খালিদ সাইফুল্লাহ
রাজধানীর চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী হজ ও ওমরাহ মেলা সফল হয়েছে বলে মনে করেন হজ সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, পবিত্র হজ নিয়ে প্রতারণা বন্ধ করতে হজযাত্রীদের সাথে এজেন্সি মালিকদের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে এ মেলার আয়োজন করা হয়েছিল, যা অনেকটাই সফল হয়েছে। তিন দিনের মেলায় বহু হজ প্রত্যাশী চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এসে এজেন্সি মালিকদের সাথে সরাসরি কথা বলেছেন, প্যাকেজগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জানার সুযোগ পেয়েছেন, বিভিন্ন এজেন্সির প্যাকেজের তুলনা করতে পেরেছেন এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বুকিং দিয়ে ছাড়ও পেয়েছেন। সর্বোপরি মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে এ মেলা মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করেন হজ সংশ্লিষ্টরা।
প্রতি বছর পবিত্র হজকে কেন্দ্র করে নানামুখী প্রতারণার ঘটনা ঘটে। নিবন্ধনবিহীন বিভিন্ন এজেন্সির নাম দিয়ে হজযাত্রীদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে থাকে একশ্রেণীর প্রতারক ও মধ্যস্বত্বভোগীরা। পরে হজযাত্রীদের নিবন্ধন না করে টাকা নিয়ে পালিয়ে যান তারা। এ ছাড়া নিবন্ধিত এজেন্সির নাম করে হজযাত্রীদের কাছ থেকে টাকা এনে তার পুরোটা জমা দেন না মধ্যস্বত্বভোগীরা। হজে যাওয়ার শেষ মুহূর্তে গা-ঢাকা দেন তারা।
এ সময় বিপাকে পড়া হজযাত্রীরা এজেন্সি মালিকদের কাছে গিয়ে কান্নাকাটি করেও সুরাহা পান না। তখন হাব ও ধর্ম মন্ত্রণালয়কে ব্যবস্থা নিতে হয়। সর্বশেষ গত হজেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। আগামী হজকে কেন্দ্র করেও এখন থেকেই একশ্রেণীর প্রতারকচক্র মাঠে নেমেছে। এ রকম পরিস্থিতিতে আগামী বছর হজযাত্রীরা যাতে প্রতারণার শিকার না হন সে লক্ষ্য সামনে রেখে রাজধানীর চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে গত ৩০, ৩১ জুলাই এবং গতকাল ১ আগস্ট এ তিন দিনব্যাপী হজ ও ওমরাহ মেলার আয়োজন করে বেসরকারি হজ এজেন্সি মালিকদের সংগঠন হাব। মোট ১৫৪টি স্টল দেয়া হয় মেলায়। বিভিন্ন এজেন্সির পাশাপাশি ধর্ম মন্ত্রণালয়, হাব, বিভিন্ন ব্যাংক, বিমান সংস্থা মেলায় স্টল দেয়।
প্রথম দিন উদ্বোধনের পর মেলায় হজে গমনে ইচ্ছুক মানুষের পদচারণা বাড়তে থাকে। তবে গত শুক্রবার এবং গতকাল শনিবার ছুটির দিন থাকায় মেলায় মানুষের ভিড় ছিল অনেক। মেলার প্রতিটি স্টল ঘুরেই দেখা গেছে হজে গমনে ইচ্ছুক মানুষের ভিড়। এজেন্সির মালিক-কর্মচারীদের সাথে তারা স্টলে বসে সরাসরি কথা বলে প্যাকেজ সম্পর্কে ধারণা নেন। এজেন্সি মালিকরা এ সময় হজে যেতে আগ্রহীদের খেজুর, গাওয়া, কফি, কাজুবাদাম, চকোলেট-সহ বিভিন্ন ধরনের নাশতা দিয়ে আপ্যায়িত করেন।
আগামী হজে পাঁচ লাখ ১৩ হাজার টাকা থেকে শুরু করে প্রায় ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন এজেন্সি মালিকরা। তবে দর্শনার্থীদের বড় অংশই বলেছেন, তারা দামের চেয়ে হোটেলের দূরত্ব, সুযোগ-সুবিধা এবং এজেন্সির সেবার মানকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
আমিনুল ইসলাম নামে এক অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, মেলায় এসে আমি অনেকগুলো এজেন্সির সাথে কথা বলেছি। হজের খরচের তথ্য নিয়েছি। সবার প্যাকেজের খরচ প্রায় একই রকম। বিশেষ প্যাকেজের ক্ষেত্রে কিছু পার্থক্য রয়েছে। মূলত বিশ্বাস ও সম্পর্কের ভিত্তিতে এজেন্সি বাছাই করতে হয়। পরে আবার যোগাযোগ করে এজেন্সি ঠিক করে নেব।
বেসরকারি চাকরিজীবী শরিফুল ইসলাম বলেন, আমি মাকে নিয়ে ওমরাহ করতে যাবো। কোন এজেন্সি কেমন খরচ নিচ্ছে, সেবা কী কী দেবে সে বিষয়ে খোঁজখবর নিতে এসেছি। অনেকগুলো এজেন্সির প্যাকেজ সম্পর্কে জেনেছি। পরে আরো বিস্তারিত আলোচনা করে দিনক্ষণ ঠিক করব। মেলা হওয়ার কারণে অনেকগুলো এজেন্সির তথ্য এক জায়গা থেকে পাওয়া সম্ভব হয়েছে বলেও তিনি মনে করেন।
মেলায় স্ত্রীকে নিয়ে আসা ব্যবসায়ী ইখলাস হোসেন বলেন, হজের সময় বিভিন্ন এজেন্সির বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ শুনি। আমরা প্রতারণা চাই না, ভালো সেবা চাই। প্যাকেজগুলোর দাম তো প্রায় কাছাকাছি। ২০২৭ সালে হজ করার নিয়ত করেছি। তাই বিভিন্ন স্টল ঘুরে সুযোগ-সুবিধা দেখছি। সবকিছু যাচাই করে ভালো একটি এজেন্সির প্যাকেজ নেবো।
কোবা হজ গ্রুপের মালিক মাওলানা মাহমুদুর রহমান বলেন, তিন দিনের মেলায় স্টল দিয়ে আমাদের অনেক খরচ হয়েছে। তবে এখান থেকে অনেক আউটপুটও আছে। হজ ও ওমরাহ ইচ্ছুক ব্যক্তিরা আমাদের স্টলে এসে সরাসরি খরচ ও সেবা সম্পর্কে জেনে যাচ্ছেন। অনেকে এর মধ্যে বুকিংও দিয়েছেন। পরে যোগাযোগ করবেন এমন অনেকে বলেছেন। মূলত মেলার মাধ্যমে হজ-ওমরাহযাত্রী এবং এজেন্সির মধ্যে একটি আন্তঃসম্পর্ক গড়ে ওঠে।
হাবের মহাসচিব ফরিদ আহমেদ মজুমদার নয়া দিগন্তকে বলেন, তিন দিনের মেলা আয়োজন সার্থক হয়েছে। মেলা আয়োজনের প্রধান যে টার্গেট মধ্যস্বত্বভোগীরাদের দৌরাত্ম্য কমানো সেটির ক্ষেত্রে আমরা অনেকটা সফল হয়েছি। মেলায় তিন দিনে অনেক মানুষ এসেছেন। তারা সরাসরি এজেন্সির সাথে কথা বলে প্যাকেজ ঠিক করার সুযোগ পেয়েছেন। এতে হাজীদের প্রতারণার শিকার হওয়ার মাত্রা অনেক কমে যাবে বলে আমরা প্রত্যাশা করছি। আগামীতে হজযাত্রীরা আরো সচেতন হবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।



