নয়া দিগন্ত ডেস্ক
- যাত্রা বাতিল মার্কিন ও ইরান প্রতিনিধিদলের
- হামলা নিয়ে ইসরাইলকে কড়া হুঁশিয়ারি ভ্যান্সের
- লেবাননে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা সত্ত্বেও তুমুল লড়াই
- হরমুজ প্রণালী সচলে বিশ্ববাজারে কমলো তেলের দাম
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সদ্য স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির বাস্তবায়ন ও প্রযুক্তিগত শর্তাবলি নির্ধারণে সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টকে নির্ধারিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকটি শেষ মুহূর্তে স্থগিত হয়ে গেছে। গত বুধবার দুই দেশের মধ্যে একটি ১৪ দফার সমঝোতা স্মারক ডিজিটাল পদ্ধতিতে স্বাক্ষরিত হওয়ার মাত্র দুই দিনের মাথায় এই স্থবিরতা দেখা দিলো। লেবাননে ইসরাইলের ব্যাপক সামরিক অভিযান ও রক্তক্ষয়ী হামলার কারণে ইরান সুইজারল্যান্ডে তাদের প্রতিনিধিদল পাঠাতে বিলম্ব করায় এই অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। ফলে চুক্তিটি আলোর মুখ দেখার আগেই তা পুরোপুরি ভেঙে পড়তে পারে বলে বিশ্বজুড়ে গভীর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেই মার্কিন কর্মকর্তারা ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে একটি নতুন যুদ্ধবিরতি চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার দাবি করলেও মাঠপর্যায়ে ইসরাইলি বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণ অব্যাহত রয়েছে। চুক্তি নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের অনড় অবস্থান এবং লেবাননে ইসরাইলের আগ্রাসী মনোভাবের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি এখন চরম অস্থিতিশীল ও অনিশ্চিত রূপ নিয়েছে।
বৈঠক স্থগিত ও মার্কিন দলের যাত্রা বাতিল
সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শুক্রবার ভোরে নিশ্চিত করেছে যে, লুসার্নের নিকটবর্তী বুর্গেনস্টক রিসোর্টে মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের মধ্যে পূর্বনির্ধারিত বৈঠকটি আপাতত অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এই আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। সুইস পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ফরাসি সংবাদ সংস্থা এএফপিকে জানিয়েছে, ‘পরিকল্পিত আলোচনা স্থগিত করা হলেও সুইজারল্যান্ড এই মধ্যস্থতা সহজতর করতে সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে এবং বুর্গেনস্টকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিমূলক কাজ চলমান থাকবে।’ তবে পরবর্তী কোনো নতুন তারিখ ঘোষণা করা হয়নি।
মিডিয়া আউটলেট আল মায়াদিন প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশ করে যে, লেবাননে ইসরাইলি হামলার প্রতিবাদে ইরান তাদের প্রতিনিধিদল পাঠাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। অন্য দিকে, ওয়াশিংটনের সমঝোতা স্মারক সইয়ের ঘোষণার আগেই ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ‘তাসনিম’ জানায়, ইরানি প্রতিনিধিরা সুইজারল্যান্ডে যাওয়ার আগে অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্র আসলেই বাস্তবায়ন করছে কি না, তার প্রমাণ দেখতে চায়। মার্কিন কর্মকর্তারা সুইজারল্যান্ডে চুক্তির আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠান আয়োজন করতে চাইলেও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, দুই দেশের প্রেসিডেন্ট ইতোমধ্যে চুক্তিতে সই করায় এমন আনুষ্ঠানিকতা অপ্রয়োজনীয়।
এই আলোচনার জন্য মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স একটি বিশেষ ফ্লাইটে ওয়াশিংটনের যৌথ সামরিক ঘাঁটি অ্যান্ড্রুস থেকে সুইজারল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আকস্মিকভাবে এই সফর বাতিল করা হয়। হোয়াইট হাউজের এক বিবৃতিতে বলা হয়, জেডি ভ্যান্স আলোচনার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত থাকলেও কিছু লজিস্টিক ও ব্যবস্থাপনাগত পরিকল্পনা চূড়ান্ত না হওয়ায় তিনি ওয়াংশিটনেই অবস্থান করছেন।
ট্রাম্পের নীতি পরিবর্তন ও ওয়াশিংটনে সমালোচনা
নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বেশির ভাগ আমেরিকান নাগরিকের কাছে অজনপ্রিয় এই যুদ্ধ থামাতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে খুব বেশি ছাড় দিয়েছেন কি না, তা নিয়ে ওয়াশিংটনে তার নিজের দল রিপাবলিকান পার্টির নেতারাই প্রশ্ন তুলেছেন। গত মার্চ মাসে ট্রাম্প কড়া ভাষায় বলেছিলেন, ইরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ ছাড়া এই যুদ্ধ শেষ হবে না। কিন্তু ইরানের সাথে সই হওয়া এই চুক্তিতে উল্টো তাদের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে রেহাই দেয়া হয়েছে, বাজেয়াপ্ত হওয়া কয়েক হাজার কোটি ডলারের সম্পদ অবমুক্ত করা হয়েছে এবং তেল রফতানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র তাৎক্ষণিক ছাড় দিয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে মধ্যস্থতাকারীদের ৬০ দিন সময় দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া ইরানের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি পুনর্গঠন তহবিল ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। যদিও মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন পরবর্তী সময়ে ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করারও চেষ্টা করবে।
অন্য দিকে, ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের খবর অনুযায়ী, মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর আইনপ্রণেতাদের জানিয়েছে যে, এই যুদ্ধের খরচ মেটাতে তাদের আরো ৮০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। প্রায় চার মাস আগে যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করা, প্রতিবেশীদের ওপর হামলা বন্ধ করা এবং ইরানের বর্তমান সরকারের পতন নিশ্চিত করা। কিন্তু চুক্তি সইয়ের সময় এর কোনোটিই পূরণ হয়নি। উল্টো ইরান তাদের পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির (এনপিটি) আওতায় নিজেদের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশে রেখেই তা কমানো (ডাউন ব্লেন্ডিং) এবং আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শনে রাজি হয়েছে। এর মাধ্যমে ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়ার মার্কিন দাবি প্রত্যাখ্যান করে ইরান আগের চেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
এর জবাবে ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ লিখেছেন, ‘আমরা কোনো হীনম্মন্যতা বা হতাশা থেকে এই বৈঠক করছি না, ইরান করেছে।’ অন্যদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনি বলেছেন, ট্রাম্প ‘নিরুপায় হয়ে’ এই চুক্তিতে সই করেছেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘আমেরিকান পক্ষ যদি খুব বেশি দাবিদাওয়া করতে চায়, তবে আমরা তা মেনে নেবো না।’
ইরানের ‘রেড লাইন’ ও কঠোর হুঁশিয়ারি
ওয়াশিংটনের সাথে হওয়া সমঝোতা স্মারক বা যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করা হলে তা সহ্য করা হবে না বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের প্রধান আলোচক ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে গালিবাফ বলেন, ‘খারাপ বিশ্বাস, চুক্তি লঙ্ঘন এবং অতিরিক্ত দাবির ক্ষেত্রে শত্রুকে চূর্ণকারী জবাব দিতে আমাদের কোনো দ্বিধা নেই।’ তিনি আরো সতর্ক করে বলেন, যুদ্ধের সময় প্রতিপক্ষ একবার ‘চড়’ খেয়েছে, আবার একই পথে হাঁটলে আরো কঠিন প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়তে হবে।
গালিবাফ স্পষ্ট করে বলেন, যেকোনো আলোচনা তেহরানের ‘রেড লাইন’ মেনে হতে হবে। তার মতে, লেবাননে ইসরাইলি হামলা বন্ধ করাই আলোচনার অন্যতম প্রধান শর্ত। তিনি আরো বলেন, ‘যদি শত্রু আবার আগ্রাসনের পথে যায়, আমরা প্রস্তুত। আমাদের আঙুল ট্রিগারে রয়েছে এবং কঠোর জবাব দিতে কোনো দ্বিধা করব না।’
লেবাননে ইসরাইলের নজিরবিহীন হামলা
এ দিকে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল এবং পূর্বাঞ্চলের বেকা উপত্যকায় ইসরাইলি সামরিক বাহিনী তাদের আক্রমণ আরো জোরদার করেছে। ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী দাবি করেছে, তারা গত মধ্যরাত থেকে লেবাননে হিজবুল্লাহর ১৫০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। এর আগে এক বিবৃতিতে তারা রাতের বেলা আরো ৮০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা এবং কয়েক ডজন হিজবুল্লাহ যোদ্ধাকে হত্যার দাবি করেছিল। লেবাননের জাতীয় বার্তা সংস্থা (এনএনএ) জানিয়েছে, গত রাত থেকে শুক্রবার পর্যন্ত চলা এই ইসরাইলি হামলায় অন্তত ১৮ জন লেবানিজ নাগরিক নিহত হয়েছেন। হিজবুল্লাহর সাথে দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি বাহিনীর তীব্র সম্মুখযুদ্ধ চলছে এবং এই লড়াইয়ে চার ইসরাইলি সেনা নিহত হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে তেল আবিব।
নেতানিয়াহুর অবস্থান ও লেবানন প্রেসিডেন্টের ক্ষোভ
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এক সোশ্যাল মিডিয়া বিবৃতিতে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন ইসরাইলি সেনারা যতদিন প্রয়োজন ততদিন দক্ষিণ লেবাননের ‘নিরাপত্তা জোনে’ অবস্থান করবে। নিহত চার সেনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের ভূখণ্ড বা সৈন্যদের ওপর কোনো হামলা ইসরাইল সহ্য করবে না। এই হামলার জন্য হিজবুল্লাহকে অত্যন্ত চড়া মূল্য দিতে হবে।’ ইসরাইল বা হিজবুল্লাহ কেউই মার্কিন-ইরান চুক্তির অংশীদার নয়, তবে ইরান শর্ত দিয়েছে যে চুক্তি কার্যকর করতে হলে ইসরাইলকে দক্ষিণ লেবাননের অধিকৃত অঞ্চল থেকে সম্পূর্ণ পিছু হটতে হবে।
যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে লড়াই ও সংশয়
বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে যে, ইসরাইল এবং হিজবুল্লাহ একটি নতুন যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে সম্মত হয়েছিল। মার্কিন ও কাতারি কূটনীতিকরা ইরানের পরোক্ষ সহায়তায় এই যুদ্ধবিরতির রূপরেখা তৈরি করেন। হিজবুল্লাহর দু’টি সূত্রও রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছে তারা যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন করা শুরু করেছে।
তবে যুদ্ধবিরতি শুরুর নির্ধারিত সময়ের আধ ঘণ্টার মধ্যেই দক্ষিণ লেবাননে অন্তত চারটি বড় ধরনের বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী। ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর একজন মুখপাত্র স্পষ্ট করে বলেছেন, দক্ষিণ লেবাননে যেকোনো হুমকির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এবং হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে ইসরাইলি বাহিনী পূর্ণ ‘অপারেশনাল ফ্রিডম’ বা স্বাধীন সামরিক কর্তৃত্ব বজায় রাখবে। এই দ্বিমুখী অবস্থানের কারণে স্থানীয় সাধারণ মানুষের মনে যুদ্ধবিরতির প্রকৃত কার্যকারিতা নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে।
ইসরাইলের ওপর ক্ষুব্ধ ওয়াশিংটন
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কট্টরপন্থী ইসরাইলি মন্ত্রীদের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণায় ক্ষুব্ধ হোয়াইট হাউজ। তাছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সই করা ইরান চুক্তি (সমঝোতা স্মারক) মেনে নেয়ার জন্য ইসরাইল সরকারকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। একই সাথে জে ডি ভ্যান্স মনে করিয়ে দিয়েছেন যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরাইল বিশ্বের অধিকাংশ দেশের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং এখন শুধু যুক্তরাষ্ট্রই তাদের একমাত্র শক্তিশালী মিত্র হিসেবে অবশিষ্ট আছে।
হোয়াইট হাউজে সাংবাদিকদের সাথে প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী এক ব্রিফিংয়ে ভ্যান্স বলেন, ‘আমি যদি ইসরাইলের মন্ত্রিসভার সদস্য হতাম, তবে পুরো বিশ্বে আমার একমাত্র যে শক্তিশালী মিত্রটি টিকে আছে, অন্তত তাকে আক্রমণ করতাম না।’
অন্য দিকে ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভিরের ‘লেবাননকে পুড়িয়ে ছাই করার’ আহ্বানের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি। আরাকচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, ‘এটি কোনো সাধারণ মানসিক রোগীর প্রলাপ নয়, এটি ইসরাইলি জান্তার নিরাপত্তামন্ত্রীর প্রকাশ্য বক্তব্য। তেল আবিবের এই মৃত্যু উপাসক গোষ্ঠী পুরো মানবজাতির জন্য হুমকি।’
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এক টেলিগ্রাম বার্তায় বলেছেন, এই ইসরাইলি আগ্রাসনের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি দায়ী, কারণ মার্কিন-ইরান সমঝোতার প্রথম ধারায় সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধের কথা বলা হয়েছিল। এই ভঙ্গুর পরিস্থিতি সামাল দিতে নতুন করে তৎপরতা শুরু করেছেন আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীরা। কায়রো ও ইসলামাবাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে চুক্তির স্থায়িত্ব রক্ষা করতে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং তুরস্ক আগামীকাল রোববার মিসরের আলামিন শহরে একটি জরুরি বৈঠকে মিলিত হতে সম্মত হয়েছে।
হরমুজ প্রণালী সচলে কমলো তেলের দাম
এ দিকে চুক্তি স্বাক্ষরের পর কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী আবার সচল হয়েছে। আর তাতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়ার বড় সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় তেলের দাম নেমে এসেছে ৮০ ডলারের নিচে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৪৩ সেন্ট বা ০.৫৪ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ৭৯.৪২ ডলারে নেমে এসেছে। অন্য দিকে মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ১৭ সেন্ট বা ০.২২ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ৭৬.৪৩ ডলারে দাঁড়িয়েছে। বৃহস্পতিবার শান্তিচুক্তির খবরে দুই ধরনের তেলের দামই গত মার্চের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যায়।
দুই দেশের প্রেসিডেন্ট ঐতিহাসিক ওই চুক্তিতে সই করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তিনটি সৌদি ট্যাংকারসহ বেশ কয়েকটি জাহাজ হরমুজ প্রণালী পার হয়। এসব ট্যাংকারে প্রায় ৬০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ছিল। বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, এই চুক্তির ফলে মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলে আটকে থাকা আট কোটি ৫০ লাখ ব্যারেলের বেশি অপরিশোধিত তেল বিশ্ববাজারে চলে আসবে।
বিশ্ববাজারে সরবরাহ বাড়াতে মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোও তাদের রফতানি ফের শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কুয়েত পেট্রোলিয়াম করপোরেশন জানিয়েছে, যুদ্ধের কারণে জারি করা অনিবার্য পরিস্থিতির বিশেষ নোটিশ তারা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। ইরাকের জ্বালানিমন্ত্রী বাসিম মোহাম্মদ জানিয়েছেন, তাদের তেলক্ষেত্রগুলো উৎপাদন শুরু করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত এবং সরবরাহ শিগগিরই আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে।
তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমলেও এখনো কিছু ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি রয়ে গেছে। লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরাইলের সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকায় মার্কিন-ইরান চুক্তি কতদিন টিকবে, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে। তেলবাজার নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান ‘ভান্দা ইনসাইটস’-এর প্রতিষ্ঠাতা বন্দনা হরি বলেন, ‘বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি হরমুজ প্রণালীতে নিরাপদ যাতায়াতের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের খুব একটা আশ্বস্ত করতে পারছে না।’ বাজার গবেষণা সংস্থা কেসিএম-এর প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার বলেন, ব্যবসায়ীরা এখন হরমুজ প্রণালী দিয়ে ট্যাংকার চলাচল আসলেই স্বাভাবিক হচ্ছে কি না, সেই সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অপেক্ষায় আছেন।
হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজের ভিড়
তেহরান কূটনৈতিক আলোচনার সদিচ্ছা হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে সমঝোতা স্মারকের অধীনে নির্ধারিত ৬০ দিনের আলোচনা চলাকালে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য সব শুল্ক বা ফি মওকুফ করা হবে।
পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেট অথরিটি এক্স-এ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি বলবৎ থাকাকালে যেকোনো জাহাজ হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিনামূল্যে যাতায়াত করতে পারবে। তবে সুরক্ষার স্বার্থে জাহাজগুলোকে পারাপারের অন্তত ৪৮ ঘণ্টা আগে রুট, সময়সূচি এবং প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের জন্য আবেদন দাখিল করতে হবে। এই সময়কালে জাহাজের নিরাপত্তা, পরিবেশগত সেবা এবং ইরানি ইন্স্যুরেন্স কাভারেজের সব ব্যয় ইরান সরকার নিজেই বহন করবে। সামুদ্রিক ট্র্যাকিং ফার্ম এএক্সএস-মেরিনের তথ্যানুযায়ী, মার্কিন-ইরান প্রাথমিক চুক্তির পর গত বৃহস্পতিবার রেকর্ড ২৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেছে, যা গত এপ্রিলের পর একক দিনে সর্বোচ্চ পারাপারের রেকর্ড।
আটকে পড়া জাপানি জাহাজ মুক্ত
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এক্স-এ এক পোস্টে নিশ্চিত করেছেন পারস্য উপসাগরে আটকে পড়া একটি জাপান-লিঙ্কড অপরিশোধিত তেলের ট্যাংকার নিরাপদে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করে জাপানের উদ্দেশে রওনা হয়েছে। রয়টার্সের তথ্যমতে, লাইবেরিয়ার পতাকাবেষ্টিত এই ট্যাংকারটির মালিক জাপানের ‘কিওই ট্যাংকার’ এবং এতে তিনজন জাপানি ক্রু ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি জানান, এর মাধ্যমে জাপানি ক্রুসহ সব জাপান-সংশ্লিষ্ট জাহাজ ওই এলাকা থেকে নিরাপদ স্থানে চলে আসতে পেরেছে। তবে এখনো অন্যান্য দেশের আরো ৩৭টি জাপান-সংশ্লিষ্ট জাহাজ হরমুজ প্রণালী পার হওয়ার অপেক্ষায় আটকে রয়েছে। জাপানি সরকার এই আন্তর্জাতিক জলসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজের অবাধ ও নিরাপদ চলাচল দ্রুত স্বাভাবিক করতে সব ধরনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে বলে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন।



