গাজায় যুদ্ধবিরতির মধ্যে ইসরাইলি হামলা অব্যাহত : নিহত ৬

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

গাজায় চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যেও ইসরাইলি হামলায় অন্তত তিন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। দক্ষিণ গাজার খান ইউনুস ও গাজা সিটিতে পৃথক হামলায় আরো কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে চিকিৎসা সূত্রের বরাতে জানিয়েছে আনাদোলু। খান ইউনুসের কেন্দ্রীয় এলাকায় একদল ফিলিস্তিনিকে লক্ষ্য করে ইসরাইলি ড্রোন হামলা চালালে একজন নিহত এবং চারজন আহত হন। নিহত ও আহতদের নাসের হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলার সময় অন্তত একটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। একই সময়ে পূর্ব খান ইউনুসের বানি সুহাইলা এলাকায় ইসরাইলি সামরিক যান প্রবেশ করে গোলাবর্ষণ চালায়। স্থানীয় সূত্র জানায়, ইসরাইলি বাহিনী তথাকথিত ‘ইয়েলু লাইন বা হলুদ রেখা’ আরো পশ্চিমে সরিয়ে নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা বাড়িয়েছে। ওই এলাকায় কয়েকটি বাড়িও গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এতে বহু পরিবার মধ্য ও পশ্চিম খান ইউনুসে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।

অন্য দিকে শনিবার গাজা সিটির আল-শিফা সড়কের কাছে একটি বেসামরিক গাড়িতে ইসরাইলি বিমান হামলায় দুই ফিলিস্তিনি নিহত ও তিনজন আহত হন। হামলাটি এমন এলাকায় চালানো হয়, যেখান থেকে যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে ইসরাইলি বাহিনী সরে গিয়েছিল। এ ছাড়াও গতকাল মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ এলাকায় একটি খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রে ইসরাইলি ড্রোন হামলায় অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন। স্বাস্থ্য সূত্র জানায়, আল-আকসা শহীদ হাসপাতালের কাছে একটি বাড়ির আঙিনায় স্থাপিত দাতব্য খাদ্য বিতরণকেন্দ্রে দু’টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। এতে বহু মানুষ আহত হয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলার পর এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আহতদের দ্রুত আল-আকসা শহীদ হাসপাতালে নেয়া হয়।

নিহত বেড়ে ৭২ হাজার ৭৬৩

এ দিকে গাজায় ইসরাইলি হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭২ হাজার ৭৬৩ জনে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় গাজার বিভিন্ন হাসপাতালে ৬ জন নিহত ও ১৯ জন আহতকে আনা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে চারজনের লাশ ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকেও ইসরাইলি হামলায় ৮৭১ জন নিহত এবং ২ হাজার ৫৬২ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে আরো ৭৭৬ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধে এখন পর্যন্ত আহতের সংখ্যা বেড়ে ১ লাখ ৭২ হাজার ৬৬৪ জনে পৌঁছেছে বলে জানায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

গাজায় ধ্বংসযজ্ঞের ভিডিও প্রকাশ

যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও গাজায় ইসরাইলি বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। ফিলিস্তিনি সরকারি যোগাযোগকেন্দ্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ইসরাইলি সেনারা ভারী যন্ত্রপাতি ও খননযন্ত্র ব্যবহার করে আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোও গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। ভিডিওতে বহু আবাসিক এলাকা সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে দেখা যায়। অবকাঠামোর বড় অংশই ধ্বংস হয়ে গেছে এবং টিকে থাকা ভবনগুলোও পদ্ধতিগতভাবে ভেঙে ফেলা হচ্ছে। এ দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলছে, এই ধ্বংসযজ্ঞ মানবিক সঙ্কট আরো গভীর করছে এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের ঘরে ফেরা ও পুনর্গঠনকে কঠিন করে তুলছে।

অবৈধ বসতি সম্প্রসারণে সামরিক অবকাঠামো ব্যবহার

অধিকৃত পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি সম্প্রসারণে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ ও বসতি স্থাপনকারীরা সামরিক অবকাঠামো এবং সামরিক দখল আদেশ ব্যবহার করছে বলে জানিয়েছে ‘প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন’-এর ভূমি রক্ষা ও বসতি প্রতিরোধবিষয়ক জাতীয় ব্যুরো। প্রকাশিত খবরে বলা হয়, গত কয়েক বছরে ইসরাইল পশ্চিম তীরের ভৌগোলিক চিত্র বদলে দিয়েছে। সামরিক সড়ক নির্মাণ, নতুন সংযোগ পথ তৈরি এবং ছোট বসতিগুলোকে বড় বসতির সাথে যুক্ত করার মাধ্যমে এ পরিবর্তন আনা হয়েছে। সামরিক ফায়ারিং জোনের সীমা পরিবর্তন, সামরিক ঘাঁটিকে বেসামরিক বসতিতে রূপান্তর এবং সামরিক আদেশে নতুন রাস্তা নির্মাণের মাধ্যমে বসতি সম্প্রসারণকে বৈধতা দেয়া হচ্ছে।

বিশেষ করে জর্দান উপত্যকা ও মাসাফের ইয়াত্তা এলাকায় সম্পূর্ণ ফিলিস্তিনি সম্প্রদায় উচ্ছেদ করে সেখানে নতুন অবৈধ বসতি গড়ে তোলার অভিযোগ আনা হয়েছে। কিছু বসতি স্থাপন সরাসরি ইসরাইলি রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমন্বয়ে হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ইসরাইলি দৈনিক হারেটজের বরাতে বলা হয়, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইসরাইলি সামরিক কমান্ড পশ্চিম তীরে ফায়ারিং জোনের সীমা পরিবর্তন করে আটটি আদেশ জারি করেছে, যাতে বিদ্যমান অবৈধ বসতিগুলো বৈধতা পায় এবং নতুন সম্প্রসারণ সম্ভব হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে “নিরাপত্তা প্রয়োজন” দেখিয়ে ১৪০টি সামরিক দখল আদেশ জারি করা হয়েছে, যার ৮১ শতাংশই অবৈধ বসতি ও বসতি চৌকির জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। ফিলিস্তিনি পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ পশ্চিম তীরে ৬৪৫টি অবৈধ ইসরাইলি বসতি ও সামরিক স্থাপনা ছিল। সেখানে প্রায় ৭ লাখ ৭৮ হাজার ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারী বসবাস করছে।

হেবরন ও জেরুসালেমে হামলা

অধিকৃত পশ্চিম তীরের হেবরনের পুরোনো শহর এবং পূর্ব জেরুসালেমে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ও দোকানে হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীরা। হামলার সময় ইসরাইলি সেনাবাহিনী তাদের নিরাপত্তা দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খবর আনাদোলু এজেন্সির। স্থানীয় সূত্র জানায়, শনিবার হেবরনের পুরনো শহরে ব্যাপকভাবে ইসরাইলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীদের মোতায়েন করা হয়। ফিলিস্তিনিদের চলাচল সীমিত করা হয় এবং কয়েকজনকে আটক করা হয়। দোকানপাট বন্ধ করে দেয়া হয় এবং কিছু বসতি স্থাপনকারী পুরনো বাড়ির ছাদে উঠে অবস্থান নেয়। মানবাধিকারকর্মী আরেফ জাবের জানান, শহরের কেন্দ্রে এক ফিলিস্তিনিকে ইসরাইলি সেনারা মারধর ও নির্যাতন করে পরে ছেড়ে দেয়। ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে, হেবরনের দক্ষিণে ওয়াদি আল-রাখিম এলাকায় বসতি স্থাপনকারীরা কৃষিজমিতে পশু ছেড়ে দেয় এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালায়। এতে এক কৃষক আহত হন। অন্য দিকে পূর্ব জেরুসালেমের পুরনো শহরের আল-ওয়াদ সড়কে ফিলিস্তিনি মালিকানাধীন দোকানে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে বসতি স্থাপনকারীরা। জেরুসালেম গভর্নরেটের তথ্য দফতর জানায়, হামলার সময় তারা উসকানিমূলক স্লোগান দেয় এবং ইসরাইলি পুলিশ তাদের নিরাপত্তা দেয়। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, শুধু এপ্রিল মাসেই পশ্চিম তীরে ১ হাজার ৬৩৭টি হামলা চালানো হয়েছে, যার মধ্যে ৫৪০টি করেছে বসতি স্থাপনকারীরা। একই সময়ে ২১টি নতুন অবৈধ বসতি স্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে পশ্চিম তীরে ইসরাইলি অভিযান ও বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় অন্তত ১ হাজার ১৫৫ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।