পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক ও বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সুপরিচিত বিশেষজ্ঞ বিডি রহমতউল্লাহ বলেছেন সরকারের উচিত অতি দ্রুত সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া। একই সাথে তিনি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে জাতীয় সংলাপের আহ্বান জানিয়ে বলেন, এ খাতে যেভাবে ভর্তুকির নামে লুটপাট চলছে তা আমাদের অস্তিত্ব বিপন্ন করে তুলবে। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সঙ্কট থেকে জাতির মুক্তি পাওয়া বেশ কঠিন কারণ এখানে যারা দায়িত্বে রয়েছেন পাওয়ার সেক্টরে, লোডশেডিং বা মহাসঙ্কট এটার সলিউশনটা কি তার জন্য সরকার কি করছে তা পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে না। ইমিডিয়েট সলিউশনটা কি, কি করতে পারবে তা জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মাথায় যা আছে তার চেয়ে বেশি থাকার কথা মন্ত্রীদের মাথায় কারণ ওনারা পলিসি লেভেলে রয়েছেন। সুতরাং আগামী দুই বছর এ খাতে সঙ্কট থাকলে কী হবে, ভবিষ্যতে কী হবে, যুদ্ধ বাড়লে কী হবে, অল অলটারনেটিভ শুড বি ডেসক্রাইবড। নাইসলি। ওনারা নির্দেশনা দিলে আমরা চিন্তা করে বাছাই করতে পারব। এখন কেউ কোনো কথা বলছেন না। বলা হচ্ছে ২০৩১ সালের মধ্যে আমরা ৫ হাজার মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন করব। ইট ইজ এ ভোগাস স্টেটমেন্ট। পলিটিক্যালি লিডাররা যেটা দেয়। ৫ বছর পর ওনারা ক্ষমতায় থাকবেন না। ক্ষমতার মেয়াদ শেষ হলে তখন কিভাবে ৫ হাজার ১০ হাজার মেগাওয়াট সোলার হবে এর কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা রোড ম্যাপ দেখছি না।
নয়া দিগন্তকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বিডি রহমতউল্লাহ বলেন, আজকে যে বিদ্যুতের ক্রাইসিস, ফুয়েল নাই দেশে, গ্যাস নাই। গ্যাস কেনো উঠাতে পারছি না, আওয়ামী লীগকে ফ্যাসিস্ট, করাপ্ট বলছি, ডেফিনিটলি ঠিক আছে, তো এখন কেনো গ্যাস উত্তোলনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। তার মানে কী গ্যাস উত্তোলনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না যে কারণে আওয়ামী লীগ চায়নি? আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার জন্যে ভারতকে তুষ্ট করতে গ্যাস তোলেনি, মিয়ানমার তো গ্যাস উত্তোলন করছে? ভারত হাসিনাকে ১২ নম্বর ব্লক থেকে গ্যাস তুলতে নিষেধ করেছিল, অথচ ওই ব্লক থেকে গ্যাস তুললে এই অঞ্চলে আমরা সবচেয়ে বেশি গ্যাস পেতাম। মিয়ানমার ঠিকই গ্যাস তুলে চীন ও ভারতের সাথে ব্যবসা করছে। তো হাসিনার পথই যদি এখন অনুসরণ করা হয় তাহলে হাসিনাকে আমরা সরালাম কেনো?
নয়া দিগন্ত : ব্যাপারটা এমন রয়ে গেল কি না হাসিনা খারাপ কিন্তু তার পদ্ধতিগুলো ভাল?
বিডি রহমতউল্লাহ : না, হাসিনা একটাকার জিনিস তিন টাকায় কিনে দুই টাকা চুরি করেছে। আমাদের সে পয়সা জনগণের করের টাকায় পরিশোধ করতে হচ্ছে। আমরা চোখে দেখছি মেট্রোরেল, চোখে দেখছি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র হচ্ছে, অনেক কিছু হয়েছে, সেই হওয়াটা যে আমাদের কষ্টের বিনিময়ে, ঘামের বিনিময়ে সেটা তো আমাদের ফিল করতে হবে। অনুভব করলে দেখবেন যে মূল্যের বিনিময়, কস্ট অ্যানালাইসিস করলে এসব উন্নয়নের জন্য কতটা মূল্য পরিশোধ করতে হয়েছে, করতে হচ্ছে, লুটপাট চলছে এবং এ কারণেই হাসিনার উন্নয়ন সহ্য হচ্ছে না বলে তাকে সরানো হলো। হাসিনা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র করেছে পার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হবে ৫০ কোটি টাকা যে বিদ্যুৎ বিশ্বের অন্যান্য দেশে উৎপাদন হচ্ছে সর্বোচ্চ ২৭ কোটিতে। রূপপুরের মতো এ ধরনের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র করতে অন্য দেশে ৬ বিলিয়ন ডলার লাগলেও বাংলাদেশে ১২ বিলিয়ন ডলার খরচ ছাড়িয়েছে। প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা লুট হয়েছে একটি প্রকল্পেই। হাসিনার এ ধরনের উন্নয়নের জন্যই আজ দেশের অর্থনীতির এ অবস্থা। পাশাপাশি নেপাল, ভুটান, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর কোথায় চলে গিয়েছে কারণ তারা সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে আগাতে পেরেছে।
নয়া দিগন্ত : জালানি যে কৌশলগত পণ্য আমরা কি তা অনুধাবন করতে পারছি না, জ্বালানির ওপর পরনির্ভরতা বাড়ছেই।
বিডি রহমতউল্লাহ : এটা হচ্ছে লুটপাটের জন্য। বাইরের দেশ থেকে যখনি কেউ এসে ঋণ দিয়ে বলছে তোমাকে ৩০০ টাকা দেবো আমাকে ৫০০ টাকার কাজটা দিয়ে দাও, ব্যাস পাগল হয়ে যাচ্ছে। আমাদের সাথে অন্য দেশের এই একটা বেসিক ডিফারেন্স লক্ষ্য করার মতো। করাপশন অবশ্য পাকিস্তানেও আছে, ইন্ডিয়াতেও আছে কিন্তু আমাদেরটা মহা একটা করাপশন। এখন নতুন নির্বাচিত সরকার করাপশনের ছোঁয়া পেলে তো মুষ্কিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অনুকরণীয় পথে হাঁটছেন। কিন্তু মন্ত্রীদের ব্যর্থতার দায়ভার ওনাকেই নিতে হবে, ব্যর্থতা থাকলে মন্ত্রীদেরও সরাতে হবে। ১৮০ দিনে শাস্তির জন্য হয়তো ওয়েট করতে হবে। রিভিউ করবেন হয়তো।
নয়া দিগন্ত : এই বাংলাদেশেই তো ছোট বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নিজস্ব অর্থায়নে গড়ে উঠছিল, চাহিদার সাথে তালমিলিয়ে ধারাবাহিকভাবে, সেখান থেকে বিদ্যুৎ খাত বলুন, জালানি খাত বলুন, কিভাবে লুটপাটতন্ত্রে চলে গেল, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা পর্যন্ত বলতে বাধ্য হচ্ছেন, ‘বিদ্যুৎ জ্বালানি খাতের কাঠামোগত ও ব্যবস্থাগত বিষয়টি বিষধর চক্র থেকে বের করে আনা সম্ভব হচ্ছে না বলে, জনগণের করের অর্থ দিয়ে সরকার বাধ্য হচ্ছে ভর্তুকি দিতে’...
বিডি রহমতউল্লাহ : বিদ্যুৎ খাতে মেজর চেঞ্জটা করেছে হাসিনা। ২০০৮ সালে ইলেকশনের পর হাসিনা কয়েক দিন ভারত ছিলেন। তারপর বড় ধরনের লুটপাটতন্ত্রে চলে যায় বিদ্যুৎ খাত। সঙ্গদোষে সর্বনাশ। অনেক দিন আগে আওয়ামী লীগের নেতাদের তিনি বলেছিলেন, ক্ষমতা না ছাড়ার জন্য পথ পেয়ে গেছি। নেতারা তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কি পথ আপা? আপা তাদের বললেন, প্রথম পথ হচ্ছে আর্মিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, দ্বিতীয়ত রাজনৈতিক নেতাদের টাকা দিয়ে কিনতে হবে এবং তৃতীয়ত ভারতকে সন্তুষ্ট করতে হবে। ভারতকে সন্তুষ্ট করতে পারলে সে ক্ষমতায় থাকবে কারণ ভারতের কাজ হচ্ছে আর্মিদের মধ্যে একটি গ্রুপকে তৈরি করা, পলিটিক্যাল লিডারদের একটা গ্রুপ তৈরি, আজো ভারত সেই কাজ করে যাচ্ছে।
নয়া দিগন্ত : তো আমরা বিদ্যুতের জন্য অনেকটা ভারতের ওপর নির্ভরশীল আবার এলএনজির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লে তো বঙ্গোপসাগরে তো তেলগ্যাস অনুসন্ধান শুরুই করি নাই, আমাদের বিদ্যুৎ জালানির ভবিষ্যৎটা কি?
বিডি রহমত উল্লাহ : না শুরু করি নাই। বর্তমান সরকার যদি ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত নির্ভরশীল রেখে আগাতে চায় তাহলে তো আমরা দুর্বল থাকি এটা ভারতও চায় আমেরিকাও চায়। শঙ্কা আছে বর্তমান সরকার আওয়ামী লীগের পথ অনুসরণ করে কী না। কারণ আসল কাজ তো হচ্ছে না।
নয়া দিগন্ত : বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ তো চাপ সৃষ্টি করছে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি না দেয়ার জন্য, কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও এ খাতে ভর্তুকির ৯১ শতাংশ জনগণের করের টাকা থেকে চলে যাচ্ছে
বিডি রহমতউল্লাহ : দুর্নীতিবাজকে যে কেউ সহজেই চাপ দিতে পারে। আমাদের দেশে সৎলোকের বেশ ঘাটতি রয়েছে।
নয়া দিগন্ত : বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে কাঠামোগত পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর সিপিডির অনুষ্ঠানে বলেছেন, জালানি খাত পয়জনাস ডেভিলস নেটওয়ার্কের কব্জায়...
বিডি রহমতউল্লাহ : আমি সিরিয়াসলি মনে করি একটা জাতীয় সংলাপ খুবই জরুরি। বৈষম্যবিরোধীরা কিন্তু মাঝে মধ্যে বলে আমাদের আরেকটা বিপ্লব দরকার, নতুন সরকার আনতে হবে ইত্যাদি।
নয়া দিগন্ত : এ ধরনের জাতীয় সংলাপে জালানি বিশেষজ্ঞরা ছাড়াও সরকারের নীতিনির্ধারক ও রাজনীতিবিদদের উপস্থিত থাকার প্রয়োজন কারণ সিদ্ধান্ত তো তারাই গ্রহণ করেন, এমন কি সরকার সংলাপের আয়োজন না করলে তো বিরোধী দলও করতে পারে কারণ তারা তো নির্বাচিত সরকারেরই অংশ...
বিডি রহমতউল্লাহ : অবশ্যই। আমরা একসময় রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করতে আন্দোলন করেছি, শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে বেশ কয়েকবার বক্তব্য দিয়েছি। কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দেয়ার জন্য। আজকে যদি স্ট্রেইট সরকার ৬ থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ঋণ নেয় তাহলে তো ক্ষতি নেই। আল্লাহকে তো সূর্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পেমেন্ট করতে হবে না।
নয়া দিগন্ত : পাকিস্তান ও ভিয়েতনামতো সৌর বিদ্যুতে দ্রুত সময়ে এগিয়েছে।
বিডি রহমতউল্লাহ : শুধু নেপাল ও ভুটান ছাড়া কারণ তাদেরতো জলবিদ্যুৎ আছে সৌর বিদ্যুৎ লাগবে না। সারা দুনিয়ায় সোলার আমাদের চেয়ে তিন চারগুণ বেশি।
নয়া দিগন্ত : সোলারে বাধাটা কোথায়?
বিডি রহমতউল্লাহ : বাধাটা হচ্ছে কনভেনশনাল বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লা বা বিভিন্নভাবে বিদ্যুৎ প্রকল্পে অনেক বেশি চুরি করা যায়। গর্ত করতে হয়, অনেক বড় বড় প্রকল্প নিতে হয়। অনেক কিছু কিনতে হয়। সৌর বিদ্যুৎ ফিক্সড প্রাইস। শুধু নাটবল্টু লাগিয়ে দেব। সবাই জানে প্রাইসটা। এখানে বিরাট গর্ত করার সুযোগ নাই। চুরির সুযোগ কম। এখানে কে যাবে!
নয়া দিগন্ত : ইনিসিয়াল ইনভেস্টমেন্ট বেশি
বিডি রহমতউল্লাহ : মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ হিসাব করতে হবে। সোলারে প্রতি মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ৬ কোটি টাকা। কয়লায় ১২ কোটি টাকা। অন্য খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকার টাকা দিলে সোলারে দেয় না কেন? তাহলে তো কোনো মানুষের সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহারে কোনো টাকা লাগে না।
নয়া দিগন্ত : সরকার তো ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ বিলিয়ন থেকে শুরু করে ট্রিলিয়ন টাকা খরচ করে ফেলেছে, ভর্তুকি তো দিচ্ছেই।
বিডি রহমতউল্লাহ : সোলারে টাকা দিলেই তো হয়ে যায়। লুটপাটের সুযোগ থাকে না।
নয়া দিগন্ত : এই মুহুর্তে বিদ্যুৎ খাতে করণীয় কি?
বিডি রহমতউল্লাহ : ইমিডিয়েট আমাদের যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র ফসিল ফুয়েল ব্যবহার করছে, তেল গ্যাসে যেগুলো চলে সেগুলোর অল্প খরচে যেগুলো মেরামত করা যাবে সেগুলোকে মেইনটেন্যান্স করে সিস্টেমে আনতে হবে। সারা দেশে সৌর বিদ্যুতের জন্য ব্যাটারিতে ইনসেনটিভ দেয়া। সব দেশে তাই দেয়। সরকার সৌর বিদ্যুৎ তৈরি করুক অথবা টেন্ডার নিয়ে উৎপাদনের সুযোগ দিক। লো প্রাইসে কোয়ালিটি স্ট্যানডার্ড করে দিলে যে এতদিনে এত মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ তৈরি করতে হবে। এটা করলে ৬-৭ মাস কিংবা ম্যাক্সিমাম এক বছরের মধ্যে ৮ থেকে ৯ হাজার মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ এসে পড়বে। এই একটা বছর সরকার সবাইকে যদি বলে আমরা লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা করে চলব, আপনারা একটু কষ্ট করেন, ২-১ বছরের মধ্যে বিদ্যুৎ দিয়ে দেবো। লোডশেডিংতো এমনিতেও করতে হচ্ছে। তাহলে দেশের মানুষ সরকারের কথা শুনবে। তা না হলে বিদ্যুৎ খাতের লুটপাট চলতেই থাকবে এবং আমাদের অস্তিত্ব আরো বিপন্ন হবে।



