নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, সরকারের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটটি অধিক ঋণনির্ভর ও উচ্চাভিলাষী। এটা অবাস্তবায়নযোগ্য এবং লুটপাটের বাজেট। ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেটটি ব্যাংক ও বৈদেশিক বিরাট ঋণের ওপর নির্ভরশীল। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটের আর্থিক সংস্থান করতে গিয়ে ছয় লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকার যে রাজস্ব আয়ের কথা বলা হয়েছে, সেই রাজস্ব কিভাবে আদায় করা হবে তা স্পষ্ট করা হয়নি। বাজেটের ঘাটতি দুই লাখ ৩৬ হাজার ২৫০ কোটি টাকা কোথা থেকে পূরণ করা হবে-সেটি স্পষ্ট নয়। যেসব উৎস দেখানো হচ্ছে সেখানে যে কর কাঠামো, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন প্রয়োজন-সেগুলোর উল্লেখ নেই।
গতকাল রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রীর পেশ করা ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেটের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাতে দলটির পক্ষ থেকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তথ্য তুলে ধরেন। জামায়াত সেক্রেটারি বলেন, এবারের বড় ঘাটতি বাজেটের যে ব্যয় সঙ্কুলান, তা ব্যাংক লোন থেকে করা হবে। তাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে যাবে। ব্যাংক থেকে সরকার ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ করতে পারবে না, স্বাভাবিকভাবে বেসরকারি খাতে প্রভাব পড়বে।
তিনি আরো বলেন, বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কয়েকটি বড় বাধা রয়েছে। প্রথমত, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ক্রমবর্ধমান ব্যয়। গত কয়েক মাসে গ্যাস, জ্বালানি এবং বিদ্যুতের দাম একাধিকবার বৃদ্ধি করা হয়েছে। জ্বালানি হলো উৎপাদনব্যবস্থার প্রধান চালিকাশক্তি। এর মূল্যবৃদ্ধির ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে এবং অর্থনীতির সব খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। দ্বিতীয়ত; লাগামহীন মূল্যস্ফীতি। মূল্যস্ফীতি কমার পরিবর্তে ক্রমাগত বাড়ছে। তৃতীয়ত; বৈশ্বিক ও রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। এই তিনটি বড় চ্যালেঞ্জের কারণে বাজেট বাস্তবায়ন এবং রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।
জামায়াতের ছায়া বাজেটের সাথে সরকারের বাজেটের তুলনামূলক আলোচনা তুলে ধরে গোলাম পরওয়ার বলেন, জুলাই-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের জনগণ একটি জনবান্ধব, সুপরিকল্পিত, দূরদর্শী এবং বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু সরকারের ঘোষিত বাজেটে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা এবং জীবনমান উন্নয়নের সুস্পষ্ট বার্তা প্রতিফলিত হয়নি। কর প্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রকাঠামো নিয়ে কার্যকর সংস্কারের প্রতিফলন বাজেটে দেখা যায়নি। আমরা আশঙ্কা করছি, সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এই বিপুল অঙ্কের বাজেট বাস্তবায়নের সময় দুর্নীতি, অপচয় এবং লুটপাটের ঝুঁকি বাড়বে।
বাজেটে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রার বিষয়ে তিনি বলেন, বাজেটে ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান বিনিয়োগ পরিবেশ, দুর্বল আর্থিক ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং খাতে অনাকাক্সিক্ষত হস্তক্ষেপ, সীমাহীন দুর্নীতি এবং বৈষম্যমূলক নীতির কারণে উৎপাদনশীলতা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গোলাম পরওয়ার বলেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ (আইএমএফ) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা আগামী অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার ৫ শতাংশের নিচে থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। সেখানে ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী এবং বাস্তবতার সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একইভাবে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ৭.৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বর্তমান বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
তিনি বলেন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার বাড়িয়ে তিন লাখ কোটি টাকা করা হয়েছে। কিন্তু পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করে এডিপির আকার বৃদ্ধি করলে দুর্নীতি ও অপচয়ের সুযোগ সৃষ্টি হবে। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই। সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, জামায়াতের ছায়া বাজেটে আমরা অর্থবছরের সময়সীমা পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাব দিয়েছি। কারণ উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থবছর জুনে শেষ হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে তড়িঘড়ি করে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রবণতা দেখা যায়। এতে কাজের গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি হয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়নের সাথে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, ঠিকাদার এবং বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর মধ্যে অর্থের অপচয় ও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যায়। তাই আমরা একটি অধিক কার্যকর, জবাবদিহিমূলক এবং ফলপ্রসূ উন্নয়নব্যয় কাঠামোর পক্ষে মত দিয়েছি।
গোলাম পরওয়ার বলেন, বর্তমান সরকারের গৃহীত এসব অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত আমাদের পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের নীতির কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। এ ছাড়াও উচ্চাভিলাষী এই বাজেটের অর্থায়ন করতে গিয়ে সরকারকে অতিমাত্রায় ঋণনির্ভর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হয়েছে। দেশীয় উৎস, বিশেষ করে ব্যাংকিং খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়বে, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
তিনি বলেন, ন্যূনতম ব্যক্তিগত করের হার ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা নি¤œ-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে। মূল্যস্ফীতির কারণে যেখানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে, সেখানে অতিরিক্ত করের বোঝা জীবনযাত্রাকে আরো কঠিন করে তুলবে। তিনি আরো বলেন, বর্তমান বাজেটে অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং শিল্প খাতের বিভিন্ন কাঁচামালের ওপর ব্যয় ও কর বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর ফলে শিল্প উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পেট্রলিয়াম, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ওপর ভ্যাট বৃদ্ধি জনজীবনে দুর্ভোগ বয়ে আনবে। আরএমজি তথা তৈরী পোশাক শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাঁচামালের ওপর শুল্ক বৃদ্ধি আমাদের রফতানি খাতকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। আমরা এই গণবিরোধী বাজেটের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।
জামায়াত সেক্রেটারি বলেন, এই বাজেট প্রণয়নে যে ধরনের হঠকারিতা প্রদর্শন করা হয়েছে, জনগণ তা মেনে নেবে না। তাই অবিলম্বে এই উচ্চাভিলাষী ও লুটপাটনির্ভর বাজেট সংশোধন করে বিনিয়োগবান্ধব, কর্মসংস্থানমুখী ও জনকল্যাণমূলক বাজেট প্রণয়নের জোর দাবি জানান তিনি।
সরকারের প্রতি দাবি জানিয়ে গোলাম পরওয়ার বলেন, বাজেটে যে, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ এবারো রাখা হয়েছে-তা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে। সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী ৩০ জুন বাজেট পাস হওয়ার আগে সংসদে যথাযথ আলোচনা, সংশোধনী ও মতামত গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। সরকার যেন সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে জনগণের মতামত উপেক্ষা না করে। যেভাবে গণভোটের রায়কে উপেখ।সা করা হয়েছে, সেভাবে যেন জনগণের মতামত উপেক্ষা করে এই গণবিরোধী বাজেট চাপিয়ে দেয়া না হয়। এ সময় তিনি জামায়াত আমিরের অর্থবছর পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব তুলে ধরে বর্তমানে জুলাই-জুন অর্থবছরের পরিবর্তে জানুয়ারি-ডিসেম্বর ক্যালেন্ডার বছরভিত্তিক অর্থবছর চালুর আহবান জানান।
সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারি ড. রেজাউল করিম, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য মু. আতাউর রহমান সরকার ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী প্রচার সম্পাদক আব্দুস সাত্তার সুমন।



