আন্তর্জাতিক গুম সপ্তাহে আমেনার কান্না

‘কেউ বিচার না করলে আল্লাহ ঠিকই বিচার করবেন’

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

বরিশাল জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন ফিরোজ খান কালু। তার ছোট ভাই মিরাজ খান রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন না। কিন্তু বড় ভাইয়ের সাথে বন্ধুদের নিয়ে বিএনপির প্রোগ্রামে যেতেন। আওয়ামী লীগ শাসনামলে তারা দুইজনই গুম হন। আজও তাদের পরিবার জানে না তারা বেঁচে আছেন কি না।

জাতীয় প্রেস কাবে গতকাল বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক গুম সপ্তাহ উপলক্ষে মানবাধিকার সংস্থা অধিকার আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ফিরোজ খান কালুর স্ত্রী আমেনা আক্তার বৃষ্টি তার পরিবারের দুর্দশার কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, রাজনীতির কারণেই আমার স্বামী গুম হন। তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক মামলা ছিল। আমি ১৫টা বছর স্বামীর অপেক্ষায় আছি। হাসিনার সময় আমার স্বামীর মতো কেউ যাতে গুম না হয়, সে দাবিতে রাস্তায় নেমেছি। বর্তমান সরকারকে সম্মান করি, শ্রদ্ধা করি। আমার স্বামী জিয়াউর রহমানকে শ্রদ্ধা করত। বেগম খালেদা জিয়াকে মায়ের চোখে দেখত। প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় এসে গুম অধ্যাদেশগুলো বাতিল করলেন, আমি খুব হতাশ। এটা আমাদেরকে ফের অন্ধকার জীবনে নিয়ে গেছে। হাসিনার সরকারের সময় আমরা যে অন্ধকারে ছিলাম, বর্তমান সরকার আরো অন্ধকারে নিয়ে গেল, আমরা এখন নিশ্চিত বলতে পারি গুমের বিচার পাবো না।

আমেনা বলেন, গুমের সাথে জড়িত থাকায় জিয়াউল আহসান জেলে আছে, যদি তার বিচার হয় তাহলে প্রতিটি গুম হয়ে যাওয়া মানুষের পরিবার বিচার পাবে। অথচ তাকে জামাই আদরে যেভাবে রাখা হয়েছে, এভাবে আমরা মেনে নিতে পারছি না। হয় তার বিচার করেন না হয় তাকে ছেড়ে দেন। আমরা যে শাস্তি পেয়েছি হয়ত আরো কিছু পরিবার শাস্তি পেলে তারা শান্তি পাবে। যখন আমি দেখি জিয়াউল আহসানকে বিরিয়ানি খাওয়ায় তখন আমি চিন্তা করি আমার স্বামীকে সে কিভাবে নির্যাতন করেছে, হয়তো হত্যা করেছে। এই জিয়াউল আহসান আমার স্বামীকে গুমের ২০-২৫দিন আগে বরিশালের এমপি মজিবর রহমান সরোয়ারকে ফোন দিয়ে বলেছিল একটা লিস্টে আমার স্বামী কালুর নাম আছে। তাকে ধরা হবে। সারেন্ডার করতে বলেন। চট্টগ্রামে আমি তখন আমার স্বামীর সাথে ছিলাম। এর ১৫ দিন পর আমার স্বামী গুম হন। তার তিন মাস আগে আমার দেবরকে ঢাকার মিরপুর থেকে গুম করা হয়। আমার শাশুড়ি জিয়াউল আহসানের সাথে অনেকবার দেখা করতে গেলে তিনি দেখা করেননি। তার ছোটভাই আমার শাশুড়িকে বলেছে খালাম্মা, মিরাজের কথা বলতে পারব না তবে কালুকে মারেনি ওকে ইন্ডিয়া নিয়ে গেছে।

গুম অধ্যাদেশ স্থগিত হওয়ার বিষয়টিতে প্রশ্ন তুলে আমেনা আক্তার বলেন, জিয়াউল আহসানসহ যারা গুম খুনে জড়িত তাদের যারা জেলে আছে তাদের বিচার করতে কোনো নতুন আইনের দরকার নেই। তারা যে অপরাধী সে ব্যাপারে অনেক তদন্ত হয়েছে। তাদের এখনো সম্মানে রাখা হয়েছে। আমরা বিচার একমাত্র আল্লাহর কাছে দিয়া রাখছি। কেউ বিচার না করলে, কারো বিচার না হলে, আল্লাহ বিচার ঠিকই করবেন।

পরিবারের দুর্দশার কথা ব্যক্ত করে আমেনা বলেন, আজকে আমাদের পরিবারগুলোর যে কষ্ট, আমার শাশুড়ির বয়স ৭০ বছরের বেশি। তার স্বামী নাই, দু’টি সন্তানই গুম হয়েছে। সে খেতে পারে না। আমাদের অত টাকা পয়সা ছিল না। আমার স্বামীর যে ব্যবসা ছিল তার গুমের পর সব কিছু নিয়ে গেছে। আমার স্বামী গুম হওয়ার সময় তিন বছরের সন্তান রেখে গেছে। আজকে আমি আমার সন্তানকে নিয়ে দুঃখ কষ্টে সাঁতরাচ্ছি। এই ছেলের জন্যে আমি ঢাকা শহরে কাজ করতে আসছি। ছেলেকে পড়াশোনার খরচ দিতে পারি না। শাশুড়ির খোঁজখবরও নিতে পারছি না। তার চিকিৎসা, তার খাবার কোনো খোঁজ জানি না।

অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে আমেনা জানান, বর্তমান সরকার বিএনপির সরকার, ক্ষমতায় আসার পরও দলের কেউ আজ পর্যন্ত খোঁজ নিয়ে দেখেনি আমাদের পরিবারটা কেমন আছে। বিএনপির এমপির রাজনীতি করত আমার স্বামী। মানুষ দিলে আমার শাশুড়ি খায়, না পেলে না খেয়ে থাকে। চিকিৎসার খরচ জোগাতে পারে না। আমার খুব লজ্জা লাগে, খুব খারাপ লাগে, এই দলই কি আমার স্বামী করছে? কারণ এক মা তার দুই সন্তান হারিয়ে ভাতের অভাবে সে না খেয়ে মারা যাবে। তার সন্তানরা তাকে কোনো দিন কষ্ট পাইতে দেয়নি। আজকে সন্তান নাই, এটা কি দলের দায়িত্ব না, প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গুম পরিবারগুলোর অন্ততপক্ষে খোঁজ নেয়া। সে তো অনেক অত্যাচারিত হয়েছে, আমরা যে কষ্ট নিয়ে ভুগছি আমাদের ওপর তার নজর কোথায়? আমাদের চোখের জল আর গুম হয়ে যাওয়া দুই ভাইয়ের ছবি ছাড়া আর কিছু নেই। কেউ বুঝবে না আমাদের কষ্ট কী। আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না এ ছবিটার ওজন আমার কাছে কত। প্রধানমন্ত্রীর কাছে বলতে চাই আপনি গুমের বিচার করবেন কি না জানি না, অন্ততপক্ষে গুম পরিবারের যারা আছেন তাদের একটু খোঁজখবর নেন। তাদের একটু কষ্ট দূর করেন, তাদের অভিশাপ আর নিয়েন না।

অনুষ্ঠানে মা আমেনার পাশেই বসেছিলেন তার সন্তান আব্দুল্লাহ আল জিসান। নিস্তব্ধ, নির্বাক হয়ে ছিলেন সারাক্ষণ। অনুষ্ঠান শেষে জিসানের কাছে এই প্রতিবেদক জানতে চায়, কেমন চলছে পড়াশোনা। জিসান জানান, হচ্ছে। কাস টেনে পড়েন জিসান। বড় হয়ে কী হবে জানতে চাইলে খুব সংক্ষেপে জানালেন, আর্মিতে যাওয়ার ইচ্ছা আছে তার।