হরমুজে সৌদি-কুয়েতের সহযোগিতায় ফের অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

মার্কিন সামরিক বাহিনীর ঘাঁটি ও আকাশসীমা ব্যবহারের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করেছে সৌদি আরব ও কুয়েত। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে হরমুজ প্রণালী আবার উন্মুক্ত করার সামরিক অভিযান শুরুর পর এ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। বৃহস্পতিবার ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক খবরে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এ সিদ্ধান্তের ফলে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে বড় ধরনের অগ্রগতি হলো। ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যেই এ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

মার্কিন ও সৌদি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে খবরে বলা হয়, ট্রাম্প প্রশাসন হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মার্কিন নৌ ও বিমান সহায়তায় নৌ-এসকর্ট কার্যক্রম পুনরায় চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। জানা গেছে, টানা ৩৬ ঘণ্টা পরিচালনার পর চলতি সপ্তাহের শুরুতে অভিযানটি সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছিল। বর্তমানে পেন্টাগনের পরিকল্পনাকারীরা আবার অভিযান শুরুর সময়সূচি নির্ধারণে কাজ করছেন। কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহেই এ কার্যক্রম আবার শুরু হতে পারে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ হামলা চালানোর পর অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করে। এর জবাবে তেহরান ইসরাইল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালায়। একই সাথে বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

পরে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত আলোচনা স্থায়ী সমাধানে পৌঁছাতে পারেনি। এরপর ট্রাম্প নির্দিষ্ট সময়সীমা ছাড়াই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ান। এ দিকে গত ১৩ এপ্রিল থেকে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালীতে ইরানের সামুদ্রিক চলাচল লক্ষ্য করে নৌ অবরোধ জোরদার করেছে। মঙ্গলবার ট্রাম্প ঘোষণা দেন, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হলেও ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নৌ অবরোধ ‘পূর্ণ শক্তিতে বহাল থাকবে’।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি হামলা

এ দিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রায় এক মাস আগে ঘোষিত যুদ্ধবিরতি এখন চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে হরমুজ প্রণালীতে দুই দেশের মধ্যে ব্যাপক গোলাগুলি ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে। ইরান অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালীতে দু’টি জাহাজের পাশাপাশি বেসামরিক এলাকায় হামলা চালিয়ে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে তারা কেবল ইরানি হামলার পাল্টা জবাব দিয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রণালী দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের তিনটি ডেস্ট্রয়ারের ওপর তেহরান কোনো উসকানি ছাড়াই হামলা চালিয়েছে।

ইরানের সরকার নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম প্রেসটিভি জানিয়েছে, কয়েক ঘণ্টার গোলাগুলির পর বর্তমানে হরমুজ প্রণালীর উপকূলীয় শহর এবং দ্বীপগুলোতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরানোর যখন কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলছে, ঠিক তখন এই পাল্টাপাল্টি হামলা নতুন করে যুদ্ধের শঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে এই সঙ্ঘাত বিশ্ববাজারে অস্থিরতা বাড়িয়ে দিতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, পাল্টাপাল্টি হামলার পরও যুদ্ধবিরতি এখনো টিকে আছে। এবিসি নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ হামলাকে ‘লাভ ট্যাপ’ বা সামান্য সঙ্ঘাত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ওয়াশিংটনের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ট্রাম্প বলেন, তারা (ইরান) সামান্য ঝামেলা করার চেষ্টা করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র তাদের উড়িয়ে দিয়েছে। এটা খুবই তুচ্ছ বিষয়। আলোচনার মাধ্যমে সঙ্ঘাতের সমাপ্তি ঘটার সম্ভাবনা কতটুকু- এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘চুক্তি হয়তো হবে না, আবার যেকোনো দিন হয়েও যেতে পারে। আমার চেয়ে তারা (ইরান) এই চুক্তির জন্য বেশি মরিয়া।’

এ দিকে পাল্টাপাল্টি হামলার খবরের পরপরই বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে গেছে। ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম প্রতি ব্যারেলে প্রায় ১০১ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। এ হামলার ঠিক আগে খবর এসেছিল, ওয়াশিংটন ও তেহরান যুদ্ধের অবসানে পাকিস্তানের মাধ্যমে এক পৃষ্ঠার একটি সমঝোতা স্মারক আদান-প্রদান করছে। তারা একটি প্রাথমিক চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। তবে গত কয়েক দিনে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা কোনো ধরনের ছাড় দেয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন।

ওমান সাগরে তেলবাহী ট্যাংকার জব্দ করল ইরান

ইরান ওমান সাগর থেকে ‘ওশেন কোই’ নামের একটি তেলবাহী ট্যাংকার জব্দ করেছে। জাহাজটিতে ইরানের তেল ছিল বলে দাবি করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। গতকাল শুক্রবার ইরানের সেনাবাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়, ওশেন কোই নামের জাহাজটি ইরানের তেল বহন করছিল। তবে আঞ্চলিক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে এটি ইরানের তেল রফতানি বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে। যদিও কিভাবে সেই ক্ষতির চেষ্টা করা হচ্ছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি। খবর রয়টার্সের।

ইরানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ট্যাংকারটি গত ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় ছিল। পরে ইরানি নৌবাহিনী জাহাজটিকে ওমান সাগর থেকে দেশটির দক্ষিণ উপকূলের দিকে নিয়ে যায়। ফার্স নিউজ জানিয়েছে, ট্যাংকারটি পরে বিচারিক কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে হরমুজ প্রণালী এলাকায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। উভয় পক্ষ একে অপরের ওপর হামলা চালায়। এর এক দিন পরই ট্যাংকার জব্দের এ ঘটনা ঘটল। ওমান সাগর আরব উপসাগরকে বহির্বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত করার গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হিসেবে পরিচিত।

আমিরাতে ইরানের মিসাইল ও ড্রোন হামলা

সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরান থেকে নিক্ষেপ করা দু’টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং তিনটি ড্রোন (ইউএভি) তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সফলভাবে প্রতিহত করেছে। শুক্রবারের (৮ মে) এ হামলার ঘটনায় অন্তত তিনজন ব্যক্তি মাঝারি ধরনের আহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে কর্তৃপক্ষ। খবর আলজাজিরার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেয়া এক বিবৃতিতে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপর ইরানের এই প্রকাশ্য হামলা শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনী মোট ৫৫১টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ২৯টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং দুই হাজার ২৬৩টি ড্রোন ধ্বংস করেছে। আরব আমিরাত এ ধরনের হামলাকে সরাসরি আগ্রাসন হিসেবে অভিহিত করে আসছে। সবশেষ এ হামলার বিষয়ে তেহরানের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া বা মন্তব্য পাওয়া যায়নি। মধ্যপ্রাচ্যের দুই শক্তিধর দেশের মধ্যে বিরাজমান এই উত্তেজনা আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। আমিরাত কর্তৃপক্ষ তাদের আকাশসীমা সুরক্ষায় সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখার ঘোষণা দিয়েছে।

হরমুজ অবরোধে পারস্য উপসাগরে আটকা ১,৫০০ জাহাজ, বিপাকে ২০ হাজার নাবিক

কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথ হরমুজ প্রণালীতে ইরানের অবরোধের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলে বর্তমানে প্রায় ১,৫০০ জাহাজ ও তাদের নাবিকরা আটকা পড়ে আছেন। জাতিসঙ্ঘের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) প্রধান আর্সেনিও ডোমিঙ্গেজ। বৃহস্পতিবার পানামায় অনুষ্ঠিত ‘মেরিটাইম কনভেনশন অব দ্য আমেরিকাস’-এ তিনি এ তথ্য জানান। খবর মিডল ইস্ট আইয়ের। আইএমও প্রধান বলেন, ‘এ মুহূর্তে প্রায় ২০ হাজার নাবিক এবং প্রায় ১,৫০০ জাহাজ আটকা পড়ে আছে।’

তিনি আরো জানান, বিশ্বে ব্যবহৃত মোট পণ্যের ৮০ শতাংশের বেশি সামুদ্রিক পথে পরিবহন করা হয়।

আটকা পড়া নাবিকদের প্রসঙ্গে ডোমিঙ্গেজ বলেন, ‘এরা নিরীহ মানুষ, যারা প্রতিদিন নিজেদের কাজ করে অন্য দেশের মানুষের উপকার করে যাচ্ছেন। কিন্তু নিজেদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তারা এখন আটকা পড়েছেন।’

চুক্তি হলেও হরমুজের নিয়ন্ত্রণ চিরকাল ইরানের কাছেই থাকবে

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ভবিষ্যতে কোনো শান্তি চুক্তি হলেও ‘হরমুজ প্রণালী’ চিরকাল ইরানের নিয়ন্ত্রণেই থেকে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের জ্বালানি ও মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক উপদেষ্টা আমোস হোচস্টাইন। খবর মিডেল ইস্ট আইর। ব্লুমবার্গের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, বাস্তবসম্মত ভবিষ্যতে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের ওপর থেকে ইরানের একচ্ছত্র আধিপত্য কমার কোনো সম্ভাবনা নেই। হোচস্টাইন সতর্ক করে বলেন, ওয়াশিংটন হয়তো চুক্তির কাগজে জলপথ উন্মুক্ত হওয়ার বিষয়টি বিশ্বাস করবে, কিন্তু উপসাগরীয় দেশগুলো তা বিশ্বাস করবে না; কারণ তারা জানে এই পয়েন্টে ইরানের হাতে কার্যত ‘ভেটো’ ক্ষমতা রয়েছে।