ে দেয়, টিকাদানের ঘাটতি কত দ্রুত জনস্বাস্থ্যে কয়েক দশকের অগ্রগতিকে পিছিয়ে দিতে পারে।
অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স এখন এই শতাব্দীর অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে যে, ২০২৫ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী এএমআরের কারণে তিন কোটি ৯০ লাখেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হতে পারে। শুধুমাত্র বাংলাদেশেই ২০২১ সালে এএমআরের সাথে সম্পর্কিত মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৯৬ হাজার ৮৭৮, যার মধ্যে ২৩ হাজার ৪৫৪ মৃত্যু সরাসরি এএমআরের কারণে।
পলিসি ব্রিফে উল্লেখ করা হয় যে, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) মাধ্যমে বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে, যার ফলে নবজাতকের ধনুষ্টংকার নিমূর্ল, পোলিও দূরীকরণ এবং জন্মগত রুবেলা রোগ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়েছে। তবে এটিও সতর্ক করা হয়েছে যে, এই অর্জনগুলোকে স্থায়ী বলে ধরে নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে যে, টিকার কভারেজ বাড়ালে বাংলাদেশে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের সমস্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
ওয়ান হেলথের আওতায় আইসিডিডিআরবি, স্বাস্থ্য অধিদফতর, আইইডিসিআর, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর, আর্ক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেস এবং প্রাণিসম্পদ খাতের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত গার্প টেকনিক্যাল ওয়ার্কিং গ্রুপ এই পলিসি ব্রিফটি তৈরি করেছে।
এই পলিসি ব্রিফে সুপারিশ করা হয়েছে, সর্বজনীন শিশু টিকাদানের কভারেজ বজায় রাখা, এএমআর প্রতিরোধে কার্যকর প্রমাণিত টিকার প্রাপ্যতা সম্প্রসারণ এবং বাংলাদেশের জাতীয় এএমআর-প্রতিরোধী কৌশলে টিকাদান কর্মসূচিকে আরো কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করা। এছাড়া এতে টিকা সংক্রান্ত তিনটি নির্দিষ্ট সুপারিশ করা হয়েছে, যা বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার এবং এএমআরের বোঝা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে। নীতিনির্ধারক এবং জনস্বাস্থ্য নেতৃবৃন্দের প্রতি এই প্রতিবেদনে উপস্থাপিত সুপারিশ ও তথ্য-প্রমাণ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের টিকাদান কার্যক্রম আরো জোরদার করতে এবং এএমআর মোকাবেলায় টিকাকে কেন্দ্রীয় কৌশল হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।



