রংপুর ব্যুরো
অবহেলায় রোগী মৃত্যুর ঘটনার অভিযোগে বিক্ষুব্ধ অভিভাবক কর্তৃক ইন্টার্নি চিকিৎসককে মারধরের ঘটনায় ইন্টার্নি চিকিৎসকদের কর্তৃক লাশ আটকানো এবং লাশের দাবিতে বিক্ষুব্ধদের সড়ক অবরোধের ঘটনায় ১১ ঘণ্টা চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে। এ নিয়ে লঙ্কাকাণ্ড ঘটে ওই এলাকায়। জরুরি বিভাগও বন্ধ ছিল ২ ঘণ্টা। এতে রোগীদের অবস্থা আরো কাহিল হয়ে পড়ে।
গতকাল ভোর রাত ৪টা থেকে বিকেল সোয়া ৩টা পর্যন্ত এ ঘটনা ঘটে হাসপাতাল এবং সড়কে।
অভিভাবক ও ইন্টার্নি চিকিৎসকরা জানান, শনিবার ভোর রাত ৪টার দিকে নগরীর জুম্মাপাড়া এলাকার রিফাত ও নুরুজ্জামান রিন্টু তাদের মা নুরুন্নাহার বেগমকে রামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগ হয়ে ভর্তি করায় হৃদরোগ বিভাগে। রিফাত ওয়ার্ডে গিয়ে কর্তব্যরত ইন্টান চিকিৎসক নাইম বকশিকে মুমূর্ষু অবস্থার কারণে দ্রুত অক্সিজেন দেয়ার জন্য বকলেন। কিন্তু ইন্টার্নি চিকিৎসক নাইম ওয়ার্ডে ভর্তির কাগজপত্র এন্ট্রি না হওয়া পর্যন্ত অক্সিজেন না দেয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। এরই মধ্যে ওই নারী মারা যান। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওই চিকিৎসককে মারপিট করে রোগীর ছোট ছেলে রিফাত। এ ঘটনার পর সকালে মায়ের লাশ বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্সে উঠাতে গেলে তাতে বাধা দেয় ইন্টার্নি চিকিৎসকরা। তারা ভুক্তভোগী অভিভাবকদের ক্ষমা চাওয়ার আলটিমেটাম দেয়।
পরিস্থিতি খারাপ হতে থাকলে হাসপাতালের পরিচালক নিরাপত্তার খাতিরে রিফাতকে তার রুমে নিয়ে যান এবং বিষয়টি সমঝোতার চেষ্টা করেন। কিন্তু ইন্টার্নি চিকিৎসকরা তখন পরিচালকের অফিস ঘেরাও করে রাখেন।
অন্য দিকে ইন্টার্নি চিকিৎসকদের পক্ষ নিয়ে মেডিক্যাল শিক্ষার্থীরা বেলা ১১টা থেকে জরুরি বিভাগ বন্ধ করে দেয়। ফলে রোগী ভর্তিও বন্ধ থাকে হাসপাতালে। জরুরি বিভাগে শত শত রোগী ভর্তি না হতে পারে কাতরাতে দেখা যায়। এ ছাড়াও পুরো হাসপাতালজুড়ে চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত ও তৈরি হয় বিক্ষোভ। রোগীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
ভর্তি হতে না পারা দিনাজপুরের শরিফুল ইসলাম জানালেন, এখানে ডাক্তার এবং ছাত্ররা কি আন্দোলন করছে, কি নিয়া কি হইলো? চিকিৎসা টোটালি বন্ধ। আমি তো দেড় ঘণ্টার মতো বসে আছি, স্ত্রীকে ভর্তি করাতে পারছি না।’
এদিকে দুপুর ২টা থেকে মায়ের লাশের দাবিতে বড় ছেলে নুরুজ্জামান রিন্টুর নেতৃত্বে মেডিক্যাল মোড়ে সড়ক অবরোধ করে রাখেন বিক্ষুব্ধরা। এতে দুই পাশে শত শত যানবাহন আটকে যায়। ভ্যাপসা গরমে কাহিল হয়ে পড়েন যাত্রীরা।
এ সময় রিন্টু জানান, ‘আমার মা অক্সিজেনের অভাবে মারা গেছেন। রাগে আমার ছোট ভাই ডাক্টারকে মেরেছে। সাথে সাথে আমরা ভুল স্বীকার করেছি। কিন্তু তারা আমার মায়ের লাশ আটকে দিলো। একবার দিতে চাইলো ১টার দিকে, তখন অ্যাম্বুলেন্সে তুলতে ধরলাম। আবার আটকে দিলো। বাধ্য হয়ে অবরোধ করেছি। ও তো ছোট ছেলে একটা একটু ভুল করেছে তার জন্য মায়ের লাশ শাস্তি পাবে এটা মেনে নেয়া যায় না। আমার ভাই পরিচালকের রুমে আছে।
লাশ আটকানো এবং আন্দোলন প্রসঙ্গে ইন্টার্নি চিকিৎসক সিফাত জানান, ‘আমাদের ডক্টর নাইমকে এমনভাবে মারছে, সে এখন নিউরোসার্জারিতে ভর্তি আছে। তার মাথায় এবং ঘাড়ে মারাত্মক আঘাত করা হয়েছে। সেবা দেয়ার জন্যই আমরা আসছি, আমাদেরকেই খুন করে ফেলতেছেন। কিছু দিন আগে আরিফ ভাইকে মেরে ফেলছেন। আপনারা ডাক্তারদের মেরে ফেলতে পারতেছেন। সেখানে আপনাদের মানবিকতা কাজ করে না। দুই ঘণ্টা জরুরি বিভাগ বন্ধ ছিল সেই মায়াকান্না নিয়ে পড়ে আছেন। বিষয়টা খুবই দুঃখজনক।’ এমন পরিস্থিতিতে বেলা সোয়া ৩টায় পরিচালকের মধ্যস্থতায় ইন্টার্নি চিকিৎসকরা লাশ ফেরত দিলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। পরিচালকের কার্যালয় থেকে মৃতের ছেলেকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়।
এ ব্যাপারে হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান জানান, ‘আমি সিসিটিভি ক্যামেরায় দেখেছি এবং সার্বিক খোঁজখবর নিয়েছি ওই ঘটনায় ইন্টার্নি চিকিৎসকের কোনো অবহেলা ছিল না। কিন্তু তাকেসহ কয়েকজনকে ইনটেনশনালি মারধর করা হয়েছে। এটা দুঃখজনক।’


