মো: রাফিউল হুদা,হাবিপ্রবি প্রতিনিধি
রাসায়নিক (ইউরিয়া ও ফসফরাস) সারের ব্যবহার ৫০-১০০% কমিয়ে এনে, পেস্টিসাইড এবং ফানিজসাইডের ব্যবহার ছাড়াই এন্ডোফাইটিক ব্যাকটেরিয়া প্রয়োগ করে টমেটো চাষে গবেষণা করছেন হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আজিজুল হক। প্রচলিত কৃষি ব্যবস্থায় যে পরিমাণ কীটনাশক প্রয়োগ করা হয়, ব্যাকটেরিয়া প্রয়োগে কীটনাশকের ব্যবহার শূন্যের কোঠায় নামিয়েও প্রায় দুই থেকে তিনগুণ বেশি ফলন পাওয়া সম্ভব বলে জানান তিনি।
গবেষক ড. আজিজুল হকের গবেষণা মাঠে গিয়ে দেখা যায়, এন্ডোফাইটিক ব্যাকটেরিয়া প্রয়োগে চাষ করা টমেটোর গাছগুলো সাধারণভাবে কীটনাশক প্রয়োগে টমেটোর গাছগুলোর থেকে আকার আয়তনে অনেক বড় এবং বেশি সবুজ। সেই সাথে শাখা-প্রশাখার আধিক্যের কারণে সাধারণ গাছের থেকে ব্যাকটেরিয়া প্রয়োগ করা গাছে টমেটোর ফলন প্রায় তিনগুণ এবং টমেটোর আকারও বড়। রাসায়নিকমুক্ত টমেটো চাষের উদ্দেশ্যে তিনি আইসোলেশনের মাধ্যমে এন্ডোফাইটিক ব্যাকটেরিয়া সংগ্রহ করে তা টমেটো গাছে স্প্রে করেন ৪-৫ বার।
তার গবেষণা মতে, টমেটো চারা রোপণের পর যদি আর কোন রাসায়নিক সার প্রয়োগ না করে ব্যাকটেরিয়াগুলো গ্রুপ বা এককভাবে স্প্রে করা যায় সেক্ষেত্রে ইউরিয়া ও ফসফরাস সারের ব্যবহার ৫০-৮০% পর্যন্ত কমে যায় এবং ফলন বাড়ে প্রায় দুই থেকে তিনগুণ। প্রয়োগ করা এসব ব্যাকটেরিয়া কীটনাশক খেয়ে বংশবৃদ্ধি করে এবং কীটনাশকের উচ্চ ঘনমাত্রা ৯০% পর্যন্ত কমিয়ে ফেলতে সক্ষম।
গত দেড় বছরে এই গবেষণার জন্য মাঠপর্যায়ে ড. আজিজুল হক ১০টি ফিল্ডে বিভিন্ন সময়ই শীতকালীন ও গ্রীস্মকালীন টমেটো চাষের উপর ব্যাকটেরিয়াল কনসোর্টিয়া নিয়ে কৃষক পর্যায়ে গবেষণার ট্রায়াল শেষ করেছেন। দিনাজপুর জেলা সদর, চিরিরবন্দর, সেতাবগঞ্জ উপজেলায় তার এই গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। সবগুলো মাঠেই চমৎকার ফলাফল পাওয়া গেছে। তিনি জানান, কনসোর্টিয়া গবেষণা মাঠে প্রয়োগ করলে সেই জমিতে টমেটো প্ল্যান্টের জন্য উপকারী ব্যাকটেরিয়া আধিক্য দেখা যায়। অন্য দিকে ক্ষতিকর প্যাথোজেনিক ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি একেবারেই কমে যায়। এ ছাড়া মাঠের নিউট্রিয়েন্ট যেমন ফসফেট, অর্গানিক ম্যাটার, অর্গানিক কার্বন, পটাসিয়াম ও সালফার তুলনামূলক সব প্লটেই বেশি লক্ষ্য করা যায়। ফলে টমেটো গাছের দ্রুত শাখা-প্রশাখা, ফুল ও ফল পর্যাপ্ত হয় বিধায় ফলন ২-৩ গুণ বেশি পাওয়া যায়। উৎপাদিত টমেটো সুস্বাদু, লাইকোপেন, ফ্লাভোনোইড, অ্যামিনো অ্যাসিড ও মিনারেলস সমৃদ্ধ হয়।
সম্প্রতি ১০৫ শতকের একটি ফিল্ডে টমেটো চারা লাগানো হয় গত ১০ ফেব্রুয়ারি। যেখানে ব্যাকটেরিয়া ছাড়া কন্ট্রোল ফিল্ডে বিগত ৪৮ দিনে ৪০ বার বিভিন্ন ধরনের পেস্টিসাইড শিডিউল স্প্রে করার প্রয়োজন হয় কৃষকের।এসব কীটনাশক প্রয়োগ করতে প্রায় ২০ হাজার টাকার মতো খরচ হয় কৃষকের। অন্যদিকে ব্যাকটেরিয়া প্রয়োগকৃত ৪ টি একই জমির ফিল্ডে কোনো রকম পেস্টিসাইড, পচন নাশক, ছত্রাকনাশক শিডিউল স্প্রে করার প্রয়োজন হয়নি। যেখানে কোনো রোগবালাই ও নেই। পাশাপাশি মাটির গুণগত মান ঠিক রয়েছে।মাইক্রোভিয়াল বায়োডাইভারসিটি পরীক্ষা করে দেখা যায় দিনাজপুরে বিগত ৫০ দিনে নিয়মিত মাঝারি ও ভারী ঝড় ও বৃষ্টিপাত পরিলক্ষিত হয়, এমতাবস্থায় আবহাওয়া পরিবর্তনের এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ব্যাকটেরিয়াল কনসোর্টিয়া অসাধারণ সাফল্য দেখিয়েছে। ঝড় বৃষ্টিপাত সত্বেও টমেটো গাছগুলো নেতিয়ে পড়েনি। কিন্তু পাশের যে জমিটিতে পেস্টিসাইড প্রয়োগ করা হয়েছিল সেই জমির উল্লেখ সংখ্যক গাছ নেতিয়ে পড়ে বলে জানান তিনি।
কৃষক পর্যায়ে এই গবেষণা ব্যাপক পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এখনও আমাদের দেশের মানুষ অর্গানিক কৃষির বিষয়ে সচেতন হয়নি। আমাদের সরকারি কাঠামোতেও কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। এসব কারণে এখনও আমরা শুধু একটি জেলাতেই এই ট্রায়াল করছি এবং অন্যন্য টমেটোর সাথেই বাজারজাত করছি। অনেকে জানেওনা তারা বাজার থেকে অর্গানিক টমেটো কিনে খাচ্ছে। আমাদের এই প্রযুক্তি সরকারিভাবে অনুমোদনপ্রাপ্ত হলেই মাঠ পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে পারবো বলে আশা করছি।



