জিয়ারতে মদিনার গুরুত্ব ও ফজিলত : ইকবাল কবীর মোহন

Printed Edition
জিয়ারতে মদিনার গুরুত্ব ও ফজিলত : ইকবাল কবীর মোহন
জিয়ারতে মদিনার গুরুত্ব ও ফজিলত : ইকবাল কবীর মোহন

মদিনার পূর্ব নাম ‘ইয়াসরিব’। মহানবী সা:-এর হিজরতের পর এই নগরীর নাম রাখা হয় মদিনা। মদিনা অর্থ শহর। পবিত্র কুরআনের সূরা তওবা, আহজাব ও মুনাফিকুনে মদিনার নাম চারবার উচ্চারিত হয়েছে। মদিনার আরো অনেক নাম রয়েছে। ইমাম নুর উদ্দিন সামহুদি তার ‘ওয়াফাউল ওয়াফা’ গ্রন্থে মদিনার ৯৫টি নাম রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে মদিনার একটি প্রসিদ্ধ নাম হলো ‘তাবাহ’। এর অর্থ উত্তম। তাই মহানবী সা: মদিনাকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন এবং তা যেন অন্যদের কাছে প্রিয় হয়, সে জন্যও দোয়া করতেন। আল্লাহর রাসূল সা: বলেছেন, ‘হে আল্লাহ! তুমি মদিনাকে আমাদের কাছে প্রিয় করে দাও, যেমনিভাবে প্রিয় করেছ মক্কাকে; বরং তার চেয়েও মদিনাকে বেশি প্রিয় করো।’ (বুখারি-১৮৮৯)

প্রকৃতপক্ষে, মদিনা একটি উত্তম ও পবিত্র শহর, যাকে আল্লাহর রাসূল সা: বরকতময় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। মহানবী সা: মদিনার জন্য দোয়া করে বলেন, ‘হে আল্লাহ! মক্কায় যতটুকু বরকত আছে, মদিনায় তার দ্বিগুণ বরকত দাও।’ (মুসলিম-৩৩৯২) এই পবিত্র নগরীর নিরাপত্তা ও একে যাবতীয় অনিষ্ট থেকে রক্ষার দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা গ্রহণ করেছেন। এমনকি কিয়ামতের আগে সংঘটিত দাজ্জালের ফেতনা থেকেও আল্লাহ তায়ালা মদিনা শহরকে রক্ষা করবেন। আল্লাহর রাসূল সা: বলেছেন, ‘মদিনার প্রবেশপথগুলোতে ফেরেশতারা পাহারা দিয়ে থাকেন। ফলে কিয়ামতের আগে দাজ্জাল এবং মহামারী (প্লেগ) মদিনায় প্রবেশ করতে পারবে না।’ (বুখারি-১৮৮০) অন্য এক হাদিসে আল্লাহর রাসূল সা: উল্লেখ করেছেন, ‘যে কেউ মদিনাবাসীর ক্ষতি করতে চাইবে অথবা তাদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করবে, আল্লাহ তাকে এমনভাবে গলিয়ে দেবেন- যেমন লবণ পানিতে গলে যায়।’ (বুখারি-১৮৮৭)

মদিনায় মৃত্যুবরণ করাকে অশেষ মর্যাদা ও গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়। এখানে মৃত্যুবরণ করার জন্য হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা: দোয়া করতেন। কেননা, মদিনায় মৃত্যুবরণকারীর জন্য আল্লাহর রাসূল সা: সুপারিশ করবেন। আল্লাহর রাসূল সা: এই শহরে মৃত্যুবরণ করাকে ফজিলতের কারণ উল্লেখ করে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মদিনায় মৃত্যুবরণ করতে সক্ষম, সে যেন সেখানেই মৃত্যুবরণ করে। কেননা, যে মদিনায় মৃত্যুবরণ করবে আমি তার জন্য সুপারিশ করব।’ (জামে আত-তিরমিজি-৩৯১৭) মদিনার মর্যাদা এতটাই বেশি যে, আল্লাহর রাসূল সা: এটিকে ঈমানের স্থান হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘ঈমান মদিনার দিকে ফিরে আসবে, যেভাবে সাপ তার গর্তের দিকে ফিরে আসে।’ (বুখারি-১৮৭৬)

অন্যদিকে মদিনার মর্যাদার কারণে এই শহরে এসে জ্ঞানচর্চার মর্যাদাও অত্যধিক বলে মহানবী সা: উল্লেখ করেছেন। তিনি মদিনাকে ইসলামী জ্ঞানের সূতিকাগার হিসেবে বিশেষ মর্যাদা দান করে বলেন, ‘মানুষ হন্যে হয়ে ইলম (জ্ঞান) অনুসন্ধান করবে, তবে মদিনার আলেমের চেয়ে অধিক বিজ্ঞ কোনো আলেম তারা খুঁজে পাবে না।’ (সুনানে নাসায়ি-৪২৭৭)

জিয়ারতে মদিনার গুরুত্ব ও ফজিলত : মদিনা শহরে রয়েছে এমন একটি মসজিদ, যা মহানবী সা: তাঁর নিজের হাতে ও শ্রমে নির্মাণ করেছেন। এই মসজিদে বসেই নবীজি সা: ইসলামের শিক্ষা প্রচার করেছেন। এই মসজিদের ইমাম ছিলেন আল্লাহর রাসূল সা: নিজেই। মসজিদে নববী এমন একটি পবিত্র স্থান যেখানে বসে আল্লাহর রাসূল সা: বহু যুদ্ধ ও জিহাদ পরিচালনা করার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। মহানবী সা: মদিনায় যে রাষ্ট্রব্যবস্থা তৈরি করেছিলেন, তার যাবতীয় কর্মকাণ্ড এই মসজিদের চত্বরে বসেই মহানবী সা: পরিচালনা করেছেন। তাই মসজিদে নববী মুসলিম মিল্লাতের জন্য অত্যন্ত আবেগ ও গভীর ভালোবাসার প্রতীক। এই মসজিদকে আল্লাহ তায়ালা তাকওয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত বলে উল্লেখ করেছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- ‘প্রথম দিন থেকেই যে মসজিদের ভিত স্থাপন করা হয়েছে তাকওয়ার ওপর, সেটিই তোমার সালাতের জন্য অধিক উপযুক্ত।’ (সূরা তওবা, আয়াত-১০৮) মসজিদে নববীর আরেকটি ফজিলত হলো- এখানে নামাজ পড়ার সাওয়াব অন্য মসজিদের তুলনায় অনেক বেশি। হজরত ইবনে উমর রা: থেকে বর্ণিত এক হাদিসে আল্লাহর রাসূল সা: বলেন, ‘আমার এ মসজিদে এক সালাত আদায় করা মসজিদে হারাম ছাড়া অন্যান্য মসজিদে এক হাজার সালাত আদায় করার চেয়েও উত্তম।’ (বুখারি-১১৯০)

উল্লেখ্য, নবী কারিম সা: রওজা জিয়ারত বা জিয়ারতে মদিনা একটি সুন্নত ও অতি পুণ্যময় কাজ বলে বর্ণিত হয়েছে। মদিনার রওজা জিয়ারতকে নবীজি সা: তাঁর সাথে সাক্ষাৎ লাভের ফজিলত বলে উল্লেখ করেছেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা: ইরশাদ করেন, ‘যে আমার ওফাতের পর হজ করল, অতঃপর আমার কবর জিয়ারত করতে এলো সে যেন আমার জীবিত অবস্থায় আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করল।’ (সুনানে বায়হাকি-৩৮৫৫) অন্যদিকে নবীজির সা: কবর জিয়ারত করার বিশেষ বরকত হলো এর মাধ্যমে রাসূল সা:-এর শাফায়াতের সৌভাগ্য লাভ করা। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা: বর্ণনা করেন, রাসূল সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার কবর জিয়ারত করল, তার জন্য আমার সুপারিশ আবশ্যক হয়ে গেল।’ (দারা কুতনি-১৯৪) মহানবী সা: আরো বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমার কবর জিয়ারত করবে, সে কিয়ামতের দিন আমার প্রতিবেশী হিসেবে থাকবে, আর সে দিন আমি তার জন্য শাফায়াত করব।’ (শুআবুল ঈমান-৩৮৫৬) অন্যদিকে রাসূল সা:-এর কবর জিয়ারত না করাকে নবীজি সা: তাঁর প্রতি অন্যায় আচরণ বা জুলুমের শামিল বলে উল্লেখ করেছেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা: থেকে বর্ণিত হয়েছে- নবীজি সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি হজ করল; কিন্তু আমার রওজা শরিফ জিয়ারত করল না, সে আমার ওপর জুলুম বা অন্যায় আচরণ করল।’ (ইলাউল সুনান, দশম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩৩২)

মসজিদে নবীর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো নবীজির রওজা জিয়ারত। মসজিদের এক কোণে রয়েছে আল্লাহর রাসূল সা:-এর রওজা শরিফ। এর পাশেই রয়েছে একটি স্থান যাকে ‘রিয়াজুল জান্নাত’ বা জান্নাতের উদ্যান বলা হয়। এই অংশটি সবচেয়ে ফজিলতপূর্ণ একটি স্থান। এই স্থানটি যে জান্নাতের বাগানসমূহের একটি এ প্রসঙ্গে নবীজি সা: বলেছেন, ‘আমার ঘর (বর্তমানে নবীজির কবর) ও মিম্বরের মাঝের জায়গা জান্নাতের বাগানগুলোর একটি আর আমার মিম্বর আমার হাউজের ওপর অবস্থিত।’ (বুখারি-১১৯৬) মহানবী সা:-এর কাছে এই জায়গাটি খুবই পছন্দনীয় ছিল। তিনি এখানে নামাজ পড়তে বিশেষভাবে আগ্রহী ছিলেন।

সাহাবিরাও এই স্থানে নামাজ পড়ার জন্য বিশেষভাবে আগ্রহ পোষণ করতেন। ইয়াজিদ ইবনে আবু উবাইদা রা: থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, ‘আমি সালামা ইবনে আকওয়ার সঙ্গে মসজিদে নববীতে যেতাম। তিনি মুসহাফের নিকটবর্তী পিলারের কাছে (রিয়াজুল জান্নাত) নামাজ পড়তেন। আমি একদিন তাকে বললাম, আপনাকে দেখি এ পিলারের কাছে নামাজ পড়তে বেশি আগ্রহী। তিনি বললেন, আমি নবীজিকে সা: এ পিলারের কাছে নামাজ পড়তে আগ্রহী দেখেছি।’ (মুসলিম-৫০৯)

একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হলো- আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন তথা জান্নাত লাভ করা। আর মহান আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি লাভ করতে হলে অবশ্যই নবীজি সা:-কে ভালোবাসতে হবে। রাসূল সা:-এর প্রতি ভালোবাসা ও মহব্বত ব্যতিরেকে কেউই পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না। আবু জর গিফারি রা: বর্ণিত এক হাদিসে বর্ণনা করা হয়েছে, ‘সর্বোত্তম আমল হচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাউকে ভালোবাসা, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই কাউকে অপছন্দ করা।’ (সুনানে আবু দাউদ-৪৫৯৯)

যারা মদিনার মর্যাদা অনুধাবন করে এবং রাসূল সা:-এর রওজা জিয়ারতকে গুরুত্ব দেয়, এটি তারা এ জন্যই করে যে, তারা আল্লাহর রাসূল সা:-কে গভীরভাবে ভালোবাসে এবং এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি লাভের প্রত্যাশা করে। এখানে উল্লেখ্য যে, রাসূল সা:-এর ওসিলা নিয়ে ক্ষমা চাওয়ার জন্য মদিনা মুনাওয়ারা জিয়ারত কুরআনে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘যদি কখনো তারা নিজেদের আত্মার প্রতি জুলুম করে রাসূল আপনার দরবারে হাজির হয়। অতঃপর আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে। আর রাসূল সা: তাদের পক্ষে সুপারিশ করেন, তবে অবশ্যই তারা আল্লাহকে তওবা কবুলকারী ও মেহেরবানরূপে পাবে।’ (সূরা নিসা, আয়াত-৬৪)

লেখক : সাবেক ব্যাংকার ও প্রাবন্ধিক