মিজানুর রহমান মানিক কমলনগর (লক্ষ্মীপুর) সংবাদদাতা
লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে খাল পুনর্খনন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঠিকাদার, স্থানীয় যুবদল নেতা ও কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে উপজেলার জারিরদোনা শাখা খাল পুনর্খননে এমন অনিয়ম করা হয়েছে।
অভিযোগ ওঠেছে, এ খাল পুনর্খনন প্রকল্পটিতে প্রায় এক কোটি চার লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও মাত্র ১০ লাখ টাকা চুক্তিতে এক্সক্যাভেটর (ভেকু) দিয়ে কাজটি সম্পন্ন করা হয়। এক্ষেত্রে প্রকল্পের প্রাক্কলনের কোনো শর্তই মানা হয়নি। যে কারণে স্থানীয়দেরর ভাষ্য, এ খাল পুনর্খনন প্রকল্পে পুকুর চুরি নয়, যেন সাগর চুরি হয়েছে।
উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি) সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যে সারা দেশে পুকুর ও খাল উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। এর আওতায় কমলনগর উপজেলার জারিরদোনা শাখা খালের হাজিরহাট মেঘনা সিনেমা হল প্রান্ত থেকে দক্ষিণ দিকে পাঁচ দশমিক ৬৯ কিলোমিটার পুনর্খননের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে সর্বনি¤œ দরদাতা হিসেবে ‘মেসার্স নীলিমা ট্রেডার্স’ নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এক কোটি তিন লাখ ৯৬ হাজার টাকায় প্রকল্পটির কার্যাদেশ পায়। কার্যাদেশে খালটির ওপর অংশে ১৫ মিটার ও নিচের অংশে দুই দশমিক ৫ মিটার প্রস্থ এবং খালটির গভীরে ১০ মিটার খনন করার পাশাপাশি ১৩টি স্পটে রেফারেন্স বেড ব্লক ও ২৬টি টিবিএম নির্মাণের কথা উল্লেখ রয়েছে।
কিন্তু সরেজমিন দেখা যায়, প্রাক্কলন অনুযায়ী খালের গভীরতা ও প্রশস্ততা নিশ্চিত করা হয়নি। কোথাও খালের ভেতরে নালার মতো মাটি কেটে কাজ শেষ দেখানো হয়েছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা নিরসন এবং পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক হওয়ার যে প্রত্যাশা ছিল এলাকাবাসীর, সেই প্রত্যাশা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে। তাছাড়া খাল পুনর্খননের প্রস্থ ও গভীরতা নিশ্চিতকরণ ও শনাক্তকরণের লক্ষ্যে ১৩টি স্পটে রেফারেন্স বেড ব্লক ও ২৬টি টিবিএম নির্মাণের কথা থাকলেও সেগুলোর কোনো অস্তিত্বই নেই।
জানা গেছে, স্থানীয় যুবদলের কয়েকজন নেতা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স নীলিমা ট্রেডার্স’র স্বত্বাধিকারী রামগতি পৌর বিএনপির সহ-সভাপতি অপরূপ দাসের কাছ থেকে মাত্র ২৩ লাখ টাকা দিয়ে কাজটি কিনে নেন। এর পর তারা একজন ভেকু মালিকের সাথে ১০ লাখ টাকায় চুক্তির মাধ্যমে কাজটি নামমাত্র সম্পন্ন করেন। এক্ষেত্রে প্রকল্পের শর্ত অনুযায়ী মোট কাজের অন্তত ৩০ শতাংশ শ্রমিক ব্যবহার করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও কোনো শ্রমিকই ব্যবহার করা হয়নি। এছাড়া খালের দুই পাড়ে গড়ে ওঠা দোকানপাট ও স্থাপনা অপসারণ না করে উল্টো সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে মাঝখান থেকে সীমিত পরিসরে মাটি কেটে খনন কাজ সম্পন্ন দেখানো হয়েছে।
তাদের অভিযোগ, প্রকল্পের নকশা ও প্রাক্কলন অনুযায়ী খালের গভীরতা ও প্রস্থ বজায় রাখা হয়নি। ফলে পর্যাপ্ত মাটি দুই পাড়ে ফেলা সম্ভব হয়নি। এতে খালের গাইডওয়াল ধসে পড়ছে এবং পাড়সংলগ্ন সড়কের বিভিন্ন অংশ ভেঙে যাচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এলাকাবাসীদের ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগে বাস্তবায়নাধীন খাল খনন প্রকল্পটি যেন সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা হয়। এলাকাবাসী যেন এর সুফল ভোগ করতে পারে। তাই, তারা কোটি টাকার এ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগের সত্যতা খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তদন্ত দাবি করছেন। পাশাপাশি এমন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতিকারীদের বিরুদ্ধে যেন যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয় সে দাবিও করেন তারা।
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ হোসেন বলেন, এটি একটি জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রকল্প। কিন্তু দায়সারাভাবে কাজ করে প্রকল্পটির অধিকাংশ অর্থ লোপাট করা হয়েছে। এ যেন সাগর চুরি। ঠিকাদার ও যুবদলের নেতারা অফিসারদের সঙ্গে যোগসাজশ করে এমনটি করেছেন। পুরো বিষয়টি তদন্ত হওয়া উচিত।
পাটারীরহাট ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য শঙ্কর মজুমদার বলেন, এ প্রকল্পের মাধ্যমে এলাকাবাসী সুফল পাওয়ার কথা থাকলেও উল্টোটা হয়েছে। কাজের অনিয়মের কারণে মানুষের দুর্ভোগ আরো বেড়ে গেছে।
জানতে চাইলে হাজিরহাট ইউনিয়ন যুবদল নেতা মো: শরীফুল ইসলাম জানান, নীলিমা ট্রেডার্স থেকে নিয়ে তারা কয়েকজন মিলে কাজটি করেছেন। প্রকল্পের কার্যাদেশ অনুযায়ীই এটি সম্পন্ন করা হয়েছে। এক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম করা হয়নি।
এসব বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স নীলিমা ট্রেডার্স’র স্বত্বাধিকারী রামগতি পৌর বিএনপির সহ-সভাপতি অপরূপ দাস বলেন, নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্পের কাজটি সম্পন্ন হয়েছে। এর বেশি কিছু জানতে হলে আপনারা এলজিইডির ইঞ্জিনিয়ারের সাথে দেখা করেন।
প্রকল্পটির তদারকি কর্মকর্তা এলজিইডির সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আলী ছিদ্দিকী প্রকল্পে কোনো শ্রমিক ব্যবহার না করার কথা স্বীকার করে বলেন, ভেকু মেশিন দিয়ে হলেওতো কাজ করা হয়েছে। আমি কাজটি পরিদর্শনের জন্য দুই দিন গিয়েছি। তখন অন্য সবকিছু ঠিকঠাক ছিল। ইতোমধ্যে প্রকল্পের বরাদ্দকৃত অর্থ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান উত্তোলন করে নিয়েছে। রেফারেন্স বেড ব্লক ও টিবিএম নির্মাণের অস্তিত্ব না থাকার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
এ ব্যাপারে বক্তব্য নেয়ার জন্য উপজেলা প্রকৌশলী আবদুল কাদের মোজাহিদের মোবাইলফোনে কল দেয়া হলে তিনি বলেন, অসুস্থ ছেলের চিকিৎসার জন্য তিনি হাসপাতালে রয়েছেন। পরে তিনি কথা বলবেন।



