সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী

হাম প্রতিরোধে ২০ এপ্রিল থেকে সারা দেশে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি

Printed Edition

সংসদ প্রতিবেদক

দেশে হামের সংক্রমণ ও শিশুমৃত্যু নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আগামী ২০ এপ্রিল থেকে সারা দেশে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার আনা এক জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিশের জবাবে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো: সাখাওয়াত হোসেন এই তথ্য জানান।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, ৫ এপ্রিল থেকে ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলাগুলোতে ইতোমধ্যে টিকাকার্যক্রম শুরু হয়েছে। আগামী ১২ এপ্রিল থেকে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ অন্যান্য বড় শহরেও এই কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হবে। সবশেষে ২০ এপ্রিল থেকে শুরু হবে দেশব্যাপী বিশেষ টিকাদান অভিযান। তিনি জানান, ঢাকা শুরুতে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় না থাকলেও আগাম সতর্কতা হিসেবে রাজধানীকে এই কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সংসদকে আশ্বস্ত করে বলেন, হামের টিকার কোনো সঙ্কট নেই। বর্তমানে সরকারের কাছে ২ কোটি ১৯ লাখ ডোজ টিকা মজুদ রয়েছে। দুর্নীতি ও বিলম্ব এড়াতে এবার প্রচলিত টেন্ডার প্রক্রিয়া বাদ দিয়ে সরাসরি ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ করা হচ্ছে। টিকা ক্রয়ের জন্য সরকার ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে, যা এডিবির মাধ্যমে ইউনিসেফের কাছে পাঠানো হচ্ছে। মন্ত্রী আরও জানান, সরাসরি ইউনিসেফের মাধ্যমে ৪১৯ কোটি টাকার ভ্যাকসিন ক্রয় প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

হামে মৃত্যু নিয়ে বিভ্রান্তি নিরসনে মন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন সূত্রে ৯৮ জনের মৃত্যুর কথা বলা হলেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের যৌথ যাচাই অনুযায়ী এখন পর্যন্ত ৪১ জনের মৃত্যু সরাসরি হামজনিত বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। বাকি মৃত্যুর পেছনে অন্যান্য জটিলতা বা সহরোগ থাকতে পারে। তিনি অযথা আতঙ্ক বা গুজব না ছড়িয়ে নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে তথ্য যাচাই করার আহ্বান জানান।

সম্প্রতি মহাখালী সংক্রামক রোগ হাসপাতাল পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, সেখানে পর্যাপ্ত নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) সুবিধার অভাব তাকে ব্যথিত করেছে। তিনি জানান, গত ৯ মাস ধরে স্বাস্থ্যকর্মীদের বকেয়া বেতন পরিশোধের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং শূন্য অবস্থা থেকে টিকা ব্যবস্থাপনাকে পুনর্গঠন করা হচ্ছে।

আগের সরকারের টিকা ব্যবস্থাপনায় অবহেলার কারণেই পরিস্থিতি জটিল হয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, সরকার এখন কার্যকর সাপ্লাই চেইন ও আন্তর্জাতিক সমর্থনের মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে। করোনার টিকার মতো হামের টিকা নিয়ে গুজব প্রতিরোধে তিনি সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।

রামেক হাসপাতালে হামের উপসর্গে আরো ৩ শিশুর মৃত্যু

রাজশাহী ব্যুরো জানান, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরো তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে আরো ২৩ শিশু এই উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। গতকাল বুধবার রামেক হাসপাতালের মিডিয়া মুখপাত্র ও জরুরি বিভাগের ইনচার্জ ডা: শঙ্কর কে বিশ্বাস এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

ডা: শঙ্কর কে বিশ্বাস জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের সন্দেহভাজন (সাসপেক্টেড) উপসর্গ নিয়ে রামেক হাসপাতালে নতুন করে ভর্তি হয়েছে ২৩ জন। একই সময়ে সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র (ডিসচার্জ) পেয়েছে ১০ জন রোগী। এ ছাড়া চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ২৪ ঘণ্টায় তিন শিশু মৃত্যুবরণ করেছে।

তিনি আরো জানান, বর্তমানে হাসপাতালটিতে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছে ১৩৩ জন। এখন পর্যন্ত এই উপসর্গ নিয়ে রামেক হাসপাতালে মোট ভর্তি হয়েছে ৪৫২ জন রোগী। এর মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মোট ৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।

মমেকে আরো ২২ শিশু ভর্তি

ময়মনসিংহ অফিস জানায়, হামের লক্ষণ নিয়ে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ (মমেক) হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরো এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে হাসপাতালে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে আটজনে।

বুধবার সকালে মারা যাওয়া তিন মাস বয়সী আদিবা নেত্রকোনা থেকে চিকিৎসার জন্য আনা হয়েছিল। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, হামের লক্ষণের পাশাপাশি অন্যান্য শারীরিক জটিলতাও ছিল তার।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরো ২২ শিশু ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে মমেক হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছে মোট ৭৮ শিশু।

মমেক হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা: মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, গত ১৭ মার্চ থেকে বুধবার সকাল পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে মোট ২৯৮ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ২১৩ শিশু।