ক্রীড়া প্রতিবেদক
বিশ্বকাপ ফুটবলসহ ফিফার সব ধরনের প্রতিযোগিতা বর্জনের ঘোষণা উয়েফার। ইউরোপীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সাথে যোগ দিলো কনকাকাফ ও এএফসি। তাই বিশ্বকাপসহ ফিফার বিভিন্ন ইভেন্ট পরিচালনার জন্য একটি নতুন সংস্থার কাছে প্রায় ২০ শতাংশ অংশীদারিত্ব বিক্রি করার পরিকল্পনা থেকে দ্রুতই পিছু হঠতে বাধ্য হলো ফিফা। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো গতকাল জানিয়ে দিলেন, বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিশ্বকাপের অংশীদারিত্ব বিক্রির পরিকল্পনা বাতিল করেছে তারা। চার দিনের মধ্যেই ব্যাপক বিরোধিতার মুখে ইউটার্ন নিতে বাধ্য হলো ফিফা।
ফিফার পরিকল্পনা ছিল, বিশ্বকাপসহ ফিফার বিভিন্ন ইভেন্ট পরিচালনার জন্য প্রায় ২০ শতাংশ অংশীদারিত্ব বিক্রি করে ৪.২ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত তহবিল সংগ্রহ করা। গত মঙ্গলবার এই প্রস্তাবটি ঘোষণার পরপরই চারপাশ থেকে শুরু হয় বিরোধিতা। ফিফা খেলাটির ‘আত্মা বিক্রি’ করার অভিযোগ তুলে বিশ্বকাপসহ ফিফার সব আসর বর্জনের হুমকি দেয় উয়েফা। এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় কনকাকাফ এবং এএফসিও। ফুটবলকে ধ্বংস করার এই নীল নকশার প্রতিবাদ করে পদত্যাগ করেন ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনোর সিনিয়র উপদেষ্টা কার্লোস করদেইরোও।
উয়েফার ৫৫টি সদস্য রাষ্ট্র গত বৃহস্পতিবার সর্বসম্মতিক্রমে জানায়, প্রস্তাবটি প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত ফিফার সমস্ত টুর্নামেন্ট বর্জন করবে তারা। উত্তর আমেরিকা, মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের ৪১ সদস্যের ফেডারেশন কনকাকাফও এক বৈঠকে প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করে। এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের ৪৭ সদস্যও বিবৃতিতে জানায়, তারা উয়েফা এবং কনকাকাফের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করছে। উয়েফা, কনকাকাফ এবং এএফসির সম্মিলিত জাতীয় সংস্থা ১৪৩টি, যা ফিফার ২১১টি সদস্যের অর্ধেকেরও বেশি। পরিকল্পনাটি কার্যকর হওয়ার জন্য সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের সমর্থনে ভোট দেয়া প্রয়োজন ছিল। কাজেই ভোটের লড়াইয়ে সম্ভাব্য ছবিটি দেখতে পাচ্ছিলেন ইনফান্তিনো।
বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য গোপনে কোটি কোটি ডলারের একটি প্রাইভেট চুক্তির চেষ্টা করছে ফিফা, এমন চুক্তির খবর সর্বপ্রথম ফাঁস করেছিল ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যম দ্য টাইমস। এই খবর ফাঁস হওয়ার পর বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশনে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এতে তড়িঘড়ি করে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয় ফিফা।
ফিফা যুক্তি দিয়েছিল, তাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রমের মাইনরিটি অংশ বিক্রি করে বৈশ্বিক ক্রীড়া উন্নয়নে অর্থায়নের জন্য শত শত কোটি ডলার সংগ্রহ করা যাবে। উয়েফা, কনকাকাফ ও এএফসির বিরোধিতার পরও ফিফার পক্ষ থেকে গত বৃহস্পতিবার জোর দিয়েই বলা হয়েছিল, তারা এই প্রস্তাবনা নিয়ে আলোচনা প্রক্রিয়া এগিয়ে নেবে। প্রস্তাবটিকে ভুলভাবে উপস্থাপনের জন্য গণমাধ্যমকে অভিযুক্ত করেছিল তারা। ইনফান্তিনো সদস্য সংগঠনগুলোকে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন যে, ১৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ফিফার প্রস্তাবে রাজি হলে তারা প্রত্যেকে চার কোটির ডলার করে পাবে। কিন্তু সেই আহ্বানে সাড়া না পেয়ে এখন ঐক্যের ডাক দিয়ে এক বিবৃতি দেন ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনো।
ইনফান্তিনো বলেন, ‘আগামী দিন ও সপ্তাহগুলোতে আমাদের খেলার প্রতি অভিন্ন আগ্রহের চেতনায় সব আগ্রহী পক্ষকে পুনরায় একত্রিত করাই আমার উদ্দেশ্য, এর লক্ষ্য হলো সর্বত্র ফুটবলের প্রসার অব্যাহত রাখা, বিশেষ করে সেই দেশগুলোতে, যেখানে আমাদের সমর্থন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।’
তিনি যোগ করেন, ‘সব মতামত মনোযোগ দিয়ে শোনার পর এটি স্পষ্ট হয়েছে যে, এই প্রকল্পটি এমন ধরনের বিভেদ তৈরি করেছে, যা সমর্থনের মাত্রা নির্বিশেষে, প্রথমত নির্ধারিত লক্ষ্যের আর স্বার্থে নেই। আমাদের উদ্দেশ্য সর্বদা ছিল এবং থাকবে- ঐক্যবদ্ধ করা এবং উন্নতি করা। ফলস্বরূপ, এই প্রস্তাবটি আর এগোবে না।’
এদিকে বিশ্বকাপের স্বত্ব বিক্রির পরিকল্পনা বাতিল করায় ফিফাকে ধন্যবাদ জানিয়েছে এএফসি। বিশ্ব ফুটবল নিয়ে নতুন যেকোনো উদ্যোগের ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতার সাথে আলোচনা করা উচিত বলে মনে করেন এএফসি সভাপতি শেখ সালমান বিন ইব্রাহিম আল-খালিফা।
এএফসির ওয়েবসাইটে পোস্ট করা এক চিঠিতে আল-খালিফা প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন, ‘বিশ্ব ফুটবলে প্রভাব ফেলতে পারে এমন যেকোনো উদ্যোগ যথাসময়ে, স্বচ্ছ ও অর্থবহ উপায়ে সব কনফেডারেশন, ফিফা কাউন্সিল, সদস্য সংস্থাগুলো এবং অন্যান্য অংশীজনের সামনে উপস্থাপন ও আলোচনা করা হবে। বিশ্ব ফুটবলের ভবিষ্যৎ সবসময় যথাযথ পরামর্শ, সম্মিলিত আলোচনা এবং আমাদের খেলার প্রতিষ্ঠিত প্রশাসনিক কাঠামোর প্রতি শ্রদ্ধার ভিত্তিতেই নির্ধারিত হওয়া উচিত।’



