রাজপথে নামবে ১৪ ছাত্র সংগঠন : জুলাই সনদ ও গণরায়ের বাস্তবায়ন দাবি

Printed Edition

হাবিবুল বাশার

জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাকে নস্যাৎ করে রাষ্ট্রকে পুনরায় পুরনো ফ্যাসিবাদী কাঠামোর দিকে নিয়ে যাওয়ার ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠছে দেশের ছাত্র রাজনীতি। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটে প্রতিফলিত প্রায় ৬৯ শতাংশ মানুষের রায় অবিলম্বে কার্যকর এবং ‘জুলাই সনদ’-এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় ১৪টি ছাত্রসংগঠন।

এর আগে গত ১৬ এপ্রিল এক যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে ছাত্রনেতৃবৃন্দ সরকারকে চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, জনগণের ম্যান্ডেটকে পাশ কাটিয়ে আইনি মারপ্যাঁচে সংস্কার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করলে সাধারণ মানুষকে সাথে নিয়ে তারা পুনরায় রাজপথে নামতে বাধ্য হবেন।

‘অশনি সঙ্কেত’ দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা

রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলী আহমেদ মাবরুর এই পরিস্থিতিকে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘৬৯ শতাংশ জনগণের রায়কে সাংবিধানিক ভিত্তি না দেয়া দেশের স্থিতিশীলতার জন্য শুভ হবে না। ইতোমধ্যে বিরোধী দলগুলোর ওপর দমন-পীড়ন ও নেতাদের বাড়িতে হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে, যা পুরনো ফ্যাসিবাদেরই পুনরাবৃত্তি। জনগণের মধ্যে তৈরি হওয়া এই তীব্র হতাশা বড় ধরনের আন্দোলনের দিকে মোড় নিতে পারে।’

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যখনই দেশের প্রধান ছাত্রসংগঠনগুলো অভিন্ন লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, তখনই ক্ষমতার মসনদ কেঁপে উঠেছে। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ’৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং সর্বশেষ ২০২৪-এর ‘জুলাই অভ্যুত্থান’ তার ঐতিহাসিক সাক্ষী।

অধ্যাদেশ বিলুপ্তি ও ‘আইনি ফাঁকফোকর’ নিয়ে উদ্বেগ

যৌথ বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ অভিযোগ করেন যে, শহীদদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত ১৬টি জনগুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ সংসদে পাস না করে সেগুলোকে ‘ল্যাপস’ বা বিলুপ্ত হতে দেয়া শহীদদের রক্তের সাথে ‘স্পষ্ট প্রতারণা’। সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ১২ এপ্রিলের মধ্যে অধ্যাদেশগুলো সংসদে বিল আকারে পাস করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও সরকার তা করেনি। নেতৃবৃন্দ আরো বলেন, ‘গুম প্রতিরোধ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ১৬টি অধ্যাদেশকে আইনি সুরক্ষা না দিয়ে সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় দলীয়করণের পুরনো ছকে ফিরিয়ে নিতে চাচ্ছে। গণভোট হয়ে যাওয়ায় অধ্যাদেশ পাসের প্রয়োজন নেই বলে সরকার যে দাবি করছে, তা আসলে আইনি ফাঁকফোকর তৈরির অপচেষ্টা।’

ঐক্যবদ্ধ ১৪ ছাত্রসংগঠনের অবস্থান

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোটের রায় কার্যকরের দাবিতে একাত্মতা পোষণকারী সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে : বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, জাগপা ছাত্রকাফেলা, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত ছাত্র মজলিস, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসমাজ, বাংলাদেশ ছাত্রমিশন, গণতান্ত্রিক ছাত্রদল (এলডিপি), বাংলাদেশ খেলাফত ছাত্র আন্দোলন, বাংলাদেশ জাতীয় ছাত্রসমাজ, নাগরিক ছাত্রঐক্য, বাংলাদেশ ছাত্রপক্ষ, ইসলামী ছাত্র ফোরাম বাংলাদেশ, ন্যাশনাল ছাত্র মিশন ও ছাত্র ফোরাম। এ বিষয়ে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় দফতর সম্পাদক নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘জুলাই গণভোট নিয়ে কোনো ছাড় দেয়া হবে না। আমরা ফ্যাসিবাদবিরোধী সব শক্তিকে নিয়ে ‘সর্বদলীয় ছাত্রঐক্য’ গঠন করেছি। আইনি পদক্ষেপের পাশাপাশি রাজপথের লড়াইয়ের মাধ্যমে নব্যফ্যাসিবাদী কাঠামো রুখে দেয়া হবে। প্রয়োজনে আমরা সমন্বিত মাঠ কর্মসূচি ঘোষণা করব।’

চূড়ান্ত পরিণতির হুঁশিয়ারি

বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, ৫ আগস্টের চেতনা ধারণকারী ছাত্রসমাজ নব্যফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার যেকোনো দুঃসাহস রাজপথেই রুখে দেবে। অবিলম্বে গণভোটের রায়কে সংবিধানে স্থায়ী ভিত্তি দিয়ে সব জনমুখী সংস্কার আইন আকারে পাস করার জোর দাবি জানানো হয়েছে। অন্যথায়, দেশব্যাপী বৃহত্তর আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায়ের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন এই ১৪ ছাত্রসংগঠনের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ।