গাজাগামী ফোটিলা কর্মীদের অবমাননায় বিশ্বজুড়ে ক্ষোভ

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

গাজা অভিমুখী মানবিক ত্রাণবহর ‘গ্লোবাল সুমুদ ফোটিলা’-এর কর্মীদের আটক এবং তাদের প্রতি অবমাননাকর আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বিশ্বের একাধিক দেশ।

ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের পোস্ট করা একটি ভিডিওর জেরে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ব্রিটেন, ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, আয়ারল্যান্ড, কানাডা, নেদারল্যান্ডস ও পোল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশ ােভ প্রকাশ করে। কানাডা, বেলজিয়াম, স্পেন ও ফ্রান্স নিজ নিজ দেশে নিযুক্ত ইসরাইলি রাষ্ট্রদূতদের তলব করেছে। এ ছাড়া পর্তুগাল ও তুরস্কও এ ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে অবিলম্বে আটকদের মুক্তির দাবি করেছে। ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট অ্যান্তোনিও কস্তা ঘটনাকে ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ বলে অবিলম্বে কর্মীদের মুক্তি দাবি করেছেন। ব্রিটেন ইসরাইলি কূটনীতিককে তলব করেছে। ইতালি ও ফ্রান্সও ঘটনার যথাযথ ব্যাখ্যা চেয়েছে। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেছেন, ‘নিজেদের নাগরিকদের সাথে এমন আচরণ মেনে নেয়া হবে না।’

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ঘটনাকে ‘জঘন্য’ বলে মন্তব্য করেছেন। মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক নৌসীমায় গাজা অভিমুখী ওই ত্রাণবহরের ৫০টি নৌযান জব্দ করে ইসরাইলি বাহিনী। তুরস্কের মারমারিস থেকে যাত্রা করা এই বহরে ৪৪টি দেশের ৪২৮ জন অধিকারকর্মী ছিলেন। আটকের পর ইসরাইলি মন্ত্রী বেন-গভির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। ‘ইসরাইলে স্বাগতম’ ক্যাপশন যুক্ত ওই ভিডিওতে দেখা যায়, আটক কর্মীদের হাত পেছনে বেঁধে হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করা হয়েছে। এ ঘটনার পরপরই গতকাল তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায় পশ্চিমা দেশগুলো। স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে ম্যানুয়েল আলবারেস কর্মীদের প্রতি এমন আচরণকে ‘দানবীয়’, ‘অমানবিক’ এবং ‘লজ্জাজনক’ আখ্যা দিয়ে ইসরাইলি চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সকে তলব করেন। আলবারেস জানান, স্পেনের নাগরিকদের সাথে হওয়া এমন আচরণ সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং ইসরাইলকে এর জন্য জনসম্মুখে মা চাইতে হবে। তিনি আরো জানান, ভিডিওতে উপস্থিত ইসরাইলি মন্ত্রী বেন-গভিরের ওপর স্পেন আগেই নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে এবং শিগগিরই পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়ন একই পদপে নিতে যাচ্ছে। ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল বারো এই ঘটনায় ােভ প্রকাশ করে ইসরাইলি রাষ্ট্রদূতকে তলবের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি জানান, ফোটিলার যাত্রীদের প্রতি বেন-গভিরের আচরণ একেবারেই অগ্রহণযোগ্য এবং খোদ ইসরাইলি সরকারের অনেক মন্ত্রীও এর নিন্দা করেছেন। আটকদের মধ্যে থাকা ফরাসি নাগরিকদের দ্রুত মুক্তির দাবিও জানান তিনি। বেলজিয়ামের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ম্যাক্সিম প্রিভোট ঘটনাটিকে মানবিক মর্যাদার সবচেয়ে মৌলিক মানদণ্ডের লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এক্সে দেয়া পোস্টে প্রিভোট বলেন, ‘ফোটিলার কর্মীদের সাথে করা আচরণের যেসব ছবি ছড়িয়ে পড়েছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।’

কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনিতা আনন্দ ইসরাইলি রাষ্ট্রদূতকে তলব করে একে বেসামরিক নাগরিকদের সাথে ‘অমানবিক আচরণ’ বলে উল্লেখ করেন। অনিতা আনন্দ বলেন, ‘আমরা যা দেখেছি তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।’ তিনি জানান, কানাডা এই ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে এবং বেন-গভিরের কানাডায় প্রবেশে আগে থেকেই নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

এ দিকে পর্তুগালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাওলো রেঞ্জেল বেন-গভিরের আচরণকে অসহনীয় আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘এটি মানবিক মর্যাদার চরম অবমাননা।’ তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে ইসরাইলি মন্ত্রীর মৌখিক ও শারীরিক সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে আটকদের মুক্তির জন্য অন্যান্য দেশের সাথে সমন্বয় করে কূটনৈতিক তৎপরতা চালানোর কথা নিশ্চিত করেছে।

২০০৭ সাল থেকে গাজা উপত্যকায় ইসরাইলের কঠোর অবরোধ চলছে। অবরুদ্ধ এই উপত্যকায় ত্রাণ পৌঁছে দেয়ার এটি ছিল নতুন একটি প্রচেষ্টা। এর আগে গত এপ্রিলে গ্রিসের ক্রিট দ্বীপের কাছে আন্তর্জাতিক জলসীমায় আরেকটি ফোটিলায় হামলা চালিয়েছিল ইসরাইলি বাহিনী।

ফোটিলা সংগঠকদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা

গাজায় ইসরাইলের অবরোধ ভেঙে ফিলিস্তিনিদের জন্য মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর ল্েয পরিচালিত ‘গ্লোবাল সুমুদ ফোটিলা’ বা ত্রাণ নৌবহরের সাথে যুক্ত বেশ কয়েকজন অধিকার কর্মীকে নিষেধাজ্ঞার কালো তালিকাভুক্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মঙ্গলবার মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় এই নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে, যার মধ্যে ইউরোপে অবস্থানরত কয়েকজন অধিকার কর্মীও রয়েছেন। এক বিবৃতিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর জানিয়েছে, ‘আজকের এই নিষেধাজ্ঞা হামাসকে সহায়তাকারী তিনটি পকে ল্য করে আরোপ করা হয়েছে : প্রথমত, গাজায় পৌঁছানোর চেষ্টা করা হামাস সমর্থিত একটি ত্রাণ বহরের আয়োজকরা, দ্বিতীয়ত, হামাসপন্থী মুসলিম ব্রাদারহুড নেটওয়ার্কের সক্রিয় কর্মী, যারা সহিংস সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সহায়তা করে এবং তৃতীয়ত, পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অব প্যালেস্টাইনের (পিএফএলপি) ফ্রন্ট সংগঠন সামিদুনের সমন্বয়ক।’

গাজায় ইসরাইলি হামলা অব্যাহত

অবরুদ্ধ গাজায় ইসরাইলি হামলায় কমপে চার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। গতকাল সংবাদ সংস্থা ওয়াফার বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে আলজাজিরা। উত্তর গাজার বেইত লাহিয়ায় একদল ফিলিস্তিনির ওপর একটি ইসরাইলি ড্রোন হামলায় ১৩ বছর বয়সী এক ফিলিস্তিনি শিশু নিহত এবং আরো অনেকে আহত হয়েছেন। হাসপাতাল সূত্র জানায়, বেইত লাহিয়ার মাশরু এলাকায় জড়ো হওয়া বেসামরিক মানুষের ওপর ইসরাইলি ড্রোন হামলা চালানো হলে কুদ দুয়েইক নামে ওই শিশুটি নিহত হয়। একই সময়ে মধ্য গাজার মাগাজি শরণার্থী শিবিরে একটি বাড়িতে বিমান হামলা চালায় ইসরাইলি বাহিনী। এতে বাড়িটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায় এবং আগুন ছড়িয়ে আশপাশের ঘরবাড়িও তিগ্রস্ত হয়। আহতদের আল-আকসা শহীদ হাসপাতাল নেয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছে চিকিৎসকরা। এ ছাড়া বুরেইজ শরণার্থী শিবিরে ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে আরো একজন গুরুতর আহত হন। অন্য দিকে দণি গাজার খান ইউনুসের পূর্বাঞ্চল কারারায় গুলিতে এক ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। রাফাহর মাওয়াসি এলাকাতেও গুলিতে নিহত হয়েছেন আরো দুইজন। ফিলিস্তিনি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে মানবিক সহায়তাবাহী ট্রাকের চালকরাও ছিলেন। ওয়াফা জানিয়েছে, উত্তর গাজার জাবালিয়া এলাকায় হালাওয়া শরণার্থী শিবিরের কাছে একটি ইসরাইলি ড্রোন বোমা ফেললে আরেকজন ফিলিস্তিনি আহত হন। ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও প্রায় প্রতিদিনই হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইলি বাহিনী। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির পর থেকে এখন পর্যন্ত ৮৮১ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ২ হাজার ৬২১ জন আহত হয়েছেন। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি হামলায় মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭২ হাজার ৭৭৩ জনে। আহত হয়েছেন এক লাখ ৭২ হাজার ৭২৩ জন।

জেরুসালেমে ত্রাণ সংস্থার স্থাপনা দখলে জাতিসঙ্ঘের নিন্দা

পূর্ব জেরুসালেমে জাতিসঙ্ঘের ত্রাণ সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএর শেখ জাররাহ কম্পাউন্ডে সামরিক স্থাপনা নির্মাণের ইসরাইলি সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন দুজারিক এক বিবৃতিতে বলেন, জানুয়ারিতে জব্দ করা ওই কম্পাউন্ডে সামরিক স্থাপনা তৈরি ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ এবং এটি জাতিসঙ্ঘের স্থাপনার অখণ্ডতা লঙ্ঘন করছে। বিবৃতিতে বলা হয়, ইউএনআরডব্লিউএ জাতিসঙ্ঘের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং শেখ জাররাহ কম্পাউন্ড এখনো জাতিসঙ্ঘের সম্পত্তি। সেখানে ইসরাইলি পদপে আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসঙ্ঘের বিশেষ অধিকার লঙ্ঘন করছে। গুতেরেস ইসরাইলকে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে অবিলম্বে কম্পাউন্ড জাতিসঙ্ঘের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সাথে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের রায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলের উপস্থিতি অবৈধ এবং দ্রুত তা বন্ধ করা উচিত।