যুক্তরাষ্ট্রের নিউ অরলিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্সের অধ্যাপক ও মফেট চেয়ার-এএওআইএফআইয়ের নৈতিকতা ও গভর্ন্যান্স বোর্ডের সদস্য অধ্যাপক এম কবির হাসান ইসলামী ব্যাংক নিয়ে সাম্প্রতিক সঙ্কট প্রসঙ্গে বলেছেন, আমার বিশ্লেষণে সবচেয়ে বড় সঙ্কট ইসলামী অর্থায়নের ধারণায় নয়; বরং রাজনৈতিক অর্থনীতিতে। মালিকানা দখল, রাজনৈতিক প্রভাব, নিয়ন্ত্রক সহনশীলতা, বোর্ড সুশাসনের দুর্বলতা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যকর স্বাধীনতার অভাবই মূল সমস্যা।
ইসলামী অর্থায়ন ব্যাংকিং বিষয়ে আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতনামা বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত আমেরিকান এই বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং নিয়ে সৃষ্ট বিভিন্ন সঙ্কট নিয়ে নয়া দিগন্তের সাথে কথা বলেছেন। নিচে তার সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত-
প্রশ্ন : আপনি বলছেন বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংকিং খাতের বর্তমান সঙ্কটকে শুধু ব্যাংকিং ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র বোঝা যাবে না। কেন?
এম কবির হাসান : কারণ এখানে দু’টি সমান্তরাল বাস্তবতা কাজ করেছে। প্রথমত, দীর্ঘদিন ধরে ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঘিরে একটি আদর্শিক সন্দেহের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, বাস্তবে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, মালিকানা দখল, নিয়ন্ত্রক দুর্বলতা ও সুশাসনের অবক্ষয় ঘটেছে। এই দুই ধারাকে একসাথে না দেখলে সঙ্কটের প্রকৃত কারণ বোঝা যাবে না।
প্রশ্ন : আপনি অধ্যাপক আবুল বারকাতের ‘মৌলবাদী অর্থনীতি’ ধারণার সমালোচনা করেছেন। আপনার আপত্তি কোথায়?
এম কবির হাসান : আমার আপত্তি গবেষণার অধিকারের বিরুদ্ধে নয়। উগ্রবাদ, সন্ত্রাসে অর্থায়ন বা ধর্মীয় পরিচয়ের অপব্যবহার অবশ্যই গবেষণার বিষয়। কিন্তু সমস্যা তখন শুরু হয়, যখন ইসলামী ব্যাংক, বিমা, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এনজিও, ট্রাস্ট কিংবা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে একত্রে একটি ‘মৌলবাদী অর্থনীতি’র কাঠামোর মধ্যে ফেলা হয়। এতে বৈধ অর্থনৈতিক কার্যক্রম, ধর্মীয় অনুপ্রেরণায় গড়ে ওঠা সামাজিক উদ্যোগ এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মধ্যে পার্থক্য অস্পষ্ট হয়ে যায়।
প্রশ্ন : তাহলে কি আপনি বলছেন ইসলামী ব্যাংকিং নিয়ে কোনো সমালোচনা করা যাবে না?
এম কবির হাসান : মোটেও তা বলছি না। বরং আমি বলছি, সমালোচনা হতে হবে তথ্যভিত্তিক। যদি কোনো ব্যাংকে মানিলন্ডারিং হয়, স্বজনপ্রীতি হয়, অনিয়ম হয় বা সন্ত্রাসে অর্থায়নের প্রমাণ থাকে, তাহলে অবশ্যই তদন্ত ও শাস্তি হবে। কিন্তু শুধু ‘ইসলামী’ পরিচয়ের কারণে কোনো প্রতিষ্ঠানকে সন্দেহের চোখে দেখা ন্যায়সঙ্গত নয়।
প্রশ্ন : ‘মৌলবাদী অর্থনীতি’ ধারণার রাজনৈতিক প্রভাব কী হতে পারে?
এম কবির হাসান : বাংলাদেশে রাজনৈতিক মেরুকরণ অনেক গভীর। এমন পরিস্থিতিতে কোনো প্রতিষ্ঠানকে আদর্শিকভাবে সন্দেহজনক হিসেবে উপস্থাপন করা হলে তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপকে জনস্বার্থ বা সংস্কারের নামে বৈধতা দেয়া সহজ হয়ে যায়। এতে প্রকৃত সংস্কারের পরিবর্তে রাজনৈতিক সুবিধাবাদ প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
প্রশ্ন : ইসলামী ব্যাংকিংকে আপনি কীভাবে সংজ্ঞায়িত করবেন?
এম কবির হাসান : ইসলামী ব্যাংকিং হলো একটি নিয়ন্ত্রিত আর্থিক ব্যবস্থা, যার ভিত্তি রিবা বা সুদ পরিহার, সম্পদভিত্তিক অর্থায়ন, ঝুঁকি বণ্টন, নৈতিক বিনিয়োগ এবং শরিয়াহ তত্ত্বাবধান। এটি প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির একটি সম্পূরক ধারা হিসেবে বিশ্বের বহু দেশে সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
প্রশ্ন : তাহলে বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় সঙ্কট কোথায়?
এম কবির হাসান : আমার বিশ্লেষণে সবচেয়ে বড় সঙ্কট ইসলামী অর্থায়নের ধারণায় নয়; বরং রাজনৈতিক অর্থনীতিতে। মালিকানা দখল, রাজনৈতিক প্রভাব, নিয়ন্ত্রক সহনশীলতা, বোর্ড সুশাসনের দুর্বলতা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যকর স্বাধীনতার অভাবই মূল সমস্যা।
প্রশ্ন : ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের ঘটনাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
এম কবির হাসান : এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। একসময় ব্যাংকটি দেশের অন্যতম শক্তিশালী আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এর মালিকানা ও পরিচালন কাঠামোতে নাটকীয় পরিবর্তন আসে। বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখা গেছে, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হতে শুরু করে। এটি ইসলামী ব্যাংকিংয়ের ব্যর্থতা নয়; বরং সুশাসনের ব্যর্থতা।
প্রশ্ন : এখানে কি একটি বিদ্রুপাত্মক বাস্তবতা আছে?
এম কবির হাসান : অবশ্যই। যেসব প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘদিন আদর্শিকভাবে সন্দেহের চোখে দেখা হয়েছে, সেগুলোকে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে শক্তিশালী করা হয়নি। বরং পরবর্তীতে রাজনৈতিকভাবে সংযুক্ত গোষ্ঠীর হাতে নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে। ফলে যে ঝুঁকির কথা বলা হয়েছিল, বাস্তবে তা এসেছে অন্য উৎস থেকে।
প্রশ্ন : আপনি ‘মৌলবাদী অর্থনীতি’র পরিবর্তে ‘রাজনৈতিক অর্থায়ন’ কাঠামোর কথা বলেছেন। কেন?
এম কবির হাসান : কারণ বাংলাদেশের ব্যাংকিং সঙ্কট ব্যাখ্যা করতে রাজনৈতিক অর্থায়নের ধারণা অনেক বেশি কার্যকর। এটি প্রশ্ন করে- রাজনৈতিক ক্ষমতা কীভাবে ব্যাংকের মালিকানা, ঋণ বিতরণ, বোর্ড গঠন, নিয়ন্ত্রক সিদ্ধান্ত, ঋণখেলাপি সংস্কৃতি ও পুঁজি পাচারকে প্রভাবিত করে। এই কাঠামো ইসলামী ও প্রচলিত- উভয় ধরনের ব্যাংকের সঙ্কট ব্যাখ্যা করতে পারে।
প্রশ্ন : শরিয়াহ বোর্ড কি ইসলামী ব্যাংককে সুরক্ষা দিতে যথেষ্ট?
এম কবির হাসান : না। শরিয়াহ সুশাসন গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু একে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা যাবে না। যদি বোর্ড রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়, যদি অডিট স্বাধীন না হয়, যদি বড় ঋণ মালিক-ঘনিষ্ঠ প্রতিষ্ঠানে যায়, তাহলে শুধু শরিয়াহ বোর্ড কোনো প্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করতে পারবে না। শরিয়াহ সুশাসনের পাশাপাশি করপোরেট গভর্ন্যান্স, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং নিয়ন্ত্রক জবাবদিহি দরকার।
প্রশ্ন : সংস্কারের জন্য আপনার প্রথম সুপারিশ কী?
এম কবির হাসান : একটি স্বতন্ত্র ইসলামী ব্যাংকিং আইন প্রণয়ন। বর্তমানে বহু ট্রিলিয়ন টাকার এই খাত মূলত সার্কুলারনির্ভর ব্যবস্থায় চলছে। অথচ চুক্তি, বিনিয়োগ, আমানত, শরিয়াহ তদারকি এবং গ্রাহকের অধিকার নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ আইনি কাঠামো থাকা উচিত।
প্রশ্ন : শরিয়াহ সুশাসনকে কীভাবে শক্তিশালী করা যায়?
এম কবির হাসান : শরিয়াহ বোর্ডকে স্বাধীনতা দিতে হবে। তাদের লেনদেনসংক্রান্ত তথ্যের পূর্ণ প্রবেশাধিকার থাকতে হবে। মালিকপক্ষের হস্তক্ষেপ থেকে সুরক্ষা দিতে হবে। শরিয়াহ লঙ্ঘন যদি গ্রাহকের আর্থিক অধিকার ক্ষুণœ করে, তাহলে সেটিকে শুধু ধর্মীয় বিষয় হিসেবে নয়, নিয়ন্ত্রক অপরাধ হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে।
প্রশ্ন : মালিকানা ও বোর্ড সুশাসনের ক্ষেত্রে কী পরিবর্তন দরকার?
এম কবির হাসান : কোনো ব্যাংকই কোনো ব্যবসায়িক গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের ব্যক্তিগত কোষাগারে পরিণত হতে পারে না। প্রকৃত সুবিধাভোগী মালিকানা প্রকাশ বাধ্যতামূলক করতে হবে। স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ দেয়া, অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি গোপন করা এবং ঋণ পুঞ্জীভবনের ওপর কঠোর নজরদারি দরকার।
প্রশ্ন : ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য বিশেষ আর্থিক অবকাঠামো কি প্রয়োজন?
এম কবির হাসান : অবশ্যই। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুকুক, ইসলামী ট্রেজারি বিল, শরিয়াহসম্মত সরকারি সিকিউরিটিজ এবং আন্তঃব্যাংক তারল্য ব্যবস্থার মতো উপকরণ ছাড়া ইসলামী ব্যাংকগুলো প্রতিযোগিতায় কাঠামোগতভাবে পিছিয়ে থাকবে।
প্রশ্ন : বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
এম কবির হাসান : সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারে, তাহলে কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না। বোর্ড অনুমোদন, ফিট অ্যান্ড প্রপার টেস্ট, ঋণ শ্রেণীকরণ, বৃহৎ ঋণ ঝুঁকি-সবক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
প্রশ্ন : আপনার মতে বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় শিক্ষা কী?
এম কবির হাসান : শিক্ষা হলো- ধর্মীয় পরিচয় নয়, সুশাসনই মূল বিষয়। ইসলামী পরিচয় কোনো অপরাধের প্রমাণ নয়, আবার দায়মুক্তির লাইসেন্সও নয়। একটি ব্যাংক ইসলামী না প্রচলিত-সেটি গৌণ প্রশ্ন। মূল প্রশ্ন হলো, প্রতিষ্ঠানটি কতটা স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং আইনসম্মতভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
প্রশ্ন : শেষ কথা?
এম কবির হাসান : বাংলাদেশের প্রয়োজন আদর্শিক বিতর্কের বাইরে গিয়ে একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা। ইসলামী ও প্রচলিত-উভয় ধরনের ব্যাংকই যেন সমান আইনি কাঠামো, স্বাধীন তদারকি এবং কার্যকর জবাবদিহির আওতায় পরিচালিত হয়। সেটিই হবে প্রকৃত ব্যাংকিং সংস্কার এবং আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারের সবচেয়ে কার্যকর পথ।



