ট্রাইব্যুনালে সাক্ষীর বর্ণনা

গুলিতে মরেনি, মেরে ফেলুন ইনজেকশন দিয়ে

রক্তাক্ত জুলাইয়ের সেই উত্তাল দুপুর। কোমরের নিচে তীব্র বেগে ধেয়ে আসা বুলেট যখন শরীর ভেদ করে ওপাশে চলে গিয়েছিল, যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাওয়া মানুষটি ভেবেছিলেন হাসপাতালের সাদা অ্যাপ্রন পরা হাতগুলো বুঝি এবার অভয় দেবে। কিন্তু না; সেখানে ওঁৎ পেতে ছিল যমদূতের চেয়েও ভয়ঙ্কর কিছু কণ্ঠস্বর। মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের করিডোরে তখন হিংস্র হুঙ্কার ‘এদের গুলি করা হয়েছে মরেনি, এদের ইনজেকশন দিয়ে মেরে ফেলুন!’ একটি স্বাধীন দেশের হাসপাতালের নিরাময়কক্ষে দাঁড়িয়ে খোদ চিকিৎসকদের এভাবেই শাসিয়েছিল তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা।

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল |ইন্টারনেট

  • জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
  • মানবতাবিরোধী অপরাধ

রক্তাক্ত জুলাইয়ের সেই উত্তাল দুপুর। কোমরের নিচে তীব্র বেগে ধেয়ে আসা বুলেট যখন শরীর ভেদ করে ওপাশে চলে গিয়েছিল, যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাওয়া মানুষটি ভেবেছিলেন হাসপাতালের সাদা অ্যাপ্রন পরা হাতগুলো বুঝি এবার অভয় দেবে। কিন্তু না; সেখানে ওঁৎ পেতে ছিল যমদূতের চেয়েও ভয়ঙ্কর কিছু কণ্ঠস্বর। মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের করিডোরে তখন হিংস্র হুঙ্কার ‘এদের গুলি করা হয়েছে মরেনি, এদের ইনজেকশন দিয়ে মেরে ফেলুন!’

একটি স্বাধীন দেশের হাসপাতালের নিরাময়কক্ষে দাঁড়িয়ে খোদ চিকিৎসকদের এভাবেই শাসিয়েছিল তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা। গতকাল মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ দাঁড়িয়ে কান্নাজড়িতকণ্ঠে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সেই নারকীয় ও পৈশাচিক অধ্যায় তুলে ধরলেন এক প্রত্যক্ষদর্শী ভুক্তভোগী।

ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এই হৃদয়বিদারক জবানবন্দী রেকর্ড করা হয়। প্যানেলের অপর সদস্য বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে রাজধানীর রামপুরায় ২৮ জনকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তিনি ষষ্ঠতম সাক্ষী। নিরাপত্তার স্বার্থে আদালত ও প্রসিকিউশন এই সাক্ষীর নাম-পরিচয় গোপন রেখেছেন।

আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সাক্ষী ফিরে গিয়েছিলেন ২০২৪ সালের ১৯ জুলাইয়ের সেই অভিশপ্ত দুপুরে। পেশায় তিনি রাজধানীর রামপুরার মেরাদিয়ার একটি বাড়ির সাধারণ দারোয়ান। বুকে একরাশ কৌতূহল আর চোখে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক অজানা টান।

জবানবন্দীতে তিনি বলেন সেদিন দুপুরে রামপুরা থানার পাশে মেরাদিয়া কাঁচাবাজারে ছাত্রদের আন্দোলন দেখতে গিয়েছিলাম। বাজারে পা রাখতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল এক ভয়ঙ্কর দৃশ্য। দেখলাম বিজিবি, পুলিশ আর আওয়ামী লীগের লোকজন চারদিক থেকে ঘিরে ধরে নির্বিচারে গুলি চালাচ্ছে ছাত্রদের ওপর। চোখের পলকে নিথর হয়ে লুটিয়ে পড়ল কিছু তরতাজা প্রাণ। চারদিকে ছোপ ছোপ রক্ত, আহতের আর্তনাদ। ভয়ে, আতঙ্কে আমি যখন উল্টো ঘুরে বাসার দিকে দৌড়াতে শুরু করলাম ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা বুলেট এসে বিঁধল আমার কোমরের নিচে। মাংসপেশি ফেড়ে সেটি সামনে দিয়ে বেরিয়ে গেল।

এ সময় ট্রাইব্যুনালের এজলাসে নেমে আসে পিনপতন নীরবতা। সাক্ষী স্বয়ং নিজের প্যান্ট খুলে কোমরের নিচের সেই ভয়ঙ্কর বুলেটের ক্ষতস্থানটি বিচারকদের দেখান। আদালতের বাতাস তখন এক পঙ্গু হয়ে যাওয়া মানুষের দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে ওঠে। সেদিন রাস্তায় রক্তাক্ত ও অর্ধমৃত অবস্থায় পড়ে থাকলে কিছু সহৃদয় মানুষ তাকে উদ্ধার করে মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। ১৯ জুলাই কোনোমতে প্রাথমিক চিকিৎসা মিললেও ২০ জুলাই রাতেই তাকে হাসপাতাল থেকে একপ্রকার ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়া হয়।

কারণ হিসেবে সাক্ষী জানান, ওই রাতে আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা দলবল নিয়ে হাসপাতালে ঢুকে চিকিৎসকদের চরম হুমকি-ধমকি দিচ্ছিল। তাদের স্পষ্ট কথা ছিল, যারা গুলি খেয়েও বেঁচে ফিরেছে, তাদের ইনজেকশন দিয়ে চিরতরে শেষ করে দিতে হবে। এই আতঙ্কে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তড়িঘড়ি করে তাকে তাড়িয়ে দেয়, এমনকি চিকিৎসার ন্যূনতম কোনো কাগজপত্র বা রিলিজ লেটারও তার হাতে দেয়া হয়নি।

কিন্তু ট্র্যাজেডির এখানেই শেষ নয়। গুলিবিদ্ধ শরীর নিয়ে যখন তিনি মেরাদিয়ার বাসায় ধুঁকছিলেন, তখন তার দরজায় কড়া নাড়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। শাসিয়ে বলা হয়, ‘তুমি গুলি খেয়েছ, এই এলাকায় তুমি আর থাকতে পারবে না।’ এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে এলাকার একজন রাজনৈতিক পরিচয়হীন নির্দলীয় মানুষ তাকে আশ্রয় ও অভয় দেন। পরবর্তী সময়ে নিজের জমানো শেষ সম্বলটুকু খরচ করে ফরাজি হাসপাতালে চিকিৎসা নেন এই হতভাগ্য দারোয়ান।

নিজের এই পঙ্গুত্ব এবং গুলিবিদ্ধ হওয়ার পেছনে সরাসরি চারজন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে দায়ী করেছেন এই সাক্ষী। তারা হলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ানুল ইসলাম (বিজিবি) বর্তমানে গ্রেফতার হয়ে ঢাকা সেনানিবাসের সাব-জেলে বন্দী; মেজর মো: রাফাত বিন আলম (বিজিবি) বর্তমানে গ্রেফতার হয়ে ঢাকা সেনানিবাসের সাব-জেলে বন্দী; মো: রাশেদুল ইসলাম (ডিএমপির খিলগাঁও অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার-এডিসি) বর্তমানে পলাতক; মো: মশিউর রহমান (রামপুরা থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-ওসি) বর্তমানে পলাতক।

সাক্ষী কাঁদলেন, কাঁদালেন পুরো আদালতকে। রুদ্ধকণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আজ আমি পঙ্গু। কোনো কাজ করার সক্ষমতা আমার নেই। আমি এই পৈশাচিকতার বিচার চাই।’ মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে এই মামলার শুনানি পরিচালনা করেন প্রসিকিউটর আবদুস সাত্তার পালোয়ান। তাকে আইনি সহায়তায় সহযোগিতা করেন প্রসিকিউটর জহিরুল আমিন, মঈনুল করিম ও মার্জিনা রায়হানসহ অন্য আইনজীবীরা।

জামিন মেলেনি সাবেক ওসি আশরাফ ও ডিবির শফিকের

এদিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় কলেজছাত্র হৃদয় হোসেনকে হত্যার পর লাশ গুমের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গাজীপুরের কোনাবাড়ি থানার সাবেক ওসি কে এম আশরাফ উদ্দিনসহ দু’জনকে জামিন দেননি ট্রাইব্যুনাল। গতকাল মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এ বিষয়ে শুনানি হয়। অন্য সদস্য হলেন বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

জামিন চাওয়া অপরজন হলেন গাজীপুর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিদর্শক মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম। আশরাফের পক্ষে শুনানি করেন সিফাত মাহমুদ শুভ। অসুস্থ থাকায় মানবিক বিবেচনায় আশরাফ উদ্দিনের জামিন চান তিনি। এ ছাড়া গ্রেফতার হওয়ার এক বছরেও প্রসিকিউশন থেকে তদন্ত প্রতিবেদন না দেয়ায় আইনি ব্যাখ্যা তুলে শফিকুলের জামিন চান তার আইনজীবী। তবে তাদের এসব যুক্তি নিয়ে বিরোধিতা করে প্রসিকিউশন।

মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় আশরাফ ও শফিকুলের বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রমাণাদি মিলেছে বলে ট্রাইব্যুনালকে জানান প্রসিকিউটর মঈনুল করিম। একই সাথে জামিন না দেয়ার আর্জি জানান। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে জামিনের বিষয়ে কোনো আদেশ না দিয়ে আগামী ১২ জুলাইয়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।

এ প্রসঙ্গে প্রসিকিউটর মঈনুল করিম নয়া দিগন্তকে বলেন, গাজীপুরের কোনাবাড়িতে হৃদয় নামের এক শিক্ষার্থীকে খুব কাছ থেকে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়েছে। গুলি চালান আকরাম। তিনি স্বীকারোক্তিও দিয়েছেন। সেই মামলায় গত ১২ মে ডিবির শফিকুল ইসলাম ও সাবেক ওসি আশরাফুল উদ্দিনের জামিন চেয়ে আবেদন করেছিল আসামিপক্ষ। আজ শুনানির জন্য দিন ধার্য করেছিলেন ট্রাইব্যুনাল।

তিনি বলেন, শফিকুল ইসলামের পক্ষে গ্রাউন্ড দেখানো হয়েছে যে, যদি গ্রেফতারের এক বছরেও তদন্ত প্রতিবেদন না দেয়া হয়, তাহলে জামিন দিতে পারেন আদালত। এ ছাড়া আশরাফের ক্ষেত্রেও একই গ্রাউন্ডসহ অসুস্থতা দেখিয়ে জামিন চেয়েছেন। একই সাথে কিছু স্বাস্থ্য সনদও দেয়া হয়েছে। তবে আমরা বলেছি আদালত চাইলে এ সময় আরো ছয় মাস বাড়াতে পারেন। পরে কোনো ধরনের আদেশ দেননি আদালত।

প্রসিকিউটর মঈনুল বলেন, এ মামলার তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে। এই দু’জনের জড়িত থাকার পর্যাপ্ত প্রমাণাদি পেয়েছি আমরা। এ ছাড়া লাশটি এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। গুলি করে হত্যার পর গভীর রাতে গাড়িতে তুলে আশরাফ ও শফিকুলের মদদে লাশটি করতোয়া নদীতে ফেলে দেয়া হয়েছে।

এই দু’জন ছাড়াও বর্তমানে এ মামলায় গ্রেফতার রয়েছেন আরো পাঁচজন। তারা হলেন ঢাকা উত্তরের উপ-পুলিশ কমিশনার আব্দুল্লাহ হেল কাফি, এসআই শেখ আবজালুল হক, কনস্টেবল আকরাম হোসেন, কনস্টেবল ফাহিম ও কনস্টেবল মাহমুদুল হাসান সজিব।

প্রসিকিউশন জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর ছাত্র-জনতার বিজয় মিছিলে অংশ নেন হৃদয়। ওই দিনই তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করে পুলিশ। গুলি করার পর হৃদয়ের রক্তাক্ত দেহটি নদীতে ফেলে দেয়া হয়। তার লাশের সন্ধান এখনো পাওয়া যায়নি।